রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পাবলিক বাসের যখন তীব্র সংকট; তখন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সড়ক থেকে একতলা ও দ্বিতল বাসগুলো (ডাবল ডেকার) ধীরে ধীরে উঠিয়ে নিচ্ছে। সড়কে পর্যাপ্ত যাত্রী না পেয়ে আর্থিক লোকসান হচ্ছে- এমন যুক্তিতে সড়কে যাত্রী পরিবহন করা (অনরুট) বাস কমিয়ে আনছে পরিবহন খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এসব বাস বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে। বিআরটিসির বহরে থাকা ৯৭৮টি সিঙ্গেল ও ডাবল ডেকার বাসের মধ্যে এখন ৩৯৪টি বাস ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। বহরে থাকা ৩৩০টি এসি বাসের মধ্যেও কয়েকটি ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে চলাচল করে। তবে কতটি এসি বাস ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে চলাচল করে সেই তথ্য প্রকাশ করেনি বিআরটিসি।
হিসাব কষে দেখা গেছে, ‘স্টাফ বাস হিসেবে’ চলাচল করে বিআরটিসির বাস প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা আর্থিক লোকসান করছে।
‘স্টাফ বাস’ নিয়ে বিতর্ক থামছে না
রাজধানীসহ সারা দেশে ফিটনেসবিহীন বাস উচ্ছেদে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যখন মরিয়া, তখন বিআরটিসি কেন সড়ক থেকে বাস তুলে নিচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিবহন (ট্রান্সপোর্ট) বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, নগরে চলাচল করা বাসগুলোর প্রতিটি সিট প্রতিবারের ট্রিপে অন্তত তিনবার বিক্রি হয়- এ পদ্ধতিতে বাসের প্রতিদিনের আয় নির্ধারণ করেন তারা।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিভাগ থেকে ‘স্টুডেন্ট বাস’ চুক্তি সংগ্রহ করেছে খবরের কাগজ। সেই নথিতে দেখা যায়, প্রতিদিন শুধু ভাড়া বাবদ ৬ হাজার ৮৫৪ টাকা বিআরটিসির কোষাগারে দেবে- এ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে বিআরটিসির। এ ক্ষেত্রে বাসের সিটগুলোর টিকিট মাত্র একবার বিক্রি হয়। ডিটিসিএর পদ্ধতি অনুযায়ী হিসাব কষে দেখা গেছে, ৫১ সিটের ওই বাসটি ‘অনরুট’ বাস হিসেবে চলাচল করলে, প্রতিটি সিট অন্তত তিনবার বিক্রি করা যেত। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ২৮১ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। এ হিসাবে প্রতিদিন ৩ হাজার ৪২৭ টাকা ভাড়া আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিআরটিসি। ডাবল ডেকার বাসে এই অঙ্ক দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি।
এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‘রুটে বাস চালালে যে টাকা আয় করা যেত, সেই একই পরিমাণ টাকায় স্টাফ বাসের চুক্তি হয়। অনরুট বাস থেকে বরং স্টাফ বাসেই বিআরটিসির আয় হয় বেশি।’
নিজের দাবির পক্ষে অবশ্য কোনো হিসাব উপস্থাপন করতে পারেননি বিআরটিসি চেয়ারম্যান। বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে অপারেশনস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মো. রাহেনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে নারাজি জানান।
আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ‘দেখুন, বিআরটিসির বাস সারা দিনই সব আসন পূর্ণ করে যাতায়াত করতে পারে না। সিঙ্গেল ডেকার, ডাবল ডেকার বাসগুলো দুপুর বা রাতে যাত্রী পায় না। সেগুলো সিট খালি রেখে চলাচল করে। চালকরা বলছেন, এতে তেল খরচও উঠছে না। তাহলে তারা রাজস্ব কোথা থেকে জমা দেবেন? রাজস্ব আহরিত না হলে আমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেবে কোথা থেকে?’
যেভাবে হয় স্টাফ বাসের চুক্তি
খবরের কাগজের হাতে আসা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নথি থেকে দেখা গেছে, ডেট মাইলেজের জন্য তেল খরচ, ভ্যাট, আয়কর মিলিয়ে ৫১ সিটের ওই বাসের জন্য ৪ হাজার ৭২৬ টাকা বিআরটিসির কোষাগারে জমা দিতে হয় ওই কর্তৃপক্ষকে। এই হিসাব অবশ্য প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হয়।
সেই নথি থেকে জানা যায়, বিআরটিসি কীভাবে স্টাফ বাস বা স্টুডেন্ট বাসের চুক্তি সম্পাদন করে।
প্রথম পক্ষ হিসেবে বিআরটিসি স্টাফ বাসগুলোর জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণনের পাশাপাশি সড়কের কর পরিশোধ করবে। পাশাপাশি এসব স্টাফ বাসে নিয়োজিত চালক ও কর্মচারীদেরও বেতন-ভাতাও পরিশোধ করবে। বাসের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটিও মেরামত করবে বিআরটিসি।
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন বাস বন্ধ রাখতে হয়। দ্বিতীয় কর্তৃপক্ষ বাস চালালে তা বিআরটিসিকে অবহিত করতে হবে। নির্ধারিত দূরত্বের অতিরিক্ত গেলে তার জন্য বাড়তি অর্থ গুনতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারিতে বাস দ্বিতীয় পক্ষের হেফাজতে থাকলে নির্ধারিত ভাড়ার ৫০ শতাংশ বিআরটিসিকে দিতে হয়। রাজপথ অবরোধের কারণে রুট পরিবর্তন করা হলে আলোচনা সাপেক্ষে ট্রিপের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
পথে বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বাস নাও চলাচল করতে পারে। ট্রিপ দিতে ব্যর্থ হলেও সেদিনের ভাড়া আনুপাতিক হারে নির্ধারিত হবে। নির্ধারিত চালক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প চালকের বন্দোবস্ত করে বিআরটিসি।
স্টাফ বাস বা স্টুডেন্ট বাসগুলোতে পথিমধ্যে কাউকে বাসে তোলা যাবে না। নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ব্যতীত অন্য কেউ এই বাসে উঠতে পারবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে বাস বসিয়ে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব দিতে হয় বিআরটিসিকে।
চুক্তির ধারা নিয়ে নানা প্রশ্ন
রাজধানীর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি বৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিআরটিসির স্টাফ বাস পরিষেবা নিয়ে কথা হয়।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেন, ‘বিআরটিসির ডাবল ডেকার বাসগুলোর অবস্থা খুব ভালো না। লক্কড়ঝক্কড়ই বলা চলে। প্রায়ই রুটে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ফ্লাইওভারে উঠলে মনে হয়, এই বুঝি উল্টে পড়ে যাবে। চুক্তি মোতাবেক স্টুডেন্ট বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না ঠিকঠাক। বাসের সিট ভাঙা থাকে, ফ্যান-লাইটও নষ্ট। বৃষ্টি হলে পানি ঢুকে। এই হলো অবস্থা!’
ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ছাত্রদের পরিবহন করার মতো যথেষ্ট বাস কিনতে হবে। এ পরিমাণ অর্থ আমাদের কোষাগারে নেই। তা ছাড়া এত বাস রাখার মতো ডিপো নেই। রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, তেল খরচ- সব মিলিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা নেই। এ জন্য আমরা বিআরটিসির দ্বারস্থ হয়েছিলাম। কিন্তু বিআরটিসি থেকে খুব যে ভালো মানের পরিষেবা দিচ্ছে, বিষয়টা এমন না।’ সংগত কারণে এই কর্মকর্তা নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য যে বাসগুলো মিরপুর থেকে মতিঝিলে আসে, তার পরিষেবা নিয়েও প্রশ্ন করেন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘এসি বাসের এসি ঠিকমতো চলে না। প্রায়ই এসি বন্ধ থাকে। জানালাও খোলা যায় না কখনো। আমি এখন এই বাস বাদ দিয়ে মেট্রোরেলে যাতায়াত করি। পরিবহন বাবদ কিছু বেশি টাকা গেলেও স্বস্তিতে অফিসে আসতে পারি।’
বিআরটিসির স্টাফ বা স্টুডেন্ট বাসে সাধারণ যাত্রী পরিষেবা করা যাবে না, এমন চুক্তি থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দুপুর বা সন্ধ্যার পর বাসগুলো যখন নির্ধারিত ডিপোতে ফিরে যায়, তখন সেগুলো লোকাল বাসের মতোই চলাচল করে। ক্ষেত্রবিশেষে লোকাল বাসের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করা হয়।
ফিটনেস হারানো বাস মেরামত করে চলছে ‘স্টাফ বাস’
২০১০-১১ অর্থবছরে চীনের ডংফেং ইয়াংসি থেকে ২৭৫টি সিএনজিচালিত সিঙ্গেল ডেকার বাস কিনেছিল বিআরটিসি। ২০১১ সালে ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ডের ২৭৮ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার ঋণ সহায়তায় দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দাইয়্যু বাস’ থেকে ২৫৫টি সিএনজিচালিত সিঙ্গেল ডেকার বাস কেনা হয়েছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারতের অশোক লিল্যান্ড থেকে ২৯০টি ডাবল ডেকার, ৮৮টি সিঙ্গেল ডেকার বাস কিনে আনা হয়। ২০১৯ সালে ভারত থেকে ৩০০টি ডাবল ডেকার, ২০০টি সিঙ্গেল ডেকার (এসি, নন-এসি), ১০০টি ইন্টারসিটি (এসি) বাস কেনা হয়েছিল।
এই বাসগুলোর অধিকাংশই ফিটনেস হারিয়েছে, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালও ফুরিয়েছে। এই বাসগুলো যখন অকেজো হিসেবে বিভিন্ন ডিপোতে ফেলে রাখা হয়েছিল, তখন বিআরটিসির কর্মকর্তারা এই বাসগুলোর মেরামতে জোর দেন। কারণ, অনেক ডিপো থেকে এসব বাসের যন্ত্রাংশ বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তখন তারা এই বাসগুলো নিয়ে যান গাজীপুরের সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় (আইসিডব্লিউএস)। সেখানে মেরামত করা হয় এই বাসগুলোর।
আইসিডব্লিউএস কর্মকর্তারা জানান, মেরামতের পরে অন্তত ৫ বছর খুব ভালোভাবে চলতে পারবে সড়কে। এরই মধ্যেই হালকা মেরামতের প্রয়োজন হলেও তারা প্রস্তুত।
বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ‘শুধু বিআরটিসির ফিটনেস হারানো বাস না, আমরা পরিবহন পুলের অনেক নষ্ট গাড়ি মেরামত করেও সড়কে স্টাফ বাস হিসেবে চালাচ্ছি। এতে সরকারের ব্যাপক অর্থের সাশ্রয় হয়েছে। নতুন গাড়ি কিনতে হচ্ছে না। নিজেদের অকেজো গাড়ি মেরামত করছি নিজেদের কারখানায়। এতে রাজস্ব সঞ্চয় করতে পারছি আমরা। লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছি আমরা।’
স্টাফ বাসের মডেলই ঠিক নেই: অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান
বিআরটিসির স্টাফ বাস বা স্টুডেন্ট বাস পরিচালনার মডেল যথাযথ না বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানে বাস কেনা হয়েছিল সাধারণ জনগণের জন্য। কিন্তু এখন সেই পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে। বিআরটিসি চলছে কিন্তু জনগণের করের টাকায়। সেই সাধারণ জনগণের পরিষেবা বন্ধ করা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কোনো দেশে রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠানের পরিষেবার মডেল এমন নয়।’
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে। এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না অধ্যাপক হাদিউজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির জন্মই হচ্ছে গণপরিবহন খাতে পরিষেবা দেওয়ার জন্য। এটাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান করতে হবে এটা কি আইনে বলা আছে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসির উচিত ছিল, বহরে থাকা বাসগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। যথাযথ রুট বিন্যাস করে বাসের পরিষেবা নির্ধারণ করতে পারলে বিআরটিসিকে লোকসান করতে হতো না। বিআরটিসি বরং প্রাইভেট বাস কোম্পানির জন্য রোল মডেল হতে পারত।’