দেড় বছর পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের জট খুলতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে কালো মেঘ জমে। বাংলাদেশে নির্বাচনের পর সেই মেঘ কাটতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে দিল্লির পক্ষ থেকে যেমন আগ্রহ দেখানো হয়েছে, তেমনি ঢাকার পক্ষ থেকেও নতুন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পর্কের কালো মেঘ সরে যাবে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় এক কূটনীতিকের মতে, গত দেড় বছর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। এ জন্যই দায়বদ্ধতাহীন কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে রাজি ছিল না ভারত। এই সময়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ভারতবিরোধী প্রচারণাকে উসকে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘ভারত সরকার বারবার বলে আসছে, বাংলাদেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে গঠিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত আছে দিল্লি। নির্বাচনে জয়ী দল বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। শিগগিরই বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানসহ অন্য জটিলতাগুলো স্বাভাবিক হয়ে আসবে। শুধু তা-ই নয়, আগের যেকোনো সময়ের সময়ের তুলনায় আগামী সম্পর্ক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠ হবে। তবে এই প্রক্রিয়াটা শিগগিরই শীর্ষ পর্যায়ের সফরের সময় ঘোষণা দেওয়া হবে। শীর্ষ পর্যায়ে সফর বিনিময়ও শুরু হতে পারে।’ তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে দাওয়াত দিয়েছেন। কয়েক মাসের মধ্যে এ ধরনের সফর হবে। এ সময় ধাপে ধাপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো কেটে যাবে।
দিল্লির আরেকটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক ধারা শুরু হয়েছে। এতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবে ভারত। যদিও বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। কারণ আগামী ‘এপ্রিল-মে’ মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের আগে বাংলাদেশিদের ভিসা সহজীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা ইতোমধ্যে শুরু করেছে দিল্লি।
এদিকে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বন্ধ থাকা বাংলাদেশের ভিসা গত শুক্রবার থেকে ফের দেওয়া শুরু হয়েছে, যা ভারতের প্রতি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সম্পর্ক বৃদ্ধির ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের কূটনীতিকদের মতে, নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিএনপি ইস্যুতে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। ভারত চাইছে আগের বিরোধ এবং শেখ হাসিনা ইস্যুটিকে পাশ কাটিয়ে আগামীর নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে। এ জন্য ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টেলিফোন করেন ও অভিনন্দনবার্তা জানান। এ ছাড়া প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ছিল সেই সম্পর্কোন্নয়নেরই গ্রিন সিগনাল। এরপর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পরও অভিনন্দন জানান মোদি। এ ছাড়া মোদি তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমানের নাম উল্লেখ করে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। বিষয়গুলো নিয়ে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন নিয়মিত বিএনপি সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।