ভুয়া দুদকের উৎপাতে অনেকটাই বিব্রত আসল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের নাম ব্যবহার করে ভুয়া সদস্যরা নানাভাবে প্রতারণা করছে। এদের ধরতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। এ জন্য গঠন করা হয়েছে বিশেষ টিম। বিশেষ টিমের সদস্যরা নিরলস অভিযান চালাচ্ছেন। চলতি বছরের ১১ মাসে (জানুয়ারি থেকে নভেম্বর) অন্তত ১৭ জন প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের কেউ কেউ আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবুও হাল ছাড়েননি দুদক কর্মকর্তারা। তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। ঢাকার অদূরে সাভারে গড়ে ওঠা আরেকটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে বিশেষ টিম। তাদের গ্রেপ্তারে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, দুদকের পরিচয়ে প্রতারণা রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যারা দুদকের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতারক চক্রের বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো প্রতারণা ও প্রতারক চক্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য থাকলে দুদকের টোল ফ্রি হটলাইন ১০৬ নম্বরে বা কাছের দুদক কার্যালয় অথবা স্থানীয় থানাকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। তবে অন্য সময়ের চেয়ে গত দেড় বছরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র তাদের অপকর্ম অব্যাহত রেখেছে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দুদকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নামে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলে সরকারি আমলা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও ধনী ব্যক্তিদের টার্গেট করে প্রতারণা করে আসছে। চক্রের সদস্যরা দুদকের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া নোটিশ তৈরি করে তা টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে পাঠায়। এরপর মোবাইলে কল করে নোটিশ ও অভিযোগের কথা জানায়। মোবাইল ফোনের নাম্বারটি ট্রু কলারে চেক করা হলে দুদকের আসল কর্মকর্তার ছবি ও দুদকের লোগো দেখা যায়। একই নাম্বার ফেসবুক সার্চ করেও দুদকের আসল কর্মকর্তার ছবি ও দুদকের লোগো দেখা যায়। ফলে যে কেউ মনে করবে নোটিশটি সত্য। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি চক্রের সদস্যরা। খোদ দুদক চেয়ারম্যান সেজেও প্রতারণায় নেমেছিল দুজন। সেই দুই ভুয়া দুদক চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারসহ বেশ কিছু প্রতারণার ঘটনা ইতোমধ্যে উন্মোচন করেছে দুদক। শুধু তা-ই নয়, দুদকের আদলে গড়ে ওঠা ‘দূর্নীতি নিবারণ সহায়ক সংস্থা’ নামে প্রতারণা করতে একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতারকদেরও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন দুদক কর্মকর্তারা। দুদক পরিচালক আবুল হাসনাতের নেতৃত্বাধীন বিশেষ টিমের সদস্যরা তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১৭ জন প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও অন্তত ২০ জন প্রতারককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ঢাকার অদূরে সাভার এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র এখন বেশ তৎপর। চক্রটি বেশ কৌশলে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা সরাসরি দুদকের শরণাপন্ন না হওয়ায় অপরাধীদের ধরতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে দুদকের বিশেষ টিমের সদস্যরা আশা করছেন, দ্রুতই প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
দুদক সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি দৈনিক খবরের কাগজে ‘ভুয়া দুদকের দৌরাত্ম্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতারক চক্রটি দুদকের আদলে ‘দূর্নীতি নিবারণ সহায়ক সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। তারা দুদকের লোগো নকল করে, দুদকের ইউনিফর্মের আদলে ইউনিফর্ম বানিয়ে আসল দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানের অনুকরণে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে অভিযান চালায়। চক্রের সদস্যরা এসব অভিযানে গিয়ে দুদকের সহযোগী সংস্থার নামে অর্থাৎ দুদকের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি ও আর্থিক সুবিধা নেয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে দুদক। প্রতারক চক্রটিকে ধরতে কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অভিযান জোরদার করা হয়। অভিযান পরিচালনায় দুদকের পরিচালক আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের বিশেষ টিম। টিমের সদস্যরা পরের দিন ৬ জানুয়ারি সেগুনবাগিচায় অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের তিন প্রতারককে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। তারা হলেন চক্রটির নেতা সৈয়দ রায়হান, তার অন্যতম সহযোগী সোলাইমান মুফতি এবং চক্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও ‘দূনীতি নিবারণ সহায়ক সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম সম্রাট। এরপর দুদক চেয়ারম্যানের ফেক আইডি খুলে প্রতারণা ও চাঁদাবাজি করার অপরাধে ২ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের দুর্ধর্ষ প্রতারক রেজওয়ানুলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেন দুদক কর্মকর্তারা। রেজওয়ানুল জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের একই অপকর্মে যুক্ত হন। তাকে গ্রেপ্তারে ২৩ মে ফের দিনাজপুরে অভিযান চালানো হয়। এ সময় রেজওয়ানুলের সহযোগী তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় দুদকের টিম। তারা হলেন মোবশ্বেরুল ইসলাম সাকিব, রিহান রাব্বি ও লাবু মিয়া। এ সময় কৌশলে পালিয়ে যান রেজওয়ানুল। তবে তাকে ৪ জুন আবার গ্রেপ্তার করেন দুদক কর্মকর্তারা। দুদক চেয়ারম্যানের নামে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ১৩ মার্চ আরেক প্রতারক শিমুলকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। দুদক কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয় প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে। তারা হলেন মো. সেলিম, তরিকুল ইসলাম, মো. আতিক, আব্দুল হাই সোহাগ ও সোহাগ পাটোয়ারী। সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হয় চাঁদপুরের মাফতুল হোসেনকে। তিনি নিজেকে দুদকের কর্মকর্তারা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।