দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়। বাড়ছে শিশুর মৃত্যু। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে এক বেডে একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও মেঝে, সিঁড়ি কিংবা টয়লেটের সামনেও বিছানা পেতে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে মারা গেছে আরও ৯ শিশু।
# এক বেডে একাধিক শিশু, আইসিইউতেও খালি শয্যা নেই
# হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়িতেও চলছে শিশুদের চিকিৎসা
# চলতি বছরে হামে মৃত্যু ৪২৪ জনের
চলতি বছরের শুরুর দিকে হামে আক্রান্ত হয়ে দিনে এক-দুইজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও এখন দিনে গড়ে ১০ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। গত ৪ মে হামে আক্রান্ত হয়ে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে এত ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি তারা দেখেননি।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালটির হাম ওয়ার্ড রোগীতে পরিপূর্ণ। অন্য রোগে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক শিশুও এ হাসপাতালে এসে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। একই পরিবারের একাধিক শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও এই হাসপাতালে রয়েছে। এতে আতঙ্কিত সময় কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৯০ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪৫০ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই। রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, বাধ্য হয়ে হাসপাতালের ফ্লোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে শিশুদের।
দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, ঢাকার তুলনায় গ্রামের শিশুরাই বেশি গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। কারণ গ্রামের অনেক পরিবার প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন চিকিৎসা বা ওষুধের ওপর নির্ভর করছে। পরে শিশুর অবস্থা খারাপ হলে ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এতেই সময় নষ্ট হচ্ছে এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক শিশু মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার জানান, বর্তমানে ভর্তি শিশুদের প্রায় ৭৩ শতাংশই ঢাকার বাইরের জেলার। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ায় রাজধানীতে আক্রান্তের হার তুলনামূলক কিছুটা কম। তবে গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম দেরিতে শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিত্র আরও ভয়াবহ। হাসপাতালটিতে কোনো শয্যা খালি নেই। শিশুদের ফ্লোরে, বারান্দা, সিঁড়িতে এমনকি টয়লেটের সামনেও চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এতে করে একদিকে অন্য রোগে আসা শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে হামে আক্রান্ত শিশুরাও নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে হামের প্রকোপ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৯ শিশু। তাদের মধ্যে ছয়জন হামের উপসর্গে এবং তিনজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৭ জনের। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৪ জনে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৬৮ জন। অন্যদিকে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫৬। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২৪ জনে।
শুধু মৃত্যুই নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১০৫ জনের শরীরে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৩৯ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৮৮৫ জন।
স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। এর ফলেই দেশে এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আট বিভাগে মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭৬ শিশু টিকা পেয়েছে। এখনো প্রায় ১৬ হাজার ৯৩৮ শিশু টিকার বাইরে রয়েছে।
এদিকে হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে দায়ী করে বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও বিভিন্ন সচেতন নাগরিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। রাজধানীর মিরপুর গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্টসহ বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ড. ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের শাস্তির দাবি জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান সাংবাদিকদের জানান, অনেক অভিভাবক আতঙ্কিত হয়ে শিশুদের ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোয় নিয়ে আসছেন। এ ব্যাপারে রোগী রেফার ব্যবস্থা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও শিশু বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে হামের চিত্র ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করার মতো। সময়মতো টিকা না দেওয়ায় সারা দেশে হামে শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিকভাবে জনগণকে সচেতন করতে হবে। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। হাসপাতালেও কার্যক্রম বাড়াতে হবে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।