নির্বাচনি মাঠের বাতাসে এবার অন্যরকম এক গন্ধ। পোস্টার, ব্যানার আর মাইকিংয়ের চেনা কোলাহলের ভেতর চোখে পড়ছে নতুন সব মুখ- কম বয়সী, দৃপ্ত চোখ, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন রাজনীতির পুরোনো মঞ্চে তরুণদের এক নীরব প্রবেশ।
রাজপথে যারা এতদিন স্লোগান দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা মতপ্রকাশে সরব ছিলেন, এবার তাদের অনেকেই সরাসরি ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। কোনো কোনো আসনে তরুণ প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ রাজনীতিকদের দিকে। দলীয় মনোনয়ন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা—সব পথেই তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন পথেই তরুণরা ভোটের লড়াইয়ে নামছেন। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতা তাদের প্রচারের প্রধান ভাষা। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ও সরাসরি সংলাপের ওপর ভর করে তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। যদিও অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা তাদের বড় চ্যালেঞ্জ, তবু বিশ্লেষকদের মতে তরুণদের এই অংশগ্রহণ রাজনীতির ভাষা বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জয়-পরাজয়ের হিসাব ছাড়িয়ে এই নির্বাচন হয়ে উঠছে প্রজন্মের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বিএনপির বড় ভরসা তরুণরাই
অবিভক্ত ঢাকার মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। তিনি এখন বিএনপি চেয়ারম্যানের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। এবার বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ঢাকা-৬ (সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, কোতোয়ালি আংশিক) আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম‑৫ (হাটহাজারী‑বায়েজিদ) আসনে তৃণমূল লড়াইয়ের আভাস দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সদস্য ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলাল উদ্দিন।
বিএনপির আরেক প্রভাবশালী নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে চট্টগ্রাম‑৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। হুম্মাম বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান লড়বেন চট্টগ্রাম‑১০ (ডবলমুরিং) আসন থেকে।
বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমিন পুতুল নাটোর-১ (লালপুর‑বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পুতুল দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটি ও মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির সদস্য।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান বরিশাল‑৪ (হিজলা‑মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ভোলা‑৪ (চরফ্যাশন‑মনপুরা) আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। সানজিদা ইসলাম তুলি বিএনপি থেকে ঢাকা‑১৪ আসনের (ধানের শীষ) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামছেন। তিনি গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’‑এর অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচিত।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবিরা সুলতানা যশোর‑২ (ঝিকরগাছা‑চৌগাছা) আসনের প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোর‑৩ (সদর) আসনে বিএনপির টিকিট পেয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ (সদর একাংশ-কালীগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন।
দলের ঢাকা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ নারায়ণগঞ্জ‑২ (আড়াইহাজার) আসনে, বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহ-সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন বকুল নরসিংদী‑৫ (রায়পুরা), শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা আক্তার মাদারীপুর‑১ (শিবচর) আসনে, শেরপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা শেরপুর-১ (সদর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল সুনামগঞ্জ‑১ (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন।
বিএনপি জোটের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বিএনপির সমর্থন নিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসনে নির্বাচন করবেন। এ ছাড়া দলের ট্রাক প্রতীকে ৯৩ জন প্রার্থী বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বিএনপির শরিক দল হয়েও কোনো আসনে ছাড় পায়নি মাহমুদুর রহমান মান্নার দল নাগরিক ঐক্য। দলটির নেতারা ১১টি আসনে কেটলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাদের মধ্যে তরুণ প্রার্থী তিনজন।
মাথাল প্রতীকে নির্বাচন করছেন গণসংহতি আন্দোলনের ১৮ জন প্রার্থী। দলটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করছেন। সাকির স্ত্রী ও দলের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। দলটির অধিকাংশ প্রার্থীই তরুণ।
জামায়াত-এনসিপি জোট
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোটে এবার তারুণ্যের ছড়াছড়ি। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে; ফখরুদ্দিন মানিক ফেনী-৩ আসনে; ছাত্রশিবিরের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক সদস্য নূর মোহাম্মদ তাহের বগুড়া-৩ আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন।
এনসিপি জোট ও জোটের বাইরে ৩০টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে এনসিপি। এই ৩০ জন প্রার্থীর সবাই তরুণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এত বেশিসংখ্যক তরুণ প্রার্থী কোনো রাজনৈতিক দল দিতে পারেনি আগে। জুলাই অভ্যুত্থানে বড় ভূমিকা রাখা এই দলটিকে ঘিরে ভোটারদের একাংশের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে জোটের মনোনয়ন নিয়েছেন। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন। দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-৮ আসনে; যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নরসিংদী-২ আসনে; দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা‑৪ (দেবীদ্বার) আসনে; উত্তরাঞ্চলের প্রধান সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসন; সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া উপজেলা) থেকে জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন।
এনসিপি নেতাদের মধ্যে ডা. আবদুল আহাদ দিনাজপুর-৫ আসনে, সাইফুল্লাহ হায়দার টাঙ্গাইল-৩ আসনে, আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা-১৮ আসনে, মুহাম্মদ জাকারিয়া নোয়াখালী-২ আসনে, মো. আতাউল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে, সাঈদ মোস্তাফিজ সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে, এস এম সুজা উদ্দিন বান্দরবান আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন।
এ দুটি দলের বাইরে খেলাফত মজলিসের আতাউল্লাহ আমিন কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে, এলডিপির ওমর ফারুক চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন।
তরুণ স্বতন্ত্ররা ছেড়ে কথা বলবেন না
এবারের নির্বাচনে ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাদের স্বতন্ত্র প্রতীক সংখ্যা ৫৬টি নির্ধারণ করেছে। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে ৭৯ আসনে ৯২ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন। তাদের মধ্যে তরুণ নেতাদের বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবুও তারা থমকে যাচ্ছেন না।
পাবনা-৩ আসনে সাবেক এমপি ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম এবং পাবনা-৪ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘দল বাইরের একজনকে এনে আমাদের আসনে মনোনয়ন দিয়েছে, যা এলাকার মানুষ মেনে নেননি। তাই আমি আশা করি, দলমত নির্বিশেষে ভোটাররা আমাকে জয়যুক্ত করে তাদের পাশে থাকার সুযোগ দেবেন।’
ঢাকা-১৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সোহেল রানা জানিয়েছেন, তিনি ‘ব্যবসার রাজনীতির’ বদলে ‘সেবার রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা করতে চান।
এনসিপি ছেড়ে আসা নেতাদের মধ্যে তাসনিম জারাকে নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। ঢাকা-৯ আসনে তিনি ফুটবল প্রতীকে লড়ছেন। আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন তিনি। গতকাল ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির রাজনীতি দেখতে চাই, তার ভিত্তিতেই আমাদের প্রচার চলবে।’
জাপা ও বামদের কী হালহকিকত
জাতীয় পার্টি (জাপা) এবার ১৯৫টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ তরুণ। রাজনীতিতে আনকোরা এ তরুণ প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের দল সিপিবি ৬৩ আসনে; বাসদ ৩৭টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, এই প্রার্থীদের অধিকাংশই তরুণ। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, এই তরুণরা ভোটের মাঠ ছেড়ে আসবেন না।