ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় দিনের আলোয় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। পরে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। এই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এবারের নির্বাচনে ভোটের মাঠের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। হাদির মৃত্যুর দিন ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে অগ্নিকাণ্ডসহ সারা দেশে ঘটা আরও বিচ্ছিন্ন অনেক ঘটনা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়তে থাকে।
এমন বাস্তবতায় সরকার নির্বাচনকালীন আইন সংশোধন করে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার বিধান যুক্ত করে। সেই সুযোগে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকা প্রার্থীরা একের পর এক নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করতে থাকেন।
এদিকে গত মঙ্গলবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ চলাকালে রাজধানীর মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় ঘটে আরও চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। সেখানে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করে ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, হাতাহাতি এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। নির্বাচনি প্রচারের সময় যাতে আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে মিরপুর এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
মিরপুরের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত মোতায়েন একদিকে আশ্বাস জাগালেও অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠের উত্তেজনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় ভোটের মাঠে প্রচারে নামা প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে ভোটের পরিবেশ কতটা নিরাপদ? সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ঘিরে মাঠের পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের আস্থার প্রশ্নটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর পরই এমন হামলা শুধু একজন প্রার্থীকে লক্ষ্য করে নয়, বরং পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য একটি ‘ওয়ার্নিং সিগনাল’।
ভোটের মাঠে ১৯৮১ প্রার্থী, শুরুতেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের মাঠে নেমেছেন ৫১টি রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৩২ জন দলীয় প্রতীকে এবং ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। পাবনার দুটি আসনের চূড়ান্ত তালিকা যুক্ত হলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এত বড় নির্বাচনি প্রতিযোগিতার শুরুতেই সহিংসতার ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে–এই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ও প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
নিরাপত্তা চেয়ে ইসিতে প্রার্থীদের ভিড়
নিরাপত্তাঝুঁকির বাস্তবতায় সরকার নির্বাচনি আইন সংশোধন করে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার বিধান যুক্ত করেছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত ১০ জন প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এই তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলটির সাত শীর্ষ নেতা, গাজীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান, ঢাকা-১০ আসনে জেএসডি প্রার্থী সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল এবং পিরোজপুর-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. রুহুল আমীন দুলাল রয়েছেন।
ইসি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন আরও অনেক প্রার্থী, তবে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসি কর্মকর্তা বলেন, ‘আবেদনগুলোর ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে–শুধু শীর্ষ নেতারা নন, মাঠপর্যায়ের অনেক প্রার্থীও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ফেনী শহরের কেন্দ্রীয় বড় মসজিদ এলাকায় নির্বাচনি প্রচারের সময় আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ আসনের ১০-দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো নিশ্চিত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ঢাকায় নারীদের ওপর হামলা এবং চট্টগ্রামে র্যাব সদস্যের নিহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। মঞ্জু দাবি করেন, প্রশাসন যেকোনো বিভেদ না করার আশ্বাস দিলেও প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারের নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা নির্বাচনের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হবে।
সরকারের আশ্বাস: নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নয়
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এখানে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’ নির্বাচনের সময়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, আনসার, র্যাব, বিজিবি ও প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনের সময় পুলিশ, আনসার, র্যাব, বিজিবি মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আন্তঃবাহিনী সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নজরদারি থাকবে।
নির্বাচন ঘিরে পুলিশের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, ‘নির্বাচনি সহিংসতা বা ভয়ভীতি চলবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত।’ তিনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এত বড় পরিসরের নির্বাচন পরিচালনায় পুলিশকে একসঙ্গে সহিংসতা, গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইসির নির্দেশনা
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তায় সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, কমিশন নিয়মিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও ব্যক্তিদের বিষয়ে আলাদা নজর এবং এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রয়োজনে আরও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকের চোখে বড় দুর্বলতা
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম মনে করেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হলে ভোটারের বিশ্বাস ফিরবে না।’ তিনি বলেন, নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয় নয়, এটি আস্থার বিষয়। মাঠে সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে, প্রার্থী বা ভোটার যদি ভয় নিয়ে মাঠে নামেন, তাহলে নির্বাচন যত আয়োজনপূর্ণই হোক, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
ভোটারদের ভাবনা: উৎসব না আতঙ্ক?
নির্বাচন মানেই উৎসব–এই চিরচেনা ধারণা এবার অনেক ভোটারের মনে কাজ করছে না। মাঠে সহিংসতা, প্রার্থীদের ওপর হামলা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে টানাপোড়েন ভোটারদের মনে ভয় তৈরি করছে। অনেক ভোটার বলছেন, তারা ভোট দিতে চান, তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি নিতে নারাজ। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিন একই সময়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ঘটনা। ফলে প্রশাসনের জন্য এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।
এই নির্বাচন সফল করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রার্থী-ভোটার উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখা যাবে আগামী কয়েক দিনে। কঠিন এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে তারা আস্থা ফেরাতে পারবে কি না, সেদিকেই নজর দেশবাসীর।