বিসিবির গঠনতন্ত্রে সভাপতিকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতার জোরে সভাপতির কর্মকাণ্ড অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়। নাজমুল হাসান পাপনের সময় তিনি এই ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়েছেন। এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে পরিচালনা পর্ষদের অনেকে জানতেনই না। আবার তার সিদ্ধান্তে বিরোধিতাও করা যেত না। গঠনতন্ত্রে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়ার পরও নাজমুল হাসান পাপন গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে আরও অনেক কাজ করতেন। কখনো কখনো তিনি গঠনতন্ত্রই মানতে না। চার মেয়াদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি মেয়াদে তিনি দুজন সহসভাপতিই নির্বাচিত করেননি। আবার কোনো মেয়াদে দুজন সহসভাপতি নির্বাচিত করলেও তাদের অকেজো করে রেখেছিলেন।
বিসিবির গঠনতন্ত্রে সভাপতির অনুপস্থিতিতে সহসভাপাতি দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে। বিসিবির গঠনতন্ত্রের ১৪.২.২ ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘সভাপতির অনুপস্থিতে সভাপতি কর্তৃক মনোনীত যেকোনো একজন সহসভাপতি সভাপতির দায়িত্ব পালন করিবেন। তবে সভাপতি পদে আকস্মিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে অথবা সভাপতি কোনো কারণে স্বীয় পদে দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা অপারগ হলে যথানিয়মে সভাপতি নিয়োগ না হওয়া অথবা সভাপতি পুনরায় দায়িত্ব পালন আরম্ভ না করা পর্যন্ত সভাপতি কর্তৃক মনোনীত ০১ (এক) জন সহসভাপতি সভাপতির দায়িত্ব পালন করিতে পারিবেন।’ কিন্তু নাজমুল হাসান পাপন কখনো গঠনতন্ত্রের এই ধারায় হাঁটেননি। তিনি নেই, কিন্তু তারা ছায়া রয়ে গেছে।
বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও হাঁটছেন নাজমুল হাসান পাপনের দেখিয়ে দেওয়া পথেই। তিনিও গঠনতন্ত্রের ধার ধারেন না। যখনই তিনি দেশের বাইরে যাচ্ছেন, নাজমুল হাসান পাপনের মতো কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। দেশের বাইরে থেকে তিনি টেলিফোনে দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাক্ষর দেওয়ার বিষয়গুলো স্কেন করে ই-মেইল সমাধান করে নিচ্ছেন। অথচ বুলবুলের পরিচালনা পর্ষদে দুজন সহসভাপতি আছেন মো. শাখাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম মেয়াদের মতো দ্বিতীয় মেয়াদেও আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে কখনো বিসিবির কাজে, কখনো ব্যক্তিগত কাজে একাধিকবার দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। বিসিবির কাজে দেশের বাইরে গেলে খুব বেশি দিন থাকা হয়নি তার। কিন্তু ব্যক্তিগত কাজে গেলে বেশ কয়েক দিন থাকা পড়ে। তার পরিবার অস্ট্রেলিয়াতে থাকাতে প্রায়ই তাকে সেখানে যেতে হয়। বর্তমানে তিনি বেশ লম্বা সময় ধরে অস্ট্রেলিয়াতে অবস্থান করছেন। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই তিনি সবচেয়ে বেশি দিন অস্ট্রেলিয়া অবস্থান করছেন। গিয়েছেন ১৬ ফেব্রুয়ারি। যাওয়ার আগে কবে ফিরবেন এ ব্যাপারে তিনি সরাসরি কিছু না বলে গেলেও বিভিন্ন পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গিয়েছিল তিনি অল্প কিছুদিন থেকেই ফিরে আসবেন।
কিন্তু তার যাওয়ার ৩ সপ্তাহের বেশি হয়ে গেছে। এখনো ফিরেননি। শোনা যাচ্ছে তিনি ফিরবেন ঈদের পর। সে হিসেবে তার থাকা পড়বে প্রায় দেড় মাসের মতো। বিসিবির ইতিহাসে কোনো সভাপতি এভাবে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকেননি। তিনি হয়তো তার কাজ অনলাইনে সেরে নিচ্ছেন। কিন্তু কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে না যাওয়াতে তার লম্বা সময় অনুপস্থিতিতে বিসিবিতে এক রকম অব্যবস্থাপনা ও শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির এক পরিচালক বলেন, ‘এতে করে কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে। সভাপতি স্বশরীরে উপস্থিত থাকলে কাজে অনেক বেশি গতিশীলতা আসে। চেইন অব কমান্ড বজায় থাকে। যা মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। সভাপতি না থাকাতে এখন বিসিবিতে সবাই সভাপতি। কেউ কাউকে মানছেন না!’
আমিনুল ইসলাম বুলবুল দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গেলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হতেন সহ-সভাপতি বরিশাল বিভাগ থেকে নির্বাচিত পরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন। এ ব্যাপার তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাননি।’ আরেক সহসভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আমাকে কিছু বলে যাননি।’ আমিনুল ইসলাম বুলবুল প্রথম মেয়াদে ৪ মাসের খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালনকালে খুব একটা বিতর্ক ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেই চলেছেন। সেটা শুরু হয়েছে অবশ্য তার কাউন্সিলর হওয়ার প্রক্রিয়া থেকেই। দ্বিতীয় মেয়াদে তার এখন ৪ মাস পূর্ণ হয়ে ৫ মাস চলছে। এ সময়ে তিনি একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন।
বিসিবির ইতিহাসে তিনিই হতে যাচ্ছেন প্রথম সভাপতি, যার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের মতো দেশের বিপক্ষে একটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে। এক পরিচালক বলেন, ‘এতদিন দেশের বাইরে থাকলে, তার সভাপতি হওয়ার দরকার কী! একটা আন্তর্জাতিক সিরিজ হবে। অথচ তিনি নেই। কত সমস্যা তৈরি হতে পারে। সব কিছু কি আর ওভার ফোনে করা যায়।’
এ নিয়ে বিসিবির সাবেক পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বলেন, ‘ভেতরে কী হয়েছে আমি বলতে পারব না। তবে সভাপতির অনুপস্থিতিতে নেক্সট যে আছেন, তিনিই হতে পারেন। এতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এটা অটোমেটিকই হওয়া উচিত।’ বিসিবির আরেক সাবেক পরিচালক ও সর্বশেষ নির্বাচনে জামালপুর থেকে কাউন্সিলর হয়ে আসা আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি- তার সভাপতি হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। যেটি তার কর্মকাণ্ডেই বোঝা যায়। একটার পর একটা বিতর্ক তৈরি করেই যাচ্ছেন। আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই, একজন সভাপতি কীভাবে এত দীর্ঘসময় দেশের বাইরে থাকতে পারেন? আবার কাউকে দায়িত্ব দিয়ে না যাওয়া-ও তিনি ঠিক করেননি। আসলে তিনি কী চান তা হয়তো তিনি নিজেই জানেন না বা বোঝেন না। তিনি খুবই লোভী প্রকৃতির একজন ব্যক্তি।’
বিসিবির সাবেক পরিচালক মঈনউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সংগঠককে হতে হয় উদার মনমানসিকতার। বিসিবির সভাপতির মাঝে তার ঘাটতি আছে। দেশের বাইরে গেলে সহসভাপতিকে দায়িত্ব দিয়ে যাবেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ফিরে আসার পর আবার নিজের দায়িত্ব তিনি পালন করবেন। এটি গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু তিনি তা না করে চরমভাবে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করেছেন। তাকে তো নিয়ম মেনে চলতে হবে। তিনি তো সারা জীবনের জন্য সভাপতি হয়ে আসেননি। সভাপতিই যদি নিয়ম না মানেন, সেখানে চেইন অব কমান্ড থাকে না। এটা তার স্বেচ্ছাচারী মনোভাব। এমন সভাপতির কাছে কী আশা করা যায়?’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘সভাপতি হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তার (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) নেই। গঠনতান্ত্রিক বিষয়গুলো তার জানা আছে। দেশের বাইরে যাবেন। কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে হবে। দায়িত্ব দেওয়াটা বিশ্বাস করা। উনি ফারুক ভাইকে বিশ্বাস করেন না। আরেকজন যিনি আছেন মো. শাখাওয়াত, তার যোগ্যতা নিয়ে সভাপতি নিজেই সন্দিহান যে, তিনি এই পদের জন্য যোগ্য কি না? সব মিলিয়ে প্রশাসনিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থা চলছে। এভাবে একজন অযোগ্য-অথর্ব লোকের বিসিবির মতো দায়িত্বের সভাপতি হওয়া আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। আর তিনি এভাবে এক মাসের ওপরে দেশের বাইরে থাকার সুযোগই নেই। আসলে এভাবে একটি দেশের বোর্ড চলতে পারে না।
পলাশ/অনিক/