বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হবে। বিশেষভাবে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ঝুঁকি আমলে এনে রাজস্ব আদায়, ভর্তুকি, মূল্যস্ফীতিসহ খাতভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। বাজেট হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হবে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো, ভর্তুকি সমন্বয় করা ও কৃষিনির্ভর শিল্প খাতে জোর দেওয়া হবে। অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব আদায় কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। কর এবং করবহির্ভূত আয় বাড়াতে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জ্বালানিসংকট নিরসনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। মেগা প্রকল্পে গুরুত্ব কম দিয়ে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নতুন পদক্ষেপ জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে এসব নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশ সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নির্দিষ্ট শ্রেণি বা ব্যক্তিকে সুবিধা না দিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ব্যয়ে বিলাসিতা পরিহার করে কৃচ্ছ্র সাধনের ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। বাজেটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে বিভিন্ন খাতের প্রস্তাব নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট তৈরি করতে কাজ চলছে। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ এবং শিক্ষা খাতের উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব থাকবে। অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার থাকছে। আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারে গতি আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বেসরকারি খাতের প্রাধান্য দেওয়া হবে। বেসরকারি খাতের ঋণের শর্ত সহজ করা এবং পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করতে এবং অর্থনীতিতে প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি গতানুগতিক ধারার বাইরে ‘সবার জন্য অর্থনীতি’ মডেলে বাজেট সাজানো হবে।
সূত্র জানায়, পুঁজিবাজারে প্রবাসীদের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষভাবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের লেনদেনে অংশ বাড়াতে চেষ্টা থাকবে। পুঁজিবাজার যেন সাধারণ মানুষের বাজারে পরিণত হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ থাকবে আগামী বাজেটে। পুঁজিবাজারে গতি আনতে মার্চেন্ট ব্যাংক, ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোয় স্বচ্ছতা আনতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি লাভ করার সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে এমন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আমরা ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ের চিন্তাভাবনা করছি যে কীভাবে প্রবাসীরাও পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারেন। পুঁজিবাজারে কীভাবে আস্থা অর্জন করা যায়, আমরা সেই চেষ্টাও করছি। আমরা অতীতে লক্ষ করেছি অন্য সরকারের আমলে বারবার এই বাজারে কারসাজি হয়েছে। ফলে জনগণ পুঁজিবাজারে কোনো আস্থা পায়নি। এই বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে কর ও করবহির্ভূত দুই ধরনের আয় বাড়াতে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের কোনো ধরনের চাপ থাকবে না।
গতকালও প্রধানমন্ত্রীর বাজেটবিষয়ক নির্দেশ সামনে রেখে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এবং বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকালের এই বৈঠকে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআর কর্মকর্তারা কী কৌশল নির্ধারণ করেছেন, আগামী বাজেট নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ এবং দেশের বাস্তব রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রাজস্বের আওতা বাড়াতে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের কর্মকৌশল শোনেন। চলতি অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি কেন হয়েছে, এনবিআর ঘাটতি থেকে কেন বের হতে পারছে না এবং কোন কোন খাতের রাজস্ব আদায় বাড়ছে না তা নিয়েও আলোচনা করেন অর্থ উপদেষ্টা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দের অর্থ হলো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে, বৈষম্য না দেখিয়ে এলাকা, বয়স, লিঙ্গ, সক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেকের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নতুন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়ন করলে আমি স্বাগত জানাব। এরই মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি যে, অর্থমন্ত্রী গতানুগতিক ধারায় বাজেট প্রণয়ন না করার কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করার জন্য বলব। এতে সমগ্র অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে।