‘লেবুর হালি ১০০ টাকা। বেগুন ও শসার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। কাঁচা মরিচ ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। রমজানে ব্যবহার্য প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। বেশি দামে কেনা, তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। খুবই খারাপ লাগছে।’ এভাবেই রমজান মাস শুরুর দুই দিন আগে সবজির বাড়তি দামের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. জয়। শুধু সবজিই নয়, রমজানে পেঁয়াজ, খেজুর, ছোলা, ডাবলি, মাছ, মাংসের দামও বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে ৬৫ টাকায় ঠেকেছে। খুচরা পর্যায়ে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৩৫০ টাকা ও ব্রয়লার ২০০ টাকা ছুঁয়ে গেছে। দাম বাড়াতে বিভিন্ন কোম্পানি খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, আগের মতোই অধিকাংশ দোকানে রমজানে ব্যবহার্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী লেবু, বেগুন, শসা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, খেজুর, ছোলা, ডাবলি, চিনির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। তারপরও দাম বেড়ে গেছে। তবে এসব পণ্যের পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়েনি। খুচরা ব্যবসায়ীরাই বেশি দাম আদায় করছেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইতে সম্প্রতি সভা করেন ব্যবসায়ীরা। সেখানে তারা বলেছিলেন, রমজানে পণ্যের সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে। দাম বাড়বে না। তারপরও বেড়ে গেল। অন্য বছরের মতো এবারও কথা রাখলেন না তারা। ক্রেতারা বলছেন, বাজারে নজরদারি না থাকায় যে যার মতো দাম আদায় করছেন।
মুরগির দামের ব্যাপারে কাপ্তান বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. রিয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় মুরগির দাম তেমন বাড়েনি। আকারে বড় ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা ও ছোট ব্রয়লার ১৬০ টাকা কেজি এবং সোনালি মুরগি ২৮৫ থেকে ৩১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সেই ব্রয়লার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে ১৯০ থেকে ২১০ টাকা ও সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। হাতিরপুল বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. ফয়েজ বলেন, ‘ভোটের পর থেকে বেশি দামে কেনা। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। সোনালি ৩৫০ টাকা ও ব্রয়লার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।’ টাউন হল বাজারের ব্রয়লার হাউসের স্বত্বাধিকারী মো. বেল্লাল হোসেনও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘ভোটের পরে সরবরাহ কমেছে। এ জন্য দামও বেশি। আবার রমজান উপলক্ষে বিক্রিও বেড়েছে। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’ অন্য বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। রমজানকে কেন্দ্র করে গরু ও খাসির মাংসেরও দাম বেড়ে গেছে। টাউন হল বাজারের মাংস বিক্রেতা মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘আগে ৭৮০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি করতাম। ভোটের পর দাম বেড়ে গেছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে অর্থাৎ ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
মাছের দামও চড়া
রমজানকে কেন্দ্র করে মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মাছ বিক্রেতারা। তারা বলেন, রুই ও কাতল মাছের কেজি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়ে গেছে। কাজলি, ট্যাংরাসহ নদীর মাছের দামও বেড়ে গেছে। এসব মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার কমে মেলে না। এমনকি তেলাপিয়া মাছের দামও বেড়ে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাছ বিক্রেতা রাজিব বলেন, ‘আর দুই দিন পরই রমজান। চাহিদা বেড়েছে। এ জন্য দামও চড়া।’
সবজির দামের ব্যাপারে হাতিরপুল বাজারের মো. অপুসহ অন্য সবজি বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোটের কারণে ঢাকাতে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। তার প্রভাবে সবজির দামও চড়া। তবে আগের তুলনায় রমজানে যেসব পণ্য বেশি দরকার তার দাম বেড়েছে।’ টাউন হল বাজারের জয়সহ অন্য সবজি বিক্রেতারাও বলেন, ‘অন্য বছরের মতো এবারও দাম বেড়ে গেছে। জয়ের সবজির দোকানে সাদিয়া নামে এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কী একটা অবস্থা, লেবুর হালি ১২০ টাকা। এত দাম কেন? বাজারে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান নেই। এ সুযোগে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।’
পাইকারির দ্বিগুণ দামে খুচরায় পেঁয়াজ বিক্রি
রমজানে পেঁয়াজের ব্যবহার বেড়ে যায়। এ কারণে দামও বেড়ে গেছে। কয়েক দিন আগে পেঁয়াজের কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল বিভিন্ন বাজারে খুচরা পর্যায়ে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে দেখা যায়। নিউ মার্কেটের জসিম উদ্দিন বলেন, ‘চাহিদা বেড়ে গেছে। এ জন্য দামও বাড়ছে।’ টাউন হল বাজারে মো. অলিসহ অন্য পেঁয়াজ বিক্রেতারাও জানান, আগের তুলনায় দাম বেড়েছে, ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
তবে কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজার শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতারা জানান, আগের তুলনায় বাড়েনি পেঁয়াজের দাম। আগের মতোই বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মাজেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের যথেষ্ট সরবরাহ বেড়েছে। দামও সহনীয় পর্যায়ে আছে। ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে অনেক বেশি দামে এই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি কী করব। ভোক্তা অধিদপ্তরকে অভিযানে নামতে হবে। তবেই দাম স্বাভাবিক হবে।’
সয়াবিন তেলের সঙ্গে পোলাওয়ের চাল ধরিয়ে দিচ্ছে কোম্পানি
অন্য পণ্যের মতো রমজানে সয়াবিন তেলের চাহিদাও বাড়ে। বোতলজাত তেল ১৯৫ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি সয়াবিন তেলের সঙ্গে পোলাওয়ের চাল ও সরিষার তেল ক্রেতাকে ধরিয়ে দিয়ে জোর করে বিক্রি করা হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের রব স্টোরের মো. আব্দুর রব, নিউ মার্কেটের মোক্তার স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মোক্তার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, আগের তুলনায় সব কোম্পানির তেল নেই। টাউন হল বাজারের বুলবুল স্টোরের মো. বুলবুল অভিযোগ করে বলেন, ‘রমজান মাস এসে গেছে। কিন্তু কয়েক দিন ধরেই সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন ডিলাররা। সব কোম্পানির তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার এডিবল ওয়েল কোম্পানির রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেলের সঙ্গে পোলাওয়ের চাল ও সরিষার তেল নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব না নিলে তেল দেওয়া হচ্ছে না।’