পুরোনো চুক্তি বাতিল করে নতুন ঋণচুক্তি করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বর্তমান সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে আইএমএফ বেশ কিছু কঠিন শর্ত দিয়েছে। আগামী বাজেটেই এসব শর্তের বেশির ভাগ অন্তর্ভুক্তির জন্য চাপ দিয়েছে দাতা সংস্থাটি। বাজেটের মাধ্যমে এসব শর্ত কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব, সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, আর্থিক খাতে সুশাসন ও দুর্নীতি কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও ভারসাম্য আসবে বলে দাতা সংস্থা থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটেই এনবিআর ভেঙে ‘রাজস্ব আদায়’ ও ‘ রাজস্ব নীতি প্রণয়ন’ নামে পৃথক দুই প্রতিষ্ঠান করার শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। এ ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এবং সব ধরনের পণ্য ও সেবা খাতে অভিন্ন ভ্যাট (ভেলু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসকের (মূল্য সংযোজন কর) হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণের জোরালো শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া রাজস্ব জালের আওতা বাড়াতে তৃণমূল থেকে কর-ভ্যাট আদায় করার কথা বলেছে আইএমএফ। বকেয়া আদায়, রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি, ভ্যাটের আওতায় কমপক্ষে ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে আনতে, কমপক্ষে ৫ কোটি করদাতা চিহ্নিত করতে এবং সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব আদায় করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি ভালো না। কর্মসংস্থান নেই। বিনিয়োগে গতি নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে রাজস্ব আদায়ের ওপর চাপ বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগের খরচ বাড়বে। অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে। তিনি বলেন, আইএমএফের কথামতো ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে বিগত সরকার ভালো করতে পারেনি। এ ছাড়া ভর্তুকি কমাতেও পারেনি। অন্যদিকে এনবিআর বিভক্তি নিয়েও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই সরকারকে এ বিষয়ে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ দুটি তাৎক্ষণিকভাবে বিল আকারে উত্থাপন না করে আরও যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ আদায়সহ ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলেছে আইএমএফ। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা ও দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের শর্ত দিয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন চুক্তির শর্ত নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বেশ কয়েক দফা ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইএমএফ থেকে সরকার নতুন করে তিন থেকে চার বছর মেয়াদে ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় যেসব শর্ত মানতে সরকার সম্মত হয়েছিল তার অনেক কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষভাবে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে দাতা সংস্থা সন্তুষ্ট না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ঋণ বাড়াতে হলে নতুন চুক্তিতে যেতে হবে। এখন দেখা যায়, বর্তমান নির্বাচিত সরকার কতটা কি বাস্তবায়নে রাজি হয়। দেশের মানুষের ওপর চাপ হয়, এমন কিছুতে রাজি না হওয়া ভালো। কারণ নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। সাত কিস্তিতে সাড়ে তিন বছরে আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যস্ত সংস্থাটি দিয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। গত জুনে আইএমএফের পর্ষদ বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ায়। ঋণের পরিমাণে আরও ৮০ কোটি ডলার যুক্ত হয়। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫০ কোটি ডলার হয়েছে। কিস্তির সংখ্যা বাড়িয়ে সাত থেকে আটটি করা করেছে। সংস্থাটির কাছে আরও পাওয়া যাবে ১৮৬ কোটি ডলার। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আইএমএফ জানিয়েছে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া ঋণের কিস্তি ছাড় করবে না। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বোর্ডসভায় অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি দল অংশ নেয়। সে সভায় বাংলাদেশের ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। সংস্থাটি চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় কিস্তি ছাড় করতে অনীহা প্রকাশ করে নতুন শর্তে নতুন করে ঋণচুক্তি করতে সরকারকে পরামর্শ দেয়। গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ও আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তাব তোলা হয়। একই সঙ্গে নতুনভাবে ঋণ কর্মসূচি শুরু করার প্রস্তাব করে বাংলাদেশ।