বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট চলছে। এ কারণে অনেক পরিবারের নিয়মিত রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ। অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁও বেকায়দায় পড়েছে। ক্রেতার চাহিদামতো খাবার সরবরাহ করতে পারছে না। অনেকে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। বাজারে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়েছে। বাড়তি চাহিদার কারণে দামও বেড়েছে। নিরুপায় হয়ে সাধারণ মানুষ বেশি দাম দিয়েই এই চুলা কিনছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি তুরাগ নদের নিচে গ্যাসের পাইপলাইনে বড় ধরনের ফাটল এবং গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ঢাকাজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। ফলে নগরবাসী গ্যাস সিলিন্ডার, ইনডাকশন কুকার বা জ্বালানি কাঠ ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। এতে খরচ বাড়ছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের আমদানি কমে যাওয়া এবং শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এই সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।
ভোক্তারা দোকানে দোকানে ঘুরেও সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না। সিলিন্ডার পেলেও দাম দিতে হচ্ছে দেড়-দুই গুণ বেশি। অন্যদিকে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় লাইনের গ্যাসেও চাপ কম। অনেক এলাকায় দিনে লাইনে কোনো গ্যাসই থাকছে না।
সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও সেই দরে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি দামেও সিলিন্ডার মিলছে না। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এলপিজিনির্ভর রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানগুলোও গভীল সংকটে পড়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা ওয়াজেদ মিয়া বাসায় এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করেন। তার বাসায় সিলিন্ডারে থাকা গ্যাস শেষ হয়ে গেলে পরপর দুই দিন মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কয়েকটি এলাকায় এলপিজির সিলিন্ডার খুঁজেও কিনতে পারেননি। পরে শনিবার সকালে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক চুলা কেনেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাসায় কোনো রান্নাবান্না নেই। বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছি। এ জন্য বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনলাম।’
রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় ভাড়া থাকেন কলেজ শিক্ষার্থী জান্নাতুল ওয়াসি। তার বাসায় লাইনের গ্যাস ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তার বাসার লাইনে কোনো গ্যাস নেই। এ কারণে তিন দিন ধরে রান্না বন্ধ। গ্যাসের চাপ কবে ঠিক হবে নিশ্চয়তা নেই। নিরুপায় হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন তিনি।
সিঙ্গার শোরুমের বিক্রেতারা খবরের কাগজকে জানান, বাজারে ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড–এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি।
নিউ মার্কেটের ঢাকা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রানা মজুমদার বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে এই চুলা কিনছেন। আবার অনেকে বিকল্প চুলা হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। এমনিতে শীতের সময় বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। তারা কোম্পানির কাছে নতুন করে চাহিদা দিয়েছেন। বাকি দোকান এবং বিক্রয়কেন্দ্রগুলো অনেক বেশি সংখ্যায় বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি করছে।
যেসব কোম্পানি হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য তৈরি করে, তাদের প্রায় সবারই বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো, ফিলিপস প্রভৃতি ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা বেশি বিক্রি হয়। এর বাইরে নোভা, প্রেস্টিজসহ বেশ কিছু অপরিচিত ও নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলাও বাজারে পাওয়া যায়। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা রাজধানীর গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, মিরপুর-১–এ রকম কয়েকটি এলাকায় বেশি পাওয়া যায়।
মৃধা ট্রেডিংয়ের বিক্রেতা খবরের কাগজকে জানান, ইনডাকশন চুলার চেয়ে ইনফ্রারেড চুলার দাম কিছুটা বেশি। তবে দুটোই মোটামুটি সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা দামে কেনা যায়। অবশ্য এর চেয়ে বেশি দামের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলার দামও কাছাকাছি বা এর চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা কম। তবে এখন চাহিদা বেশি থাকায় পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলার কাছাকাছি দামেই নন-ব্র্যান্ডের চুলা বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো বিক্রেতা সুযোগ বুঝে ২০০-৪০০ টাকা বাড়তি দাম চাইছেন।
৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকার ইনডাকশন চুলা ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দোকানদারই বলেছেন, প্রায় সবগুলোর দামই অন্তত ৫০০ টাকা করে বেড়েছে।
রাজধানীর ক্রোকারিজের দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাদের বিক্রিও বেড়েছে কয়েক গুণ। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রেতারা চুলাপ্রতি দামও বাড়িয়েছেন প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এদিকে এলপিজির চাপ গিয়ে পড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর। দৈনন্দিন রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালির কাজ সারতে রাজধানীবাসীর বৈদ্যুতিক চুলা ছাড়া আর তেমন উপায় থাকে না।
অনেকে ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার পার্থক্য স্পষ্টভাবে জানেন না। ইনডাকশন চুলা সরাসরি তাপ তৈরি করে না; এটি তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ-নীতিতে কাজ করে। চুলার ভেতরের তামার কয়েল বিদ্যুৎপ্রবাহে পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এতে পাত্রের তলদেশে তড়িৎপ্রবাহ তৈরি হয়। ফলে তাপ সরাসরি পাত্রেই তৈরি হয় এবং চুলার উপরিভাগ তুলনামূলকভাবে গরম হয় না।
অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় ইনফ্রারেড হিটারের মতো শক্তিশালী হিটিং উপকরণ সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে। এই উপকরণ গরম হয়ে ইনফ্রারেড বিকিরণ ছড়ায়, যা সূর্যের আলোর মতো পাত্রকে গরম করে। এটি মূলত পুরোনো ইলেকট্রিক কয়েল চুলার আধুনিক রূপ, যেখানে তাপ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়।
দুই চুলার মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। কারণ এই চুলায় যেকোনো ধরনের পাত্রে রান্না করা যায়। বিপরীতে ইনডাকশন চুলায় রান্না করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট ননস্টিক পাত্র–যেমন লোহার পাত্র, কাস্ট আয়রন বা বিশেষ ধরনের স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, তামা, কাচ বা সিরামিকের পাত্র এতে কাজ করে না।
ইনডাকশন চুলার তাপ গ্যাসের চুলার চেয়ে বেশি। এর ফলে খুব দ্রুত পানি ফোটানো বা খাবার গরম করা যায়। এতে রান্নার সময় কম লাগে এবং বিদ্যুৎ খরচও কম হয়।