চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রাতের আঁধারে আগর বাগান উজাড় করে মাটি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংরক্ষিত এই বনে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে পোলট্রি মুরগির খামার। রাতভর ডাম্পট্রাক আর এক্সকেভেটরের আনাগোনা স্থানীয়দের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়রা কিছু বলার সাহস পান না। সম্প্রতি বন বিভাগ অভিযান চালালেও ঘটনাস্থলে কাউকে না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যায়। তবে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির নামে পরদিন তারা মামলা করে।
জানা গেছে, আগর বাগানের মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির নাম মো. সেলিম। তিনি মাটি ব্যবসায়ী নুরুল আলম ওরফে নুরুর সহযোগিতায় এসব অপকর্ম করে থাকেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনের হলুদিয়া বড়ুয়া পাড়া সংলগ্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে তারা মাটি কেটে নিয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সৃজন করা আগর বাগানের গাছ কেটে উজাড় করা হয়েছে। এর আগেও কিছু আগর গাছ কেটে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এবার একাধিক আগর গাছ কাটার পাশাপাশি বিশাল একটি পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি হয়েছে বিশাল আকৃতির গর্ত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুর দিকে হলুদিয়া বড়ুয়া পাড়া সংলগ্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে এক্সকেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার শব্দ শোনা গেলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। কারণ, অভিযুক্ত মো. সেলিম এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। তখন অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন কয়েক বছরের মধ্যেই এ অঞ্চলটি পরিবেশগত ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। পরে স্থানীয়রা পাহাড় কাটার বিষয়টি বন বিভাগকে জানায়।
অভিযোগ রয়েছে, মো. সেলিম রাতের আঁধারে বন বিভাগের আগর বাগানে এক্সকেভেটর নামিয়ে পাহাড় কাটার কাজ করেন। এরপর সেগুলো মাটি ব্যবসায়ী নুরুল আলম ওরফে নুরুর সরবরাহ করা ট্রাকের মাধ্যমে রাতব্যাপী পার্শ্ববর্তী একটি খোলা জায়গা ভরাটের জন্য নিয়ে যান। এতে বন বিভাগের মূল্যবান অনেক গাছ হারিয়ে গেছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘রাতে পাহাড় কাটার সময় ট্রাকের সারি দেখা যায়। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। স্থানীয়দের সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর ডাম্প ট্রাক ও এক্সকেভেটর নিয়ে আসা হয়। সারা রাত মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ শেষ করে ভোরে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু গত ২৮ নভেম্বর রাতে ফরেস্টার ও বনরক্ষীরা যেখানে অভিযান চালালে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়।’
এ বিষয়ে মাটি ব্যবসায়ী নুরুল আলম বলেন, ‘সেলিম পাহাড়ের মাটি বিক্রি করছে। আমি শুধু পার্শ্ববর্তী একটি মাছের প্রজেক্টের মালিকের কথায় ডাম্প ট্রাক ও এক্সকেভেটর সরবরাহ করেছি। ঝামেলা হওয়ার শঙ্কায় পরে সেগুলো ওখান থেকে ফিরিয়ে এনেছি।’
অভিযুক্ত মো. সেলিম মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ওখানে আমি এক ব্যক্তির কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে মাছের প্রজেক্ট ও পোলট্রি খামার করেছি। মাঝেমধ্যে সেখানে আসা-যাওয়া করি। রাতের আঁধারে ওখানে কে বা কারা বন বিভাগের পাহাড় কেটেছে—এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, ‘আগর গাছ থেকে খুবই দামি সুগন্ধি তৈরি হয়। কিন্তু বনখেকোদের কারণে এই গাছের বাগান ধ্বংস হতে চলছে। এ ছাড়া একটি স্বার্থান্বেষী মহল পাহাড় কেটে পুরো এলাকার পরিবেশ ধ্বংস করছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে।’
বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তা বজলুর রশিদ বলেন, ‘বন বিভাগের মালিকানাধীন পাহাড় কাটার খবর পেয়ে গভীর রাতে আমরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পরদিনই তদন্ত করে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করা হয়েছে। বন ধ্বংসকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।’