পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর বেশির ভাগ শপিংমল ও মার্কেটে এখন মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে শপিং জোনগুলোতে মানুষের আনাগোনা বেশ। তবে মার্কেটে আসা এসব মানুষের মধ্যে কতজন প্রকৃত ক্রেতা, আর কতজন দর্শনার্থী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর ধানমণ্ডি ও জিগাতলা এলাকার কয়েকটি শপিংমলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদে ক্রেতা আসছেন ঠিকই, তবে কিনছেন কম। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ এখন কেনাকাটায় অনেক বেশি সতর্ক। বিক্রেতারা জানান, ১৫ রমজানের পর থেকে ক্রেতার ভিড় বেড়েছে। তারা পণ্য দেখছেন, দাম যাচাই করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক লোকই কেনাকাটা না করেই ফিরে যাচ্ছেন।
রাজধানীর আজিমপুর থেকে ধানমন্ডির ২ নম্বরে রাইফেল স্কয়ার শপিংমলে সপরিবারে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন ব্যবসায়ী আকমল হোসেন। তার দুই হাতে কয়েকটি শপিং ব্যাগ। কী কী কিনেছেন জানতে চাইলে খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘প্রতি ঈদেই পরিবারের পাশাপাশি নিকট আত্মীয়দের জন্য কেনাকাটা করেন। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।’ তিনি বলেন, ‘এবার বাজেট কমিয়ে কিনছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট বাড়ছে, ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে। তাই ছেলেমেয়েদেরও বলেছি, অতি প্রয়োজনীয় পোশাক ছাড়া বাড়তি কেনাকাটা না করতে।’
একই মার্কেটে ঢাকার দোহার থেকে ঈদের শপিংয়ে এসেছেন দুই বোন রেখা ও নেহা। তারা জানান, গত তিন দিন ধরে ঈদের কেনাকাটা করছেন। তবে পছন্দের সঙ্গে দামের সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে যত ধরনের পোশাক কিনতে চেয়েছিলেন সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। কেনাকাটা অতি প্রয়োজনীয় কিছু আইটেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
ক্রেতাদের এমন সতর্ক মনোভাবের প্রভাব পড়েছে শপিংমলগুলোর বিক্রিতেও। বিক্রেতারা জানান, ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও কেনাকাটার হার আগের বছরের তুলনায় বেশ কম। দেশীয় ব্র্যান্ডের ফ্যাশন হাউস কে-ক্রাফটের জিগাতলা শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, তিনি প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তবে এবারের ঈদবাজার বিগত দুই বছরের চেয়ে খারাপ। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অন্যান্য বছর আমরা যত সেল করেছি এবার সেরকম হচ্ছে না।’ তিনি জানান, দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম ‘দেশি দশ’-এর আউটলেটগুলোতেও বিক্রি মোটামুটি ভালো থাকলেও আগের বছরের তুলনায় তা কম।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর আমরা ভেবেছিলাম বাজারে স্বস্তি ফিরবে এবং বিক্রি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ ইত্যাদির প্রভাব ঈদের কেনাকাটায়ও পড়েছে। ক্রেতারা আসছেন ঠিকই, তবে যতটা আশা করা হচ্ছিল, ততটা নয়। আর এলেও অনেকেই শুধু ঘুরে দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, কেনাকাটা কম করছেন।’
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমল ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিক্রেতাদের মতে, মার্কেটে আসা প্রায় অর্ধেক মানুষই পণ্য না কিনে ফিরে যাচ্ছেন। রং বাংলাদেশের বিক্রেতা সাকিব রায়হান বলেন, ১৫ রমজানের পর থেকে ক্রেতার উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। তবে বিক্রি এখনো আশানুরূপ নয়। দিনে এখনো ক্রেতা কম থাকে, ইফতারের পর কিছুটা বাড়ে। অনেকেই পোশাক দেখেন, কিন্তু দাম শুনে আগ্রহ হারান। ফলে গত বছরের তুলনায় বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কম।’ তার মতে, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব। আমদানি করা সুতার দাম বাড়ার কারণে পোশাকের দামও কিছুটা বেড়েছে।
সানভিস বাই টনির ম্যানেজার শান্তও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন এবার ঈদের বাজার ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহখানেক ধরে ক্রেতা বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু অনেকে দরদাম করেই চলে যাচ্ছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষই কিছু না কিনে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে এবার দোকানের খরচ উঠবে কি না, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।’
রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, নারী-পুরুষ ও শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে ভিড় থাকলেও বিক্রি তুলনামূলক কম। নতুন ডিজাইনের পাকিস্তানি থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং শিশুদের পোশাকের প্রতি আগ্রহ বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ, একই ধরনের পোশাকের দাম অনেক জায়গায় বেশি রাখা হচ্ছে। ফলে অনেকেই একাধিক দোকান ঘুরে দাম যাচাই করছেন। কেউ কেউ আবার শপিংমলের বদলে ফুটপাত বা স্বল্পমূল্যের দোকানের দিকে ঝুঁকছেন।
অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, একটি শাড়ির দাম আড়াই হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। পাকিস্তানি থ্রি-পিস পাওয়া যাচ্ছে ২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে। তবে মেয়েদের পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বেশি, যার দাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। তবে গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদে পণ্যভেদে দাম ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ–সব মিলিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। ফলে উৎসবের কেনাকাটাতেও অনেক পরিবার এখন হিসাব করে ব্যয় করছে। তবে ব্যবসায়ীরা এখনো আশাবাদী। তাদের মতে, ঈদের শেষ সপ্তাহে সাধারণত কেনাকাটার চাপ বেড়ে যায়। শেষ মুহূর্তে ক্রেতারা কেনাকাটায় নামলে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের।