তাবাসসুম আক্তার তানহার বয়স মাত্র চার মাস। এর মধ্যে এক মাস ধরে সে কখনো হাসপাতালে, আবার কখনো বাড়িতে। এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে শিশুটি। প্রথমে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতালে, তার পর রাজধানীতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএমইউ), সেখান থেকে গ্রামে গিয়ে শিশুটি এখন আবার বিএমইউতে ভর্তি আছে।
১৩ দিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে শিশুটির শয্যাপাশে কথা হয় তার বাবা হারেস মিয়ার সঙ্গে।
তিনি জানান, তিনি একজন ‘অটোচালক’। মাসখানেক আগে জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের কারণে তার এই সন্তানকে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফুসফুসে পানি জমা ও রক্তে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। কয়েক দিন ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়ে শিশুটি সুস্থ হয় এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফেরে।
কিন্তু সেখানে শিশুটির শয্যার পাশেই ছিল হাম রোগীর শয্যা। সেখান থেকে শিশুটি ‘হাম নিয়ে’ বাসায় ফেরে বলে জানায় তার বাবা। তিনি বলেন, ‘সেখানে হাম রোগী থাকলেও বাসায় ফেরার সময় তো আর বুঝিনি যে, আমার মেয়ের হাম হয়েছে। বাসায় ফেরার সপ্তাহখানেক পর আবার মেয়ের জ্বর হলো। জ্বর বাড়তে বাড়তে ১০৩-১০৪ ডিগ্রি হয়ে যায়। সাধারণ জ্বর হলে যেমন হয়, তিন-চার দিন বাসায় রেখে ওষুধ খাওয়ালাম। জ্বর না সারায় চলে আসি বিএমইউ হাসপাতালে। এখানকার আউটডোরে (বহির্বিভাগ) ডাক্তার কিছু টেস্ট করানোর পরামর্শ দিলেন। তখনই ডাক্তার বলেছিলেন, রিপোর্ট এলে নিশ্চিত হব। তবে মনে হচ্ছে শিশুটির হাম হয়েছে। ভর্তি লাগতে পারে। কিন্তু আমরা টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিয়ে ওই রাত হোটেলে থেকে পরের দিন গ্রামে (ময়মনসিংহ) চলে যাই। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার পর মেয়ের শরীরে গোটা দেখা দিল। তখন তাড়াতাড়ি আবার এই হাসপাতালে এলাম। হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করে ডাক্তারকে দেখাই। ডাক্তার বললেন, হাম হয়েছে। বুঝতে পারলাম, আমার মেয়ে ময়মনসিংহের ওই হাসপাতাল থেকেই হামে সংক্রমিত হয়েছিল। কিন্তু বুঝতে এতদিন লেগে গেল।
তানহার বাবা জানান, বিএমইউতে ডাক্তার ভর্তির জন্য লিখে দিলেও হাম ওয়ার্ডে শয্যা খালি ছিল না। তাই এখান থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে ভর্তি হতে। তবে আমরা সকাল থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। ওই সময় একটা রোগী ছাড়পত্র নেওয়ায় খালি শয্যায় আমার মেয়েকে ভর্তি করালাম। তেরো দিন হয় এখানে ভর্তি আছে আমার মেয়ে।
হামের কারণে যে কেবল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহুরে সচ্ছল পরিবারগুলোকেও সমানভাবে ভোগান্তিতে ফেলছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের একজন মাহফুজুল করিম, পেশায় ব্যাংকার। গতকাল হাম ওয়ার্ড থেকে বের হতেই বারান্দায় কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি জানান, তার সন্তান রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিল। হামের উপসর্গ থাকায় শিশুসন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি। তবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর ওই হাসপাতাল আর তাকে সেখানে রাখেনি। কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, হাম শনাক্ত হওয়া রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে রাখা যাবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে সন্তানকে তিনি বিএমইউতে ভর্তি করান তিনি।
এই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তো বাধ্য হয়ে এখানে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু এখানে পদে পদে সমস্যা। ভর্তি ফি সামান্য কয়টা টাকা। কিন্তু এক বিল্ডিং থেকে এটার স্লিপ সংগ্রহ করতে হবে, আরেক বিল্ডিংয়ে গিয়ে স্লিপে উল্লেখ করা টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ব্যাংক রসিদ এনে আবার এই বিল্ডিংয়ে জমা দিতে হয়।
একই প্রক্রিয়া প্রতিটি পদে পদেই। একটা সাধারণ ‘টিউব’ আনতে হলেও এই একই প্রক্রিয়া। আর এত এত বিল্ডিংয়ের মধ্যে এসব খুঁজে বের করাও অনেক কঠিন ব্যাপার।
তিনি বলেন, বাচ্চার সঙ্গে ওয়ার্ডে আমার স্ত্রী আছেন। এখানকার নিয়ম অনুসারে আমরা পুরুষ কেউ এই ওয়ার্ডে থাকতে পারব না। এটা আরেকটা ঝামেলা। বাচ্চার মা কি তার কাছে থাকবে, নাকি একটা ওষুধের প্রয়োজন হলে বের হয়ে বিল্ডিংয়ে বিল্ডিংয়ে বা ফার্মেসিতে দৌড়াদৌড়ি করবে! প্রাইভেট হাসপাতাল তো টাকা নেয়, কিন্তু যখন যা লাগে, সব তারা ব্যবস্থা করে।
তিনি বলেন, তার ওপর একটা স্যালাইন লাগিয়ে দিলে এটি কখন বন্ধ করবে, কী করবে, তা আর দেখতে আসেন না নার্সরা। কিন্তু আমার স্ত্রীও তো আর এসব বোঝেন না। আমরা সাধারণ মানুষ, বোঝার কথাও না। কিন্তু নার্স আমার স্ত্রীকে বলে দিয়েছেন যে, তাকে এগুলো বুঝতে হবে।
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু নাছের বলেন, হাম ওয়ার্ডের শয্যা বরাদ্দ আছে ৮টি। অথচ আমাদের একজন নার্সকে ৩০-৪০ জন রোগীর দেখভাল করতে হয়। তিনি বলেন, রোগীর চাপ অনুসারে আমাদের এখানে ডাক্তার-নার্সসহ সব ক্ষেত্রেই লোকবলের সংকট আছে। আর আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর ভরসা রাখি আমরা। তা ছাড়া আমাদের ভবনগুলোর বিভিন্ন স্থানে নির্দেশিকা আছে কোন ভবনের কোথায় কী আছে, তা জানার জন্য দায়িত্বরত আনসারদের সহযোগিতা নেওয়া যায়।
হাম ও এর উপসর্গে আরও ৭ মৃত্যু
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হাম ও হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় (গত বুধবার থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টা) দেশে আরও সাত শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে একটি শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল বাকি ছয় শিশুর।
এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৩৬৩ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্যও দিয়েছে অধিদপ্তর। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও এর উপসর্গে দেশে ৩৬৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৭০ জনের। অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশু। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ শিশু। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩৪ হাজার ৯৬৮ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৩০৫ শিশুর শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও অধিদপ্তর উল্লেখ করেছে।