আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এবার দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। যাদের বড় অংশ আবার তৃণমূল পর্যায়ের। নির্বাচনের পর কোন দল সরকার গঠন করবে, তাতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে তৃণমূলের এই নারী ভোটাররা। আর তাই নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দুই দলই নারীদের ভোট টানার চেষ্টা করছে।
তবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক. পছন্দের নারী প্রার্থী না থাকা; দুই. সহিংসতার ভয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া এবং তিন. প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারী ভোটার, যারা অন্যের সাহায্য ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম।
তাদের মতে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে নারীরা। কৃষি, তৈরি পোশাক এবং প্রবাসী আয়ে দেশের নারীরা অনস্বীকার্য অবদান রাখছেন। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন দেশের নারীরা। ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে এই নারীদের কোনোভাবেই আটকে রাখা যাবে না। নারীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, যেহেতু মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই এবার নারী। ফলে এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় অনেকখানিই নির্ভর করছে তাদের ভোটের ওপর। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম। ফলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা নারী ভোটারদের অনেকেই পছন্দের প্রার্থী না থাকায় ভোট দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। তবে দলীয় ভোটারদের ক্ষেত্রে সেই সমস্যা হবে না। দ্বিতীয়ত, বিগত নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে, সহিংসতার ভয়ে অনেক নারী ভোটার ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে ভয় পান বা পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও নারী ভোটারদের নিরুৎসাহিত করেন। এবারের নির্বাচনের আগেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, সামনে এই সহিংসতা আরও বাড়বে। ফলে এসব সহিংসতার মধ্যে নারীরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, সেই বিষয়ে সংশয় রয়েছে। তৃতীয়ত, অনেক প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারী ভোটার রয়েছেন। যারা অন্যের সাহায্য ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন না। এটাও একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, মোট নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। তাদের মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। এই হিসাবমতে মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় ২০ লাখ কম। এদিকে দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে এবার নারী প্রার্থী মাত্র ৭৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ৬১ জন আর স্বতন্ত্র ১৭ জন। জামায়াতসহ ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বিএনপি ১০ জন নারীকে প্রার্থী করেছে। এর বাইরে সিপিবি, বাসদসহ বাম দলগুলো কয়েকজন নারীকে প্রার্থী করেছে।
এই ভোটারদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেখা দিয়েছে টানাপোড়েন। কোনো কোনো দল নারী ভোটারদের কাছে টানতে ধর্মের ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ আবার ফ্যামিলি কার্ডসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাও বলছে। সম্প্রতি এক্স হ্যান্ডলে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি পোস্টের জেরে মূলত নারী ভোটার ও প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। সেখানে তিনি কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে শফিকুর রহমানের আইডি হ্যাক হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে তিনি আবার বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে নারীদের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা হবে।
আমিরের এমন বক্তব্যে কর্মজীবী নারীরা বলছেন, তারা কি জামায়াতের আমিরের কাছে এই ভিক্ষা চেয়েছে?
এদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি রাজনৈতিক দল কর্মজীবী নারীদের নিয়ে যে মন্তব্য করেছে, তা কলঙ্কজনক। একটি রাজনৈতিক দল এই যে বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে তারা কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়, সেই কথা তারা বলেছে। তিনি বলেন, জামায়াত আবারও দেশে ১৯৭১ সালের মতো নারীদের সম্মানহানির চেষ্টায় মত্ত।
এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘একটি দলের প্রধান কর্মজীবী নারীদের যেভাবে অবমাননা করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ১৯৭১ সালে দেখেছি, দলটি কীভাবে আমাদের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানিতে জড়িত ছিল। আবারও তারা একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে। তাদের কাছে আমাদের মা-বোনেরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে?’
এ প্রসঙ্গে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘সব দলই যেন নারী ভোটারদের নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করেছে। এক দল নারীদের নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিচ্ছে, আরেক দল সেটিকে অস্ত্র বানাচ্ছে। এ রকম হলে দেশে ভবিষ্যতে নারীরা কতটুকু নিরাপত্তা পাবে, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’ নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফেসবুক বা এক্স হ্যাক হতে পারে; কিন্তু বিদেশি গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, যা বিশ্বের সব মানুষ দেখেছে। এই ধরনের নারীবিরোধী বক্তব্য নারীদের অবশ্যই আশাহত করেছে।’