নারায়ণগঞ্জ জেলায় পাশাপাশি দুইটি স্টেডিয়াম। একটি ওসমানি স্টেডিয়াম। পাশেই ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ওসমানী স্টেডিয়াম অনেক পুরোনো। মূলত ফুটবল খেলাই বেশি হয়ে থাকে। ক্রিকেট খেলাও হতো। পরে স্টেডিয়ামের পাশে নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে ক্রিকেটের জন্য মাঠ নির্মাণ করা হয়। যেটি মূলত নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জের ক্রিকেট চর্চা এই মাঠেই হয়ে থাকে। সকাল-বিকেল দুই বেলা ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি, নিট কনসার্ন ক্রিকেট একাডেমি, রেইনবো ক্রিকেট একাডেমি, রাইফেল ক্লাবসহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন খেলোয়াড়দের নিয়ে অনুশীলন করে থাকে। যেখানে অধিকাংশই স্কুলছাত্র।
এই স্কুলছাত্রদের মাঝে ১০ বছরের নিচেও অনেক ছেলে আছে। প্রতিদিন সকাল থেকে তারা অনুশীলন করে থাকলেও গতকাল রবিবার ছিল তাদের জন্য অন্য রকম। আগে থেকেই তারা জানতেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আসবেন। সবার মাঝে তাই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করছিল। বিরাজ করছিল উত্তেজনা। এই উত্তেজনা ছিল বুলবুলকে সামনা সামনি দেখার। এদিন তারা অনুশীলন করে আর বাড়ি ফিরে যাননি। অপেক্ষায় ছিলেন বিসিবি সভাপতির। প্রখর রৌদ্রে তারা মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির আয়োজনে এই অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল Cricket Development & Idea.
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসার পথে ফতুল্লা রিয়া গোপ স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ওসমানী স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছালে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর তিনি মাঠের হালকা কাদা মাড়িয়ে সরাসরি চলে যান সেই সব অপেক্ষারত ছোট ছোট ক্রিকেটারদের কাছে। তাদের মাঝে কিছু মেয়ে ক্রিকেটারও ছিলেন। বুলবুলকে সামনা সামনি পেয়ে তাদের মাঝে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয়। এ অস্থিরতা বুলবুলকে আরও কাছে পাওয়ার। ছবি তোলার। অটোগ্রাফ নেওয়ার। এ জন্য তাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। কারণ মাঠের এক পাশে অস্থায়ী মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয় বিসিবি সভাপতিকে।
এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বুলবুলের সঙ্গে আসা বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম মিঞা, সদস্য মাসুদুজ্জামান, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ, জাকারিয়া ইমতিয়াজ, গোলাম গাউস, সাবিত আল হাসান, মো. হাসান (নুরজামাল), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলমগীর হুসাইন, সাবেক ক্রিকেটার ডালিম, জাহাঙ্গীর, রনি তালুকদার, শহিদুল, ডালিম, মনা, পাপ্পু, টিক্কা, কোচ জলিসুর রহিম, জিয়াউল হক, মশিউর রহমান সোহেল প্রমুখ।
বক্তৃতাপর্ব শেষ হওয়ার পর অপেক্ষারত ক্ষুদে ক্রিকেটারদের জন্য আসে সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত লগন। বিসিবি সভাপতির সঙ্গে করমর্দন করার পালা। যারা এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছিলেন, মাইকে ঘোষণা শোনা মাত্র কার আগে কে দাঁড়াবেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এ সময় কিছুটা বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। কিন্তু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে লাইনে দাঁড়ানোর নির্দেশনা পাওয়ার পর সবাই নিজ নিজ জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন। এদিকে বুলবুল একে একে হাত মেলাতে মেলাতে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু সহজেই ছাড় পাচ্ছিলেন না। কেউ কেউ অটোগ্রাফও নেন। কেউ কেউ হাত মেলানোর পর ছবি তোলারও বায়না করেন। বুলবুল হাসিমুখে তাদের কাছে টেনে নিয়ে ছবি তোলেন। আবার কারও কারও সঙ্গে নিজ থেকেই কথা বলে তাদের সম্পর্কে জেনে নেন। এভাবে একে একে সবার সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়ের পর তিনি চলে যান নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। যথারীতি ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। সবাই ছিলেন মেয়ে ক্রিকেটার।
নাসিফ নামের এই খুদে ক্রিকেটারের কাঁধে এভাবেই হাত রেখে বুলবুল ছবি তোলেন। ছবি : সংগৃহীত
বুলবুলকে পেয়ে তাদের মাঝেও অস্থিরতা বিরাজ করতে থাকে ছবি তোলা আর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। এখানে বিসিবি সভাপতি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেওয়ার পর শুরু হয় ছবি তোলার হিড়িক। সবাইকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তোলা হলেও এতে যেন তারা তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। সেলফি বা এককভাবে ছুবি তোলার চাহিদা ছিল কম-বেশি সবার। বুলবুল হাসিমুখে সবার আবদার পূরণ করেন। বাদ যাননি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। সেখান থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের রুমে আসতে এক মিনিটের পথ বুলবুলকে পাড়ি দিতে হয়েছে বেশি সময় নিয়ে। কারণ ধাপে ধাপে ছুবি তোলা আর অটোগ্রাফ দেওয়ার আবদার পূরণ করতে হয়েছে। এর মাঝে একটি মেয়ে এসে তার স্কুলড্রেসে অটোগ্রাফ দিতে বায়না করেন। কিন্তু বুলবুল তার সে আবদার পূরণ করতে পারেননি। তিনি এভাবে অটোগ্রাফ দিতে রাজি হননি। পরে সেই মেয়েকে খাতা নিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সেই মেয়ের পক্ষে আর খাতা নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এভাবেই বুলবুলকে পেয়ে তারা আনন্দময় একটি দিন পার করেন মেয়েরা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমপ্লেক্সে বক্তৃতায় বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল নারায়ণগঞ্জের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘এই নারায়ণগঞ্জ আমাদের জন্য আইডল ছিল। এখানের ক্রিকেটের ইতিহাস বেশ বড়। আমি যখন খেলতাম, তখন নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে আমার এক সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এখানে বিভিন্ন লীগ অনুষ্ঠিত হতো।’ ফতুল্লা রিয়া গোপ আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের করুণ অবস্থা দেখে তার কান্না এসে গেছে বলে জানান বুলবুল। তিনি বলেন, ‘এখানে আসার আগে আমি ফতুল্লা স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। স্টেডিয়ামটির করুণ অবস্থা দেখে আমার কান্না চলে আসছে। এখানে একসময় অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো। অথচ এই মাঠটির অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত করুণ।’
ছোট ছোট ক্রিকেটারদের উদ্দেশে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘ক্রিকেট জীবনের ছোট্ট একটি অংশ। আমার সামনে ভবিষ্যতের ক্রিকেটাররা বসে আছেন। আমি জানি এখানে সম্ভাবনাময় অনেক খেলোয়াড় আছে, যারা আগামী দিনের তামিম, সাকিব হবে। আমার ইচ্ছা নারায়ণগঞ্জে একটি ইনডোর স্টেডিয়াম করার। তাহলে ক্রিকেট খেলোয়াড়রা সব সময় খেলার মধ্যে থাকতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় বছরের নির্দিষ্ট সময় ক্রিকেট খেলা হতো। এখন ১২ মাসই খেলা হয়। আশা করছি, আগামী এক দেড় বছরের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জে এত উন্নয়ন করব, যেন নারায়ণগঞ্জের খেলোয়াড়দের বিভিন্ন লেভেলে খেলার জন্য ঢাকায় যেতে না হয়। এখানেই তারা কোচ পাবেন। সবকিছুই আমাদের পাইপলাইনে আছে। আমি আজ যেসব কথা বলছি তা যেন বাস্তবায়ন করতে পারি সে জন্য দোয়া করবেন। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এসব কাজের কথা বলছি। কারণ আইসিসিতে থাকাকালে আমি এই কাজগুলোই করে এসেছি।’
পলাশ/নিলয়/