বেতন কমিশন ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করলেও তা হয়নি। এবার নতুন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
আরও জানা যায়, জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ কমাতে নতুন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে কার্যকর করার কথা ভাবছে সরকার। আরও হিসাবনিকাশ শেষে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। একবারে বেতনকাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ওপর চাপ পড়বে। আংশিক বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ওপর চাপ কম পড়বে। সরকারি কর্মচারীরা দ্রুত কিছুটা আর্থিক সুবিধা পেলেও সরকারের ওপর এককালীন অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়বে না।
অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করে। অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও সময় বাড়ানো হয়। নির্ধারিত শেষ সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়লে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম ধাপের পরিবর্তে ১০ম থেকে ২০তম ধাপ পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে, পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পেলে তা প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে বৃদ্ধি হতে পারে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি হলে ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা।
উচ্চ বেতনের প্রথম থেকে দশম ধাপের কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের প্রতিবেদনে, গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় হবে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তা বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ জমা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ের কমিটি।
সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের জন্যই বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হলেও বর্তমানের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ ধাপের বাইরে আলাদা বেতন ধাপ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
জাতীয় পে-কমিশনের সভাপতি সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান খবরের কাগজকে বলেছেন, অনেক দিন ধরে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। কম আয়ের সরকারি কর্মচারিরা বেশি চাপে আছেন। আশা করি বেতন বাড়লে সরকারি চাকরিজীবীরা স্বস্তিতে থাকবেন। বিশেষ করে বেতন বাড়ালে সরকারি কর্মচারীদের অনেকের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা কমবে। এখন কতটা কীভাবে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে তা সরকারের বিষয়।
তবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলে সমগ্র বাজারব্যবস্থায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে বলে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন। তারা বেসরকারি খাতের জন্যও বেতন বাড়ানোর কাঠামো নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কমিশনের খসড়াও বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বর্তমানে বিনিয়োগের পরিস্থিতি দুর্বল।
অর্থনীতির বিশ্লেষক ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার চাপ বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে। এর মধ্যে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারের ওপর, একই সঙ্গে সমগ্র বাজারব্যবস্থার ওপরও চাপ পড়বে।