ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ঈশ্বরগঞ্জে আ.লীগের সাবেক এমপির ফ্যাক্টরিতে লুটপাট ১১ মামলার আসামি বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা বুলবুল আটক বম সম্প্রদায়ের এক অসুস্থ নারীকে হেলিকপ্টারযোগে উদ্ধার করল সেনাবাহিনী উত্তরায় ভূমি গ্যালারিতে চিত্রপ্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোনালদো-মেসিদের মতো খেলো, অলিম্পিকে ভালো ফল চাই: প্রধানমন্ত্রী ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে গোপনে মরিয়া ছিলেন ট্রাম্প প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরেও যাবেন: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যুক্তরাজ্যকে নেতৃত্বের ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অসাধারণ কৃতিত্ব: ৮ মাসে কোরআন হিফজ, সংবর্ধিত আল-আমীন ব্রাজিল ম্যাচ জেতায় মাথা ন্যাড়া করলেন আর্জেন্টিনার সমর্থক ফরিদপুরে ‘গে গ্রুপ’ ইস্যুতে ৩ জন আটক জামায়াত গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল ব্যস্ত জীবন, ভার্চুয়াল বিনোদন: আমরা এখন কোন পথে? লেবাননে হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা তেহরানের রাবি প্রেসক্লাবের সভাপতি ধ্রুব-সম্পাদক জিসান বরিশাল বিভাগ এসএসসি ১৯৮৬ বাংলাদেশর দিনব্যাপী নৌ-বিহার আগস্টে টানা ৪ দিনের ছুটির সুযোগ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে মাতোয়ারা ‘প্রচেষ্টা’র এক দিন জিয়াউর রহমান জনগণের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও থামেনি হামলা, লেবাননে নিহত ১৬ হরিণাকুণ্ডুতে আ.লীগ–বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ১৬ ফেরদৌস ওয়াহিদ ও সাঈদা শম্পার ‘মন বোঝে না’ চট্টগ্রামে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির আহ্বান ভূমি প্রতিমন্ত্রীর ‘বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার’ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান মনিরুল, মহাসচিব আমান কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র বরেন্দ্র সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হওয়ার আহ্বান ভূমিমন্ত্রীর বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিলের স্মরণসভা ইবি ছাত্রদলে পদ পাচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মীরা! প্রাথমিক পরীক্ষায় শিশুদের থেকে ফি আদায় প্রসঙ্গে

টেকনাফে মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
টেকনাফে মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে মানব পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য। বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ  ও র‌্যাবের অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার ও পাচারকারীরা আটক হলেও থেমে নেই মানবপাচার। পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে উপজেলার বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছে। সাগরে প্রায়ই মানববোৱঝাই ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে স্বজনহারা পরিবারের সংখ্যা।

টেকনাফ পৌর শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ায় মো. ইউসুফের বাড়ি। তার বড় ছেলে মো. রিদুয়ান (২৭) একটি ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পথে ট্রলারটি সাগরে ডুবে যাওয়ার পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। সেই শোকে পাথর বাবা ইউসুফ।

রিদুয়ানের বাবা মো. ইউসুফ বলেন, ‘আমার  ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবার বড় সন্তান রিদুয়ান। সে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি আসে। এরপর এলাকার এক ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কচ্ছপিয়া এলাকার আরেক অন্যতম মানব পাচার চক্রের সদস্য দালাল জাফরের মাধ্যমে সাগরপথে বড় ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা করে। ট্রলারে ওঠার পরও দালালের মাধ্যমে কথা হয় তার সঙ্গে।’

মো. ইউসুফের দাবি, ৯ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ২৫০ জনের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হয় ৯ জন। কিন্তু তাতে রিদুয়ান নেই। এখন ছেলের লাশের অপেক্ষায় বাবা।

নিখোঁজ রিদুয়ানের মা শাহিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে বিয়ে করেছে এখনো এক বছর হয়নি। তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যায় সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না আমার ছেলের। দালালের মাধ্যমে যেতে চেয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সাগরে মাঝপথেই ডুবে গেল সে স্বপ্ন। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমার ছেলের লাশটি চাই। আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, সে জন্য দালালদের খুঁজে বের কঠিন শাস্তি দেওয়া হোক।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাচারকারীরা টেকনাফের বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকাকে নিয়মিতভাবে মানব পাচারের কাজে ব্যবহার করছে। 

চিহ্নিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবরাং ইউনিয়নের শাহ পরীরদ্বীপ, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলাচর, পশ্চিমপাড়া এবং সাবরাং কাটাবনিয়া নৌঘাট, খুরেরমুখ, মুন্ডার ডেইল, বাহারছড়া নৌঘাট। এ ছাড়া নোয়াখালীপাড়া নৌঘাট, শীলখালী নৌঘাট, বড় ডেইল নৌঘাট, কচ্ছপিয়া নৌঘাট, মাথাভাঙ্গা নৌঘাট এলাকাও ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতলী নৌঘাট, লম্বরী নৌঘাট, হাবিবছড়া নৌঘাট, রাজরছড়া নৌঘাট এবং মিঠাপানির ছড়া নৌঘাটও এ ধরনের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। 

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড শাহ পরীরদ্বীপ বিসিজি আউটপোস্টের কোস্টগার্ডের চিফ পেটি অফিসার এম শামছুল আলম মিয়ার বাদী হয়ে করা এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ এপ্রিল দুপুর ১টায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় কয়েকজন মানুষকে দেখতে পায়। তারা ড্রাম ও কাঠের টুকরা ধরে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। পরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে জাহাজটি। অভিযানে মোট ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি এবং এক নারীসহ ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন। উদ্ধারকৃতরা টেকনাফ এবং উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এফবি তানজিনা সুলতানা নামক একটি বড় ফিশিং বোটে করে তারা গত ৪ এপ্রিল অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পথে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বোটটি ডুবে গেলে তারা সমুদ্রে ভাসতে থাকেন। পরে উদ্ধারকৃতদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

কোস্টগার্ডের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, উদ্ধারকৃত ৯ জনের মধ্যে ৬ জন মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত এবং বাকি ৩ জন পাচারের শিকার। এ তথ্যের ভিত্তিতে ১১ এপ্রিল রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে ৬ মানব পাচারকারীকে আটক করে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, শাহ পরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকসহ সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে দালালদের মাধ্যমে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব স্থাপন বা দাওয়াতের কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়, পরে কৌশলে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তুলে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের পাহাড়ি এলাকায় ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এরপর তাদের একটি অংশকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন নৌঘাটগুলোকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় আনলে মানব পাচার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীদের একটি চক্রে ২০-৩০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এদের কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আস্তানায় নিয়ে যায়, আবার কেউ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে নৌকায় করে সাগরের মাঝপথে পাঠিয়ে দেয়। চক্রের বড় গডফাদাররা গোপন আস্তানায় অবস্থান করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ অর্থ লেনদেন করা হয় বিকাশের মাধ্যমে।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল, সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, কচ্ছপিয়া এবং রাজারছড়া এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। প্রায় ২৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রার প্রায় চার দিন পর এটি আন্দামান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর তারা পানির ড্র্রাম, তেলের ট্যাংক, ফোম ও কাঠ ধরে প্রায় দুই দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনায় এখনো অনেক যাত্রীর খোঁজ না মেলায় স্বজনদের মধ্যে গভীর শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

এ ছাড়া জানা যায়, ভিকটিমরা মায়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী, যারা টেকনাফ এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের আর্থসামাজিক দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে অপহরণ, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং নারী পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইন ২০১২-এর ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আটককৃতদের সঙ্গে আরও ১০-১৫ জন অজ্ঞাতনামা সদস্য একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন প্রলোভন যেমন উন্নত জীবনযাপন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং অবিবাহিত নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করছিল।

আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একমাত্র নারী উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এর বাসিন্দা রাহেলা বেগম জানান, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে তার খালাতো ভাই ক্যাম্প থেকে দালাল চক্রের আস্তানায় নিয়ে যান। এরপর গত ৪ এপ্রিল তারা মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি বলেন, যাত্রার চার দিন পর হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি ডুবে যায়। ওই ট্রলারে প্রায় ২০ জন নারী ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি একটি ফোম ও কাঠ ধরে কোনোভাবে ভেসে থাকেন। পরে একটি জাহাজ তাকেসহ আরও ৯ জনকে উদ্ধার করে।

রাহেলা বেগম আরও জানান, এই দুর্ঘটনায় তার খালাতো ভাই মারা গেছেন এবং ট্রলারে থাকা আরও অনেকে সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবিতে উদ্ধার হওয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দার মো. রফিক জানান, উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ২ এপ্রিল তাকে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে একটি ঘরে আটকে রেখে তার মুখ, হাত ও পা বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর দুই দিন পর গভীর রাতে একটি ছোট ট্রলারে তুলে সাগরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে আরেকটি বড় ট্রলারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে প্রায় ২৪০ জন ভুক্তভোগী এবং ২০ জন দালাল ছিল বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল সকাল ৫টার দিকে হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হয়। একের পর এক ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। অনেকেই মারা যান, কেউ কেউ পানিতে ভেসে থাকেন। তিনি একটি পানির বোতল ধরে ভেসে থাকেন। পরদিন একটি তেলবাহী জাহাজ ভাসমান অবস্থায় থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করে।

নিখোঁজ ভিকটিম সাদেকের মা সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মদিনা বেগম জানান, তার একমাত্র ছেলে মো. সাদেক নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সাবরাং আলীর ডেইল এলাকার আব্দুল আমিন তার অজান্তে জোর করে ছেলেকে ট্রলারে তুলে দেয় এবং পরে ফোনে বিষয়টি জানায়। 

মদিনা বেগম বলেন, তিনি তখন জানান তার ছেলে স্কুলপড়ুয়া এবং বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করা থাকলেও সে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাবে না। কিন্তু দালাল আব্দুল আমিন তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, টাকা বেশি লাগবে না, মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিলেই হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত বছর একইভাবে একজনকে পাঠিয়ে দ্বিগুণ অর্থ, প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে ওই দালাল। তিনি জানান, তার ছেলে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী ছিল না। কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এরপর দালাল আব্দুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে জানায়, ট্রলারটি ডাকাতের কবলে পড়েছে এবং আড়াই লাখ টাকা দিলে তার ছেলেকে উদ্ধার করা হবে। মদিনা বেগম অভিযোগ করেন, টাকা দেওয়ার পর থেকে ওই দালাল মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখে এবং তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমি দালাল আব্দুল আমিনের কাছ থেকে আমার ছেলেকে জীবিত বা অন্তত তার লাশ ফিরে পেতে চাই। পাশাপাশি এদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৪ নভেম্বর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী এলাকার মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় দালাল ফয়সালের লিজকৃত জায়গার সুপারি বাগানে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা জোরপূর্বক রোহিঙ্গা নারী-শিশুকে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রেখেছে- এমন সংবাদে থানা-পুলিশের একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ৪ জনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রোহিঙ্গা ৩ জন নারী, ৯ জন শিশুসহ ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ফয়সাল (২৫), আজিমুল্লাহ (২৭), ইসমাইল (২৬), ফেরদৌস আক্তার (৩৮), মো. ইউনুছ (২১), মো. রফিক (১৯), সাইফুল্লাহসহ (৪০) অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্যরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর  রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরী সাইফুলের বাড়ি থেকে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে থানার পুলিশ। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী ও একজন শিশু ছিল। 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সাইফুল, ইসমাইল, ফয়সাল, ইয়াছিন, গফুর ও নুর নবী মাঝিসহ একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া বাংলাদেশি তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে। এরপর তাদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়।

স্থানীয়রা আরও জানান, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এসব সন্ত্রাসী চক্র পাচার, অপহরণ ও জিম্মি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ভিকটিমদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের একাধিক সূত্রে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কথিত মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণ, ডাকাতি, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনায় পাচারকারীরা আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের ধরতে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। 

সরেজমিনে গিয়ে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিদুয়ান, সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েত উল্লাহ (১৭), একই এলাকার ফিরুজ (২৫), মো. রাসেল (২৬), আরাফাত (২৬) ও মো. আব্দুল মাহবুদ (৩০) এবং সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ড সিকদারপাড়া এলাকার সাদেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিস্তারিত জানা যায়। পরিবারগুলোর বরাত দিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী অসাধু পাচারকারী তাদের চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে নানা প্রলোভন দেখিয়ে লোকজন সংগ্রহ করে এবং অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারগুলোর দাবি, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেক সময় তারা মুখ খুলতে পারেন না। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন এলাকায় তাদের সদস্য ছড়িয়ে রয়েছে, যা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন করে তুলেছে।

সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ মো. রাসেলের মা হামিদা খাতুন বলেন, ‘স্থানীয় দুই মানব পাচারকারী তার ছেলেকে একই এলাকার বাসিন্দা জাফরের হাতে তুলে দেয়। এ খবর জানার পর তিনি জাফরের কাছে গিয়ে হাত জোড় করে, এমনকি পায়ে ধরে অনুরোধ করেন যত টাকা লাগে আমি দেব, শুধু আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। কিন্তু তার আকুতি-মিনতি সত্ত্বেও জাফর তার ছেলেকে আর ফেরত দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। যারা এ ধরনের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে তার নিখোঁজ ছেলে রাসেলকে দ্রুত খুঁজে বের করে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান।

সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ফিরুজের স্ত্রী জান্নাতুল ইমা বলেন, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার স্বামী ঘর থেকে বের হন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ফোন করে বলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি, দোয়া করিও।’ এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার স্বামীও থাকতে পারেন, কারণ এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না।

জান্নাতুল ইমা বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যারা প্রলোভন দেখিয়ে আমার স্বামীকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’ 

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নৌকাডুবিতে নিখোঁজদের বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের বাইরে সংঘটিত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে একাধিক মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে।

তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে পাচারকারীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিনি জানান, সর্বশেষ টেকনাফ উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন শাহ পরীরদ্বীপ কোনাপাড়া এলাকার ইসমাইল, দক্ষিণপাড়ার ফারুক ও সাবরাং মুন্ডাল ডেইল এলাকার ইব্রাহিম। গত রবিবার গভীর রাতে শাহ পরীরদ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?
‘শহিদ রুদ্রসেন লেক’ ভরাট করে এভাবেই নির্মাণ করা হচ্ছে গাড়ির গ্যারেজ। ছবিটি মঙ্গলবার তোলা। ইনসেটে খননের পর খাল। ছবি: খবরের কাগজ

দেশজুড়ে যখন খাল খনন ও জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, তখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খনন করা একটি খাল ভরাট করে সেখানে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

খালটি দৃষ্টিনন্দন জলাধার রূপে দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সাস্ট লেক’। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শাবিপ্রবির একমাত্র শিক্ষার্থী শহিদ রুদ্র সেনের স্মরণে এর নামকরণ করা হয় ‘শহিদ রুদ্র সেন লেক’। কিন্তু বর্তমানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণে লেকটির অস্তিত্বই প্রায় মুছে যেতে বসেছে। ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হওয়া লেকটি এখন আর চিহ্নিত করার মতো অবস্থায় নেই। গ্যারেজ করার মতো জায়গা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, একটি কার্যকর জলাধার ভরাট করে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে কার গরজে?

লেক সৃষ্টি যেভাবে

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। এ সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে মোকাবিলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে খাল খননের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে সেই খালকে কেন্দ্র করে একটি লেক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ছিল লেক, লেকপাড়ে ওয়াকওয়ে এবং মাঝখানের একটি টিলায় পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ৭ মে ‘শাবিপ্রবিতে হবে পাখির অভয়ারণ্য’ শিরোনামে খবরের কাগজে সচিত্র একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২ জুন ‘শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা: খাল খননেই মিলল সুফল’ শিরোনামে ফলোআপ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। 

২০২৫ সালের ৩ জুলাই লেকটির উদ্বোধনকালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী এটিকে ‘রুদ্র সেন লেক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই ঘোষণার এক বছরের মধ্যেই লেকটি ভরাটের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ির গ্যারেজ। লেকটি এখন গায়েব প্রায়।

কার গরজে গ্যারেজ?

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যারেজ নির্মাণের জন্য লেকের বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে তাদের অভিযোগ, প্রশাসন সে প্রতিবাদ আমলে নেয়নি। শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, যে লেক নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, এখন সেই লেকই অর্থ ব্যয় করে ভরাট করা হচ্ছে। তাদের মতে, এটি পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট উদাহরণ। মাত্র ২২টি গাড়ির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা নষ্ট করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবিচারের শামিল।

গাড়ির গ্যারেজ তৈরিতে গরজ ছিল কার? এ প্রশ্নে অনুসন্ধানে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যারেজের পাশেই প্রায় শতাধিক গাড়ি রাখার মতো খালি জায়গা রয়েছে। গ্যারেজটি সেখানে স্থানান্তর করা হলে লেক রক্ষা পেত এবং খালি জায়গারও যথাযথ ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমান স্থানে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে পেছনের খালি জায়গায় যাওয়ার পথ স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং জায়গাটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। মাত্র ২২টি গাড়ি রাখার জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’ এর আওতায় লেক ভরাট করে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের একটি দোতলা গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্যারেজ নির্মাণের জন্য পাশের টিলার কিছু অংশও কাটা হয়েছে। নির্মাণাধীন গ্যারেজটিতে মাত্র ২২টি গাড়ি রাখা যাবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে বর্তমানে ৪২টি যানবাহন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নতুন নির্মিত গ্যারেজটিতে বড় যানবাহন প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত গ্যারেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান আশিক বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য হলো লেকটি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সেই লেক ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে! এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, তবে প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন উন্নয়ন আমরা চাই না। প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ–অবিলম্বে লেক ভরাটের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বন্ধ করুন এবং ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করুন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন এক্সপ্লোর সোসাইটি’র সভাপতি জাহ্নবী দত্ত বলেন, ‘বর্তমানে যে লেকটি শহিদ রুদ্র সেন লেক বা ‘সাস্ট লেক’ নামে পরিচিত, সেটির যখন পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছেই বেশ প্রশংসার বিষয় ছিল। লেকটি ছিল একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান, পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু এখন যে ভরাটের কাজ চলছে, এটি সত্যিই দুঃখজনক। এখানে আমাদের উচিত প্রকৃতিকে না সরিয়ে মানবসৃষ্ট কাঠামোর বিকল্প উপায় ভাবা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চেষ্টা করব, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি-না।’

কর্তৃপক্ষ কী বলে

যোগাযোগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. জয়নাল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যখন ডিপিপি অনুমোদন হয়, তখন এই লেকটা ছিল না। গ্যারেজ নির্মাণের গরজ সম্পর্কে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যখন এই লেক খনন করা হয় তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কারণ ডিপিপিতে গ্যারেজের জন্য এই স্থানটা উল্লেখিত। এটা ছিল প্লেইন ল্যান্ড।  এখানে লেক কখনোই ছিল না। ডিপিপিতে যেটা আছে সেটা হলো একনেকে পাস করা প্রধানমন্ত্রী থেকে অ্যাপ্রোভড। এখানে কেন লেক করা হলো সেটা প্রকৌশল দপ্তরকে জানানোই হয়নি। কারণ আমরা করব না আগেই না করে দিয়েছিলাম। লেক খননের কাজে প্রকৌশল দপ্তরের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না। কারণ শুরু থেকেই বলা হয়েছিল যে, এটা ডিপিপির অন্তর্ভুক্ত গ্যারেজের জায়গা।’

লেক যেহেতু খনন করা হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীরাও এখানে গ্যারেজ করার বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছিলেন, তবু বিকল্প জায়গায় গ্যারেজ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যখন দাবি জানাল, তখন আমরা টিলার পেছনে গ্যারেজ করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই সময় ভিসি স্যার (সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী) আমাদের জানান যে ভিসি বাংলোর আশপাশে এ ধরনের কোনো স্থাপনা করবেন না। যেখানে আছে সেখানেই করেন। এখন যেখানে আছে সেখানে তো লেক। তখন আমরা টিলার কাছ ঘেঁষে লেকের ঢালের কিছু অংশ ভরাট করে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে দিই, যাতে লেকের বাকি অংশের কোনো ক্ষতি না হয়।’

গ্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্তের দায় সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর ওপর বর্তান চিফ ইঞ্জিনিয়ার। তবে এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একদিকে লেক নির্মাণে ব্যয়, অন্যদিকে সেই লেক ভরাট করে নতুন ব্যয়—এই দ্বৈত আর্থিক ব্যয়ে রয়েছে অর্থের নয়ছয় ও অপচয়। এ নিয়ে তখনকার প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

জানতে চাইলে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের ছুটির কারণে বন্ধ ছিল। শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এখানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণ ও প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস ৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায়। ছবি: খবরের কাগজ

নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফেরার আশায় দিন গুনছেন বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা এখনো অধরাই। একদিকে মায়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সংকট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে দিবসটি পালিত হয়। তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে দিনটি বছর বছর ফিরে আসে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে।

বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে নতুন করে আরও দেড় লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন অর্থায়নের সংকটেও পরিণত হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় ৯ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।’

আরআরআরসি কার্যালয় জানায়, ২০১৮ সালে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য মায়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়ে পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ায় নতুন করে তথ্য হালনাগাদ ও যাচাইয়ের কাজ চলছে।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান দরকার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ এখন প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান।’
 
বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা

রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা স্বেচ্ছায় মায়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত।’
ক্যাম্পে থাকা সাধারণ রোহিঙ্গারাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘প্রায় ৯ বছর ধরে আমরা শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের সন্তানদের অনেকেই মায়ানমার দেখেনি। আমরা বাংলাদেশে নিরাপদে আছি, কিন্তু এটি আমাদের দেশ নয়। আমরা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চাই। তবে ফিরে গিয়ে যদি আবার নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না। আমাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘মায়ানমার ছেড়ে আসার সময় আমি সবকিছু হারিয়েছি। বাড়িঘর, জায়গা জমি, আত্মীয়স্বজন কিছুই আর আগের মতো নেই। একজন মা হিসেবে আমার একটাই চাওয়া, সন্তানদের একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ দেখতে চাই। আমরা ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল জীবন চাই না। নিজের দেশে সম্মান নিয়ে বাঁচার সুযোগ চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আমাদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।’

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের যুবক আবদুন নবী বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরের জীবন সীমাবদ্ধতার জীবন। এখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব সময় তাড়া করে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হতাশায় ভুগছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কিন্তু অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্যাম্পে বসবাস কোনো সমাধান নয়। আমরা এমন একটি প্রত্যাবাসন চাই, যেখানে আমাদের পরিচয়, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।’

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পের জমিলা খাতুন বলেন, ‘নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে আছেন। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন, অনেকের পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু আমরা আশা ছাড়িনি। আমরা আমাদের গ্রাম, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শিকড়ে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু সেই ফেরাটা হতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।’

শালবাগান ক্যাম্পের ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার জীবনের শেষ সময় চলছে। আমি শুধু মৃত্যুর আগে নিজের জন্মভূমি আরেকবার দেখতে চাই। আমরা কখনো বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার দাবি করিনি। আমাদের দাবি একটাই, মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব।’
 
চাপ বাড়ছে স্থানীয় জনপদে

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আশ্রয়দাতা এলাকার জনজীবনে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্যহানি, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বিষয়টি সমর্থন করেন, তবে সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান দেখতে চান।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ক্যাম্প স্থাপনের শুরুতে হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি কেটে ফেলা হয়েছিল। এখনো বনাঞ্চলের ওপর চাপ রয়েছে। আগে যেসব এলাকায় বন্যপ্রাণী দেখা যেত, সেসব জায়গার পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। আমরা চাই বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।’

সমাজকর্মী জুবাইদা বেগম বলেন, ‘আগে গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ দিনমজুরের কাজ করে ভালো মজুরি পেতেন। এখন শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই মজুরি কমে গেছে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

কোটবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক, বাজার, পানি ও অন্য সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রাও নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সহায়তা দিতে হবে।’

জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। মাদক, মানব পাচার ও অপরাধ চক্রের তৎপরতা নিয়ে আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সংকটের রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।’
 
নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি

রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও কিশোরীরা এখনো নানা ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের কারণে বাল্যবিবাহ, মানব পাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে পরিবারগুলোর মধ্যে।

উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা রাশেদা খাতুন বলেন, ‘অনেক পরিবার দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। মা-বাবারা মনে করেন, এতে মেয়েরা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু এতে তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।’

শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিশোরী নুর আয়েশা বলে, ‘আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু অনেক মেয়েই বিভিন্ন কারণে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ বিয়ে করছে, কেউ পরিবারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সুযোগ পেলে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন থাকে। সন্ধ্যার পর চলাফেরা, বিভিন্ন সেবা নিতে যাওয়া, সবকিছুতেই সতর্ক থাকতে হয়। আমরা চাই নারী ও শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’

নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘দালাল চক্র এখনো সক্রিয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারী ও তরুণকে পাচারের চেষ্টা করা হয়। সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। এই বিষয়টিতে আরও কঠোর নজরদারি দরকার।’

মোচনী ক্যাম্পের হাজেরা খাতুন বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা হয়। বছরের পর বছর ক্যাম্পে থেকে অনেক শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো না গেলে একটি পুরো প্রজন্ম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে যাবে।’
এদিকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছে। এই অর্থ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের জীবন থমকে আছে অপেক্ষায়। বাংলাদেশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের আশ্রয় দিয়ে গেলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি ক্রমেই জোরালও হয়ে উঠছে। প্রশ্ন একটাই, কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা?

নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা
ভোগ্যপণ্যে ঠাসা মুদি দোকানে দেখা যায়নি কোনো মূল্যতালিকা। ছবিটি চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে তোলা/ মোহাম্মদ হানিফ।

চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের বাজারে অধিকাংশ দোকানেই মূল্যতালিকা দেখা যায় না। ফলে একই পণ্য সব দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত হতে না পেরে প্রতিদিনই বিভ্রান্তি ও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, মূল্যতালিকা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছেন। ফলে তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকি এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন জরুরি বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, বহদ্দারহাট, হালিশহর, রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং রাস্তার পাশের খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে মূল্যতালিকা নেই। কিছু কিছু দোকানে থাকলেও তারিখ ও পণ্যের দাম পরিবর্তনের দিকে বিক্রেতার খেয়াল নেই। আবার বিভিন্ন দোকানে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাজীর দেউড়ি বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তার পাশে ব্যাটারি গলিতে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন অলিগলির খুচরা বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ (হালি জাত) বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অথচ রিয়াউদ্দিন বাজার থেকে বের হয়ে দেখা যায়, একই পেঁয়াজ ভ্যানগাড়িতে ৩ কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৩৩ টাকা। বাজারভেদে মাছ, মাংস, সবজির দামেও এ রকম হেরফের দেখা গেছে। 

এদিকে মূল্যতালিকা না থাকার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর মেলেনি। ব্যবসায়ীদের একেক জনের রয়েছে একেক রকম যুক্তি। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাদের কাছে একাধিক মূল্যতালিকা রয়েছে, কিন্তু বাজারে মূল্যতালিকা কেউ টাঙায় না। তাই তিনিও রাখেননি। আবার কেউ জানিয়েছেন, মূল্যতালিকা রাখলে বা কম দামে পণ্য বিক্রি করলে, যারা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের সঙ্গে ঝগড়া হয়। তাই ঝগড়া এড়াতে এবং যে যার মতো করে ইচ্ছামতো দামে পণ্য বিক্রি করতে মূল্যতালিকা রাখেন না। 

রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. শওকত বলেন, ‘আপনি পুরো বাজার ঘুরে দেখেন কোনো মূল্যতালিকা নেই। সবাই যেহেতু মানছে না, আমি আর একা মূল্যতালিকা রেখে লাভ কী!’

হালিশহর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. আলম বলেন, ‘আমার কাছে ৩টা মূল্যতালিকা আছে। কিন্তু রাখা হয়নি। কারণ একটি পণ্য একেক জায়গায় একেক দামে বিক্রি হয়। আমি একটি পণ্যের দাম পাশের দোকানদারের তুলনায় কম লিখলাম। তখন আমাদের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হয়।’ 

নগরীর ফইল্যাতলী এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ‘এক লিটার গরুর দুধ কিনতে গেলাম। এক দোকানে ৮০ টাকা, পাশের আরেক দোকানে ৯০ টাকা। অন্য ভোগ্যপণ্যের দামেও একই অবস্থা। অর্থাৎ দামে কোনো স্বচ্ছতা নেই। তাই এখন বাজার করতে গেলে আগে পুরো বাজার ঘুরি। যেখানে কম দাম বলে সেখান থেকেই কিনি। কিন্তু এটা তো আমাদের জন্য কষ্টদায়ক। সব জায়গায় একই দাম থাকলে যে যেখান থেকে ইচ্ছা কিনতে পারেন। ক্রেতারাও বিভ্রান্ত হন না।’ 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ জানান, যখনই কোনো বাজারে অভিযান চালানো হয়, সেখানে কেউ বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না, মূল্যতালিকা ও কেনা-বেচার পাকা রসিদ আছে কি না- ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। 

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মূল্যতালিকা রাখা বা বেশি দামে পণ্য বিক্রির বিষয়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনার করেও কোনো লাভ তো হচ্ছে না। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী দুজনই নানা কায়দায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়। বাজারকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ফলোআপ করতে হবে। তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:২৩ এএম
পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!
ছবি: সংগৃহীত

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন। এই বাজেটের কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। কিন্তু ইতোমধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বাজেটে মসলাসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের দাম কমাতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সাত দিন চলে গেলেও এক টাকা কমেনি এসব পণ্যের দাম। আগের মতোই বেশি দামে চাল, ডাল, মসলা বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া, পাঙাশসহ অন্য মাছের দামও কমেনি। কোরবানি ঈদের পর চাহিদা কমলেও আগের মতো চড়া দামে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। বাজার সবজিতে ভরা থাকলেও অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি।

বিক্রেতারা বলছেন, সরকার মুখে বললেও বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তো কোনো জিনিসের দাম কমে না। ভরা মৌসুমেও এক কেজি পোলাওয়ের চাল  বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করে সরকার। তাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব আদায়ে অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু পণ্য ও সেবায় দাম কমার প্রস্তাব করেছেন সাধারণ মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমাতে উৎসে কর এবং খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়ার মতো মসলার দাম কমাতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে এসব জিনিসের দাম এক টাকাও কমেনি।

মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবু মিয়াসহ অন্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার যাই বলুক বাজার চলছে বাজারের মতো । মিল থেকে দাম না কমালে আমরা কীভাবে কম দামে বিক্রি করব। কাজেই মিলে যাতে দ্রুত দাম কমে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব। ভোক্তারাও কম দামে কিনতে পারবেন। বর্তমানে সব পণ্যের দাম ঝিম ধরে আছে।’

বেশি দামেই চাল বিক্রি

গতকালও আগের মতো মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ ও মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ২ কেজির প্যাকেট আটা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।  

টাউন হল বাজারের মায়ের দোয়া রাইস স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, ‘বোরো ধান ওঠা শেষ। তার পরও চালের দাম কমছে না। ব্যবসায়ীরা গোডাউনে ধান ভরে নিয়েছেন। মিল থেকে এখনো বেশি দামে পুরোনো চাল বিক্রি করছে। মিলমালিকদের না ধরলে চালের দাম কমবে না। প্রাণ, চাষি গ্রুপসহ অন্যরাও ইচ্ছামতো পোলাও চালের দাম বাড়িয়েছে, যা ১৯০ টাকা কেজি। আজব এ দেশ।’

কোরবানির ঈদের আগে আদার দাম বাড়লেও গতকাল তা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, আলু ৩০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়। শুল্ক কমানো হলেও মসলার দাম কমেনি। আগের মতো গতকালও  লবঙ্গের কেজি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০ টাকা, জিরা ৬৫০ টাকা ও এলাচ সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’ খেজুর বিক্রেতারাও জানান দাম কমেনি। নিউ মার্কেটের মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আগের দামেই সব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বাজেটের পণ্য দেশে এলে কমতে পারে।’

অধিকাংশ সবজি ১০০ টাকার ঘরে

বাজারে এখনো শীতের কপি, টমেটো বিক্রি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালের সবজিও ভরে আছে। তার পরও বেগুনসহ অধিকাংশ সবজি যেন ১০০ টাকা কেজিতে স্থির হয়ে গেছে। বিভিন্ন বাজারে টমেটো ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ৭০ থেকে ১০০, বরবটি ও কচুরলতি ৮০ থেকে ১০০, কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৪০, শজনেডাঁটা ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৪০ থেকে ৬০, পটোল ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রীষ্মকালের ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গাও ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৬০ থেকে ৭০ টাকার কমে মেলে না। নিউ মার্কেট বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সবুজসহ অন্য বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাবে সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। আড়তে সব সবজিই বেশি দামে কেনা। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

কমেনি মাছের দাম

কোরবানির ঈদের পরও মাছের দাম কমেনি। তেলাপিয়া মাছও আকারভেদে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। রুই, কাতল মাছও আগের মতো ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, নদীর চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ নদীর অন্য মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে চাষ করা এসব মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। আগের সপ্তাহের মতোই গতকালও সোনালি মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা, ব্রয়লার ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ ও  খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। তবে ডিমের দাম ১০ টাকা কমে ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়।

পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের
রাজশাহীর কসাই রিপন আলীর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার শিং ও মাথার খুলি দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। ছবি: সংগৃহীত

পেশায় তিনি কসাই। প্রতিদিন পশু জবাই ও মাংস বিক্রিই তার কাজ। কিন্তু এই পেশার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক ভিন্ন জগতের সন্ধান। অন্যরা যেখানে পশুর মাথা ও শিংকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেন, সেখানে রাজশাহীর রিপন আলী সেগুলোকে রূপ দিচ্ছেন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মে। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার পরিত্যক্ত মাথা সংগ্রহ করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি করছেন ব্যতিক্রমী শোপিস, যা এখন দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

৪০ বছর বয়সী রিপন আলী রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার বাসিন্দা। গত এক দশক ধরে তিনি এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে শতাধিক নান্দনিক শোপিস জমা হয়েছে। বাড়ির একটি কক্ষজুড়ে সাজিয়ে রেখেছেন এসব শিল্পকর্ম। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ তার এই সংগ্রহ দেখতে ভিড় করছেন।

রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রথমে কৌতূহল থেকে দেখতে এসেছিলাম। এখানে এসে আমি সত্যিই মুগ্ধ। সাধারণত যেসব জিনিস আমরা বর্জ্য হিসেবে দেখি, সেগুলোকে এত সুন্দর ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা কল্পনাও করিনি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংগ্রহের ছবি দেখে এখানে এসেছি। কাছ থেকে দেখে আরও ভালো লাগছে। প্রতিটি শোপিসের পেছনে যে শ্রম, ধৈর্য ও মেধা রয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। একজন কসাইয়ের হাতে এমন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’

জানা গেছে, রিপনের এই শিল্পযাত্রার শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। কসাইপট্টিতে কাজ করার সময় একটি বড় মহিষের শিং তার নজর কাড়ে। শিংটির সৌন্দর্য দেখে তিনি ভাবেন- এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান।

প্রথমদিকে কাজটি সহজ ছিল না। পশুর মাথা সংরক্ষণ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখার কোনো কার্যকর পদ্ধতি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে জানতে তিনি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি। এরপর নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। বছরের পর বছর চেষ্টা, ব্যর্থতার পর তিনি একটি কৌশল বের করেন। এই কৌশলের ফলে পশুর মাথা ও শিং দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রেখে শৈল্পিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

রিপন জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে এই কাজ শুরু করেন। তবে সব ধরনের পশুর মাথা তিনি সংগ্রহ করেন না। যেসব পশুর শিং বা মাথার গঠন দেখতে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক, সেগুলোই বেছে নেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও শৈল্পিক উপস্থাপনের মাধ্যমে শোপিসে রূপ দেন।

এই কাজে তাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। পশুর হাড় ও মাথা সংগ্রহ করে বাড়িতে রাখার কারণে একসময় পরিবার ও প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়। দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেকে তাকে নিরুৎসাহিতও করেছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি  বদলে গেছে। একসময় যারা তার এই কাজকে অদ্ভুত ভাবতেন, তারাই এখন প্রশংসা করছেন। এই শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও অনেকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রিপন আলী বলেন, আমি শুধু বাজার থেকে সংগ্রহ করা গৃহপালিত পশুর মাথা ও শিং ব্যবহার করি। কোনো সংরক্ষিত বা বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করি না। আমার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি নান্দনিক শোপিস জনপ্রিয় হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ দিয়ে ঘর সাজানোর প্রবণতা কমবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ একদিন ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।