নারায়ণগঞ্জে কোনোভাবেই যেন থামছে না প্রাণঘাতী গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা। গত পাঁচ বছরে তিতাস গ্যাসের পাইপ লিকেজ আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৪০ জন মানুষ।
সোমবার (১১ মে) গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন।
বেশির ভাগ ঘটনায় তিতাসের পুরোনো পাইপলাইনকে দায়ী করা হলেও এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বরং লিকেজ মেরামত করে আর গ্রাহকের ওপরই দোষ চাপিয়ে দায় সেরেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে, শুধু বহুতল ভবনই নয়, মার্কেট, মসজিদ কিংবা হাসপাতাল সবই আছে অগ্নিঝুঁকিতে।
গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার কুতুবপুর লাকি বাজার এলাকায় গ্যাসের লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন আব্দুল কাদির (৫০), তার ছেলে মো. মেহেদী (১৭), মো. সাকিব (১৬) ও মো. রাকিব (১৬)।
স্থানীয়রা জানান, ভাড়াটে আব্দুল কাদিরের ঘরে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে যায়। আগুনে দগ্ধ হন গৃহকর্তা আব্দুল কাদিরসহ চারজন। তাদের গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে ভর্তি করা হয়।
গ্যাসের পাইপলাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে আগুনের স্পার্ক থেকে কাদিরের ঘরে বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। তার আগের দিন রবিবার ভোরে ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম মো. কালাম (৩৫)। গতকাল বেলা ১১টার দিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনে নারী শিশুসহ অন্তত ১৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও অনেকে। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পুরো তথ্য নেই ফায়ার সার্ভিস কিংবা পুলিশের কাছে।
চলতি বছর নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণের ছয়টি ঘটনায় অন্তত ২৩ জন দগ্ধ হয়েছেন। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে তিনজনের। ২০২৫ সালে ২০৪টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে গ্যাসের লিকেজসংক্রান্ত দুর্ঘটনা ৯৬টি । এর মধ্যে ৩০টি গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৩০ জন দগ্ধ হন ও ২২ জন প্রাণ হারান।
২০২৪ সালে পাইপলাইনে লিকেজ থেকে গ্যাস জমে বিস্ফোরণে ১১৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ২১টি ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩৫ জন দগ্ধ হন। এর মধ্যে চারটি বড় গ্যাস বিস্ফোরণে ২২ জন দগ্ধ হন। মারা যান সিদ্ধিরগঞ্জের পোশাক কারখানার নারীকর্মী সুখীর পরিবারের চার সদস্যসহ ছয়জন।
২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জে ১২৮টি অগ্নিদুর্ঘটনার মধ্যে ১১৮টি ঘটে তিতাসের পাইপলাইনের লিকেজ থেকে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ২৭ জন। আহত হন ৮২ জন।
২০২২ সালের ১০৪টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটি থেকে বিস্ফোরণ হয় ৬৯টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান ১৮ জন। তার আগের বছর ২০২১ সালে ১১৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনার মধ্যে ৯৬টি ঘটে তিতাসের পাইপলাইন থেকে। ওই বছর আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ২০ জন মানুষ।
২০২০ সালে ১০৬টি আগুনের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে ৭১টি তিতাসের পাইপলাইনের ত্রুটি থেকে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে। দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ৪৪ জনের। এর মধ্যে শুধু তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ৩৪ জন।
ফায়ার সার্ভিসের নারায়ণগঞ্জের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন খবরের কাগজকে বলেন, ঘটনার পর বিস্ফোরণের কারণ জানতে তদন্ত করে ফায়ার সার্ভিস। বেশির ভাগ ঘটনাতেই দেখা যায় পাইপ লিকেজ থেকে রুমে গ্যাস জমাট বেঁধে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, রুমে গ্যাস জমাট বাঁধার পেছনের কারণ হলো তিতাসের যে গ্যাস পাইপ রাইজার হয়ে বাসাবাড়ির দিকে সংযোগ যায়, সে সংযোগ পাইপের লিকেজ বা চুলার স্থলে নির্গত হওয়া। এ ছাড়া অনুমোদিত দোকান থেকে সংগ্রহ করা সিলিন্ডার অনিরাপদভাবে চুলার সঙ্গে সংযোগ করায় পাইপ লিকেজের ঘটনা বেশি ঘটছে।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাসাবাড়িতে দরজা-জানালা বন্ধ অবস্থায় যখন গ্যাস জমে থাকে তখন লাইট-ফ্যান চালু করতে গেলে বা ম্যাচ দিয়ে রান্নার কাজ করতে গেলে তা স্পার্ক করে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই সেখানে থাকা মানুষ দগ্ধ হন।
ইতোমধ্যে অগ্নিনির্বাপণ ও জননিরাপত্তা নেই এমন প্রতিষ্ঠান ও ভবনের তালিকা হয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের আবদুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে সব দপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন।
সে তালিকার তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জে ১৩৫টি বহুতল ভবন, ৪২টি মার্কেট, ১৬৩টি মসজিদ ও সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৭৮টি হাসপাতাল-ক্লিনিকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের আশঙ্কা থেকেই যায়। ফায়ার সার্ভিসের তালিকা ধরে নগরীর নিতাইগঞ্জ, দেওভোগ, আমলাপাড়া, খানপুর, চাষাঢ়া, জামতলাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভবনগুলোর দেয়ালের সঙ্গে লাগানো তিতাসের সংযোগ পাইপগুলো বেশ পুরোনো। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ। এখানে তিতাসের গ্যাসলাইনের পাশাপাশি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেশি।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ৮০ হাজারের বেশি আবাসিক গ্রাহককে পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করছে। এ ছাড়া ৪২২টি কলকারখানায় গ্যাস সঞ্চালন চলমান রেখেছে বিপণনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি। এখানে ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো পাইপলাইনে এখনো গ্যাস সরবরাহ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিতাস গ্যাসের নারায়ণগঞ্জের উপ-মহাব্যবস্থাপক মনজুর আজিজ মোহন।
তিনি বলেন, গ্যাস সঞ্চালনের পাইপলাইন দেখভাল করে ঢাকার আলাদা একটি বিভাগ ফলে নতুন পাইপ স্থাপনের বিষয়টি তারাই দেখে। ইতোমধ্যে নতুন পাইপ স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিতাসের কর্মকর্তা দাবি করেন, বাসাবাড়িতে দুর্ঘটনার দায় গ্রাহকের। তিতাস শুধু দেখভাল করে বাইরের পাইপলাইন থেকে রাইজার পর্যন্ত। দুর্ঘটনা কমাতে হলে আগে স্থানীয়দের সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস বিস্ফোরণের দুর্ঘটনা কমাতে তিতাস গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়য়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নারায়ণগঞ্জের সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল। এ সংগঠনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস বিস্ফোরণের প্রতিকার চাওয়া হচ্ছে। ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, তিতাসের পুরোনো অচল পাইপলাইন বদলের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অবহেলা বন্ধ করতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে ২০২০ সালে তল্লা মসজিদে দুর্ঘটনার পর তদন্ত প্রতিবেদনে যে ১৮টি সুপারিশ এসেছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।