ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের উৎপাত চলতে থাকে দিনভর। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা অতিকায় লরিগুলো। কমলাপুরের রেলওয়ে ডিপোতে মালামাল উঠানামা শেষ হলেও ২৪ ঘণ্টা মুগদা-বাসাবোর অতীশ দীপঙ্কর সড়কটি দখলে রাখে লরি চালকরা। রাজধানীর ওই সড়ক ব্যবহারকারী যাত্রীরা তো বটেই; খোদ সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদও বিরক্ত এমন কাণ্ডে।
গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী সভা’য় নিজের এ বিরক্তির কথা জানান ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রশিদ।
সেই সভার পরে রাজধানীতে বিভিন্ন ফ্লাইওভারে টোল আদায়ে ধীরগতি, বাস ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা এবং তীব্র পার্কিং সংকটকে যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৬ দফা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তরে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
কিন্তু দুই সপ্তাহ পেরোতে না পেরোতেই সেসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পরিবহন মালিকদের দৌরাত্ম্যে সব উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে।
যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে
রাজধানীর ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস ও ২৫ বছরের বেশি পুরোনো ট্রাক ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বাসের রুট-পারমিট বাতিল এবং প্রতিটি আন্তজেলা বাসে জিপিএস স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিআরটিএকে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের চাপ কমাতে কাঁচপুরে নির্মাণাধীন টার্মিনাল দ্রুত শেষ করে আন্তজেলা বাস শহরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফুলবাড়িয়া বাস ডিপো সরিয়ে কমলাপুর বা বিআরটিসি ডিপো থেকে পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন থাকার কারণে তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দূরপাল্লার বাস শহরের ভেতর থেকে বা কাউন্টার থেকে পরিচালনা করা যাবে না এবং কমলাপুর আইসিডি এলাকা থেকে ট্রাক ও লরি সরিয়ে নিতে হবে।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিআরটিসির বাসকে নির্দিষ্ট স্টপেজ ও টিকিটভিত্তিক পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে, যাতে এটি বেসরকারি সিটি বাস কোম্পানিগুলোর জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় টোল আদায়ের ধীরগতির প্রভাব সরাসরি সড়কে যানজট সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দুই উড়াল সড়কের টোল প্লাজায় পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যাত্রীদের নির্দিষ্ট স্থানে ওঠানামা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ বাস স্টপেজের দুই পাশে ৫০০ মিটার করে লোহার ফেন্সিং স্থাপন করা হবে। ৩০ জুনের মধ্যে এ কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন, গণপরিবহন আধুনিকায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগে আরও ৩১৮৩ জন নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সড়কের পাশে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারির কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিক্রি বন্ধ বা স্থানান্তরের বিষয়ে ১৫ মে’র মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।
পার্কিং সংকট নিরসনে মাল্টিলেভেল ও বেজমেন্ট পার্কিং ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি বায়তুল মোকাররম মসজিদের বেজমেন্টে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ও ধাপে ধাপে অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দর সড়ক, প্রগতি সরণি ও মিরপুর সড়ক থেকে রিকশা অপসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
হকার সমস্যা সমাধানে নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে হলিডে ও নাইট মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ৩০ জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাফিক মামলায় ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল (ই-ট্রাফিক) ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পদে পদে বাধা
গত মার্চ-এপ্রিল মাসে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ঢাকার তিনটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় অস্থায়ী কাউন্টারগুলো উচ্ছেদ করে দেয়। এতে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। নির্ধারিত কাউন্টার ছাড়া চালকরা সড়কে এলোমেলোভাবে বাস দাঁড় করাতে পারছিলেন না। ক’জন যাত্রী অসুবিধায় পড়লেও অধিকাংশ যাত্রী নির্ধারিত কাউন্টার থেকেই বাসে উঠছিলেন। কিন্তু এই চিত্র খুব বেশিদিন থাকেনি। বাস মালিকদের প্রভাবে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। আর তা স্বীকার করে নিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরি সভাপতি এম এ বাতেন। তিনি বলেন, বাস কাউন্টার উচ্ছেদ করায় যাত্রীরাই সমস্যায় পড়ছিলেন। নির্ধারিত কাউন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দূরের কাউন্টারে যেতে তাদের সমস্যা হচ্ছিল। তাই আমরা বাস মালিকরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই যেন আমাদের জায়গা নির্ধারণ করে দেয়, আমরা অস্থায়ী কাউন্টারগুলো সেখানে সরিয়ে নেব।
বাস মালিকদের এই আবেদনে সাড়া দেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বাস মালিকদের আশ্বস্ত করেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে ঢাকার কোথাও বাস কাউন্টার উচ্ছেদ করা হবে না।
কয়েকদিন আগেও ঢাকার মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, উত্তরার হাউজবিল্ডিং, যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল (চিটাগাং রোড) বাসস্ট্যান্ড এলাকা ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ। সড়কমন্ত্রীর ওই আশ্বাসের পরে এখন সেসব এলাকায় আবারও ফিরে এসেছে যানজট।
ঢাকা মহানগরীতে বিআরটিসির কোনো নির্দিষ্ট কাউন্টার নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ বাস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, বিআরটিসি যেগুলোকে ‘স্টাফ বাস’ বলছে। লোকাল বাসের মতো এই বাসগুলোও সড়কে যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়। এতে বিভিন্ন সড়কে যানজট দেখা দিচ্ছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা জানান, তারা শিগগির বিভিন্ন পয়েন্টে কাউন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিআরটিসির বাসগুলোও মেরামত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে ইটিসিতে টোল দিতে আলাদা লেন থাকলেও তাতে বাস-ট্রাক চালকরা খুব একটা সায় দেন না। ঢাকা বাস মালিক সমিতির নেতা এম এ বাতেন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কথা হয়েছিল ইটিসিতে টোল দিলে চালকরা ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। এই সরকার এসে সেই সুবিধা দিচ্ছে না। তাই চালকরা এই ব্যবস্থায় যেতে রাজি না।’
ঢাকা বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, ঢাকায় নির্দিষ্ট এলাকায় ট্রাক ডিপো করে দিলেও চালকরা সেখানে যেতে নারাজ। তারা জ্বালানি খরচ বাঁচাতে এবং নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজি এড়াতে বাজার ও আড়তের কাছাকাছি থাকতে চায়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ও ঢাকার আবদুল্লাহপুরে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু এই দুই টার্মিনালের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার কথা বললেও কোনো অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি গত ৬ বছরে। সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর কর্মকর্তারা জানেন না, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল কবে সরবে।
নিয়ন্ত্রণে আসছে না ব্যাটারি রিকশা : নীতিমালা ঝুলে থাকায় বাড়ছে বিশৃঙ্খলা
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আর প্রশাসনের দফায় দফায় কড়াকড়ির পরও রাজধানীর সড়কে নিয়ন্ত্রণে আসছে না ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। উল্টো দিন দিন বাড়ছে এসব নিষিদ্ধ যানের দাপট। যথাযথ নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাটারিচালিত এসব যানবাহনকে শৃঙ্খলায় আনতে সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। ‘রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’ নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার দাবিতে রাজপথে সরব রয়েছে। এদিকে নগর কর্তৃপক্ষ বলছে এসব যানের কারণে ঢাকা এখন ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বলছেন, ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা এবং দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার অবদানের কথা মাথায় রেখে অবিলম্বে নীতিমালা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, বিআরটিএর বদলে সিটি করপোরেশনের হাতে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়ার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা টেকসই সমাধান আনবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণে ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সরকার নতুন নীতিমালা তৈরি করছে। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম সম্প্রতি এক সভায় জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট ডিজাইন, নির্দিষ্ট গতি এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঢালাওভাবে এসব রিকশাকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের কিছুক্ষণ পরই আবারও সড়কে ফিরে আসছে এসব বাহন। চালকদের দাবি, ঋণ নিয়ে কেনা এসব রিকশা বন্ধ হলে তারা সপরিবারে পথে বসবেন।