নারায়ণগঞ্জবাসীকে সার্বক্ষণিক বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে এবং বাসযোগ্য করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
এর মধ্যে ঋণদাতা সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দেবে ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। বাকি ২৭৫ কোটি টাকা সরকার খরচ করবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩১ সালের মার্চ পর্যন্ত। সম্প্রতি ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান
ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’টির অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা ও কদমরসুল পৌরসভাকে একত্রিত করে ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। এই শহরের পানি সরবরাহ কার্যক্রম ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসার অধীনে ছিল। বর্তমানে পিটিডব্লিউর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি এবং শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে এই নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করা হয়। পরে গোদনাইলে একটি নতুন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়। সুষ্ঠু পানি সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ২০২০ সালে ২০ কোটি টাকা খরচ করে ফিজিবিলিটি স্টাডির (সম্ভাব্যতা যাচাই) মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের জলাশয়গুলো অবৈধভাবে দখলের ফলে এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা নিরসনে নগরীতে পরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নগরবাসীর স্বাস্থ্য, পরিবেশগত উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি এবং অর্থনৈতিক ও জীবনমান উন্নয়ন বিবেচনায় খেলার মাঠ, পার্ক স্থাপন এবং কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। কারণ এখানে পানি সরবরাহব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে সঞ্চালন ও বিতরণ পাইপলাইনে সর্বদা প্রয়োজনীয় পানির চাপ বজায় রেখে নগরবাসীকে সার্বক্ষণিক বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা। নগরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো। টেকসই এবং জলবায়ু সহনশীল শহরের উন্নয়নের জন্য নগর পরিকল্পনা, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ হচ্ছে ডিএমজেড ১, ২ এবং ৩-এর জন্য নতুন ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপন এবং ডিএমজেড ১ ও ২-এর জন্য নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং বিদ্যমান গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি) এবং উৎপাদক নলকূপের পুনর্বাসন ১টি। তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৭৫৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ডিএমজেড ৩-এর অধীনে ডিএমএ ৫, ৬ ও ৭-এ বিতরণ নেটওয়ার্কসহ নতুন ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপন, ওয়েলফিল্ডের ইনডিউসড ব্যাংক ফিল্টারেশন, কালেক্টর পাইপলাইন এবং শীতলক্ষ্যা নদী ক্রসিং ট্রান্সমিশন পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ১টি। এখাতে খরচ ধরা হয়েছে ৪১৬ কোটি টাকা। এনসিসি এলাকায় ২৭টি ওয়াটার এটিএমের জন্য শেড নির্মাণ। এ খাতে খরচ ধরা হয়ছে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
নতুন ড্রেন নির্মাণ, বিদ্যমান ড্রেন সংস্কার ও বিদ্যমান খাল পরিষ্কার ও পুনর্বাসন ৫৪ কিলোমিটার। এতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা। ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে পার্ক এ ও পার্ক বি উন্মুক্ত স্থান স্থাপন ও সংস্কার। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্যমান খেলার মাঠের পুনর্বাসন। তাতে খরচ হবে ৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ৪টি উচ্চ চাপ জেটার, ডাম্প ট্রাক, পাওয়ার রাডার ও সরঞ্জাম সরবরাহ কেনা হবে সাড়ে ৩ কোটি টাকা খরচ করে। ২২ লাখ টাকায় ৪৭টি আসবাবপত্র কেনা ও অফিস স্থাপন করা হবে। ৮৮ কোটি টাকা খরচ করে ২৮টি আইটি সরঞ্জাম সরবরাহ ও ইন্সটলও করা হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পের নির্মাণকাজের ডিজাইন, সুপারভিশন ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হবে ৭১ কোটি টাকা। জিআইএস সিস্টেম উন্নয়ন এবং তিনটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির জন্য পরামর্শক সেবায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষঞ্জ খাতে ব্যয় হবে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এভাবে বিভিন্ন খাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে যাচাই করার জন্য ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরামর্শক পুলের অঙ্গ বাদসহ বিভিন্ন খাতের অসংগতি দূর করতে বলা হয়। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে গত ১ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্য (সিনিয়র সদস্য) এম এ আকমল হোসেন আজাদ বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ সিটি এলাকার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং নাগরিক সুবিধাদি বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ন করা সম্ভব হবে।’ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর জন্য টেকসই ও নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।’