ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে হামের রোগী আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় শয্যা ও আইসোলেশন সুবিধার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় আশঙ্কাজনক হাম রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে মোট ৩৭৬ জন হামের রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের ৫৬টি আইসিইউ শয্যার সব কটিই ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালটিতে উত্তর সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটি তাদের আওতাধীন হলেও এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু হাসপাতালে কতজন হাম রোগী ভর্তি হচ্ছে বা ছাড়পত্র পাচ্ছে, এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নিয়মিতভাবে সিটি করপোরেশনকে জানানো হয় না।
এর ফলে সিটি করপোশনের কর্মকর্তারা তাদের আওতাধীন কোন এলাকায় কতজন শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে সঠিক ধারণা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে কোন এলাকায় শিশুদের জন্য পোলিওসহ অন্যান্য টিকাদান বা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য ঘাটতি কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, করোনা মহামারির সময় ব্যবহৃত ডিএনসিসির আইসোলেশন সেন্টারকে এখন হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। ফলে অনেক অভিভাবক অসুস্থ শিশুদের নিয়ে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসপাতালের বহির্বিভাগেও (আউটডোর) রোগীর ভিড় চোখে পড়ার মতো। তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৭৫ জন রোগী।
হাসপাতালের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত ৩৭৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন, ১৮৭ জনকে হাম ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৫৩ জন আইসিইউতে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৫ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে এক শিশু।
তবে রোগীদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, হাম রোগীদের তথ্য সরাসরি সিটি করপোরেশনের কাছে থাকে না, এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে ডিএনসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মাহমুদা আলী খবরের কাগজকে জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীদের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনে সরাসরি তথ্য পাঠায় না। কেন বা কী কারণে আমাদের তথ্য দেওয়া হয় না, তা পরিষ্কার করে কিছু বলা হয় না।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রশাসক স্যার রবিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।’
এমন সমন্বয়হীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ায় জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটি নতুন নয়। করোনাকাল থেকে এমন জটিলতা রয়েছে। হাসপাতালটি সিটি করপোরেশনের হলেও পরিচালনা করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। তাদেরই লোকবল রয়েছে। আমরা চাইলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা আর হয়ে ওঠেনি।’
তিনি বলেন, ‘উত্তর সিটির প্রশাসকসহ আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারাও নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন, প্রশাসক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে এসব সমাধানের চেষ্টা করছেন।’
হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাম শনাক্ত করতে মোট ১০৪টি নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৮২টির রিপোর্ট পাওয়া গেছে, যেখানে ৫৮টি পজিটিভ এবং ২৪টি নেগেটিভ এসেছে। এখনো ২২টি রিপোর্ট অপেক্ষমাণ রয়েছে।
এদিকে শুধু ডিএনসিসি হাসপাতালেই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হলেও রোগীর চাপে বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডেই আক্রান্তদের রাখা হচ্ছে। এতে করে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, একজন আক্রান্ত শিশু থেকে ১২-১৫ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ইতোমধ্যে অন্য রোগ নিয়ে হাসপাতালে এসে অনেক শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইতোমধ্যে ৫৬টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশালসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও এই কার্যক্রম চালু হবে।
এদিকে গত ২০ দিনে (অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল) সন্দেহজনক হাম রোগে ১১৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদের মধ্যে ১৭ জন নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যুর সংখ্যা ৬১ পর্যন্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে ৯২৯ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, এমন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭০ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায়ই হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪১০ জন এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা ৪০০-এর নিচে নেমে আসে। অথচ গত ২০ দিনে ৯২৯ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৭০। সেই তুলনায় চলতি সময়ে মাত্র ২০ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।