বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার প্রথম রায় আসে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর। বিচারিক আদালতের ওই রায়ের ওপর উচ্চ আদালত থেকে ডেথ রেফারেন্স মামলার রায়ও এসেছে। বহুল আলোচিত মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আছে। এক কথায় ২০১৯ সালের ওই হত্যার ঘটনায় করা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ছয় বছর ধরে।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, বুয়েটের একটি হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ওই হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হত্যায় জড়িতদের সবাই ছিলেন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত) বুয়েট শাখার নেতা-কর্মী। মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত ১৬ মার্চ নিম্ন আদালতের ওই রায় বহাল রেখে রায় দেন উচ্চ আদালত। নিম্ন আদালতের রায়ের ওপর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) এবং আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে ওই রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় ঘোষণা করেন।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। ওই রায়ে আদালত বলেছিলেন, আসামিরা যোগসাজশে একে অপরের সহায়তায় শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেন এবং নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন। ওই ঘটনা দেশের সব মানুষকে ব্যথিত করেছে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর যেন কখনো না ঘটে, তা রোধে সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিচারিক আদালত।
বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরারের লাশ ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় নিহতের বাবা বরকতউল্লাহ ঢাকার চকবাজার থানায় মামলা করেন। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এতে বলা হয়, আসামিরা যোগসাজশ করে ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছেন।
ফৌজদারি কোনো মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে কারও মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকর করতে নিয়ম অনুসারে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। বিষয়টি ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে পরিচিত। তা ছাড়া নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা জেল আপিল ও নিয়মিত আপিলও করতে পারেন। সাধারণত ডেথ রেফারেন্স ও এসব আপিলের ওপর একসঙ্গে হাইকোর্টে শুনানি হয়। এই মামলায়ও তাই হয়েছে।
২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি ডেথ রেফারেন্সের জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আসে। এ ছাড়া ওই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। ডেথ রেফারেন্স এবং এসব আপিল ও জেল আপিলের শুনানি সাধারণত এক সঙ্গে হয়ে থাকে। এই মামলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ডেথ রেফারেন্স ও এসব আপিলের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়। শুনানি শেষে গত ১৬ মার্চ হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন করেন এবং আপিলগুলো খারিজ করে রায় দেন। ফলে বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল থাকে।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামির সবাই বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। আসামিরা হলেন মেহেদী হাসান (রাসেল), মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান (রবিন), ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল (জেমি), মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
আসামিদের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ পলাতক। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়।
হাইকোর্টে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।
এই মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী ও সাবেক বিচারক আজিজুর রহমান দুলু গতকাল রবিবার খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে হওয়া আপিল বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।