প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা মানবজাতির চিরন্তন এক অনুভব। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল ও কৃত্রিমতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই অনুভবকে একটু ছুঁয়ে দেখার সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত চিড়িয়াখানাটি শুধু শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জায়গা নয়, বরং সব বয়সী মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার।
১৯৭৪ সালের ২৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা বর্তমানে প্রায় ৭৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির ৩ হাজারেরও বেশি প্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ ও জলজ প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফ, হরিণ, কুমির, সাপ ও বিদেশি পাখি- সবকিছু মিলিয়ে এটি যেন এক ছোট্ট পৃথিবী, যেখানে প্রকৃতি নিজেই তার রং ও রূপে ধরা দিয়েছে।
চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেই চোখে পড়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজে ঘেরা পথ। পথের দুই পাশে ছায়াদার গাছ আর ফুলের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা খেলার জায়গা, যেখানে তারা মুক্তভাবে দৌড়াতে ও খেলতে পারে। পরিবার নিয়ে যারা আসেন, তাদের জন্যও রয়েছে বসার জায়গা ও খাবারের আয়োজন। প্রতিটি খাঁচার সামনে প্রাণীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসংবলিত বোর্ড থাকায় শিক্ষার্থীরা শুধু বিনোদনই নয়, শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো বাঘ ও সিংহের খাঁচা। এই দুই প্রাণীর কর্মকাণ্ডে শিশুদের মনে রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া জিরাফ, জেব্রা ও উটের মতো দূরদেশীয় প্রাণী দেখা যায় কাছ থেকে। পাখিদের খাঁচায় রঙিন টিয়া, ময়না, হর্নবিল বা ম্যাকাও পাখির ঝাঁক যেন এক স্বপ্নপুরীর ছবি আঁকে। কুমিরের পুকুর, অজগরের কাচ ঘেরা ঘর কিংবা উন্মুক্ত হরিণ প্রাঙ্গণ- সবই দর্শনার্থীদের মনোমুগ্ধ করে।
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি গবেষণা ও সংরক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিরল প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজননের মাধ্যমে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার প্রাণীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে সুস্থ রাখা হয়। চিড়িয়াখানায় রয়েছে প্রাণী চিকিৎসাকেন্দ্র ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী, যারা প্রতিদিন প্রাণীদের পরিচর্যায় নিয়োজিত।
এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়। অনেক বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে জীববিজ্ঞানের পাঠ বাস্তবে দেখতে পায়, যা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এক বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আলোকচিত্রপ্রেমীদের জন্যও এটি একটি দারুণ গন্তব্য।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলতে হয়। অনেক সময় কিছু খাঁচা অপরিষ্কার থাকে, কিছু তথ্য বোর্ড ধোঁয়াশা বা পুরোনো হয়ে যায়। পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার বা পানির ব্যবস্থা না থাকাও মাঝে মাঝে সমস্যার সৃষ্টি করে। দর্শনার্থীদের জন্য উন্নত দিকনির্দেশনা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যদি মনোযোগ দেয়, তবে দর্শকসংখ্যা আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা একটি এমন স্থান যেখানে মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য ও নানা প্রাণীকে কাছ থেকে দেখতে পারে। এটি আমাদের পরিবেশ ও প্রাণিকুল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবারের সঙ্গে একটি আনন্দময় দিন কাটানোর পাশাপাশি শিশুদের শেখার একটি চমৎকার জায়গা এই চিড়িয়াখানা। সময় সুযোগ করে একবার ঘুরে আসা যেতে পারে প্রকৃতি ও প্রাণীর এই মিলনমেলায়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমেই আসি মেট্রোরেলের কথায়। যেকোনো স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে মিরপুর-১০ বা মিরপুর-১১ স্টেশনে নামতে হবে। সেখানে থেকে চিড়িয়াখানার প্রবেশদ্বার মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। সিএনজি অটোরিকশা অথবা রিকশায় করে সহজেই পৌঁছানো যাবে।
চাইলে লোকাল বাসেও যাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ী, গাবতলী বা শাহবাগ থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানায় যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। বাস থামে চিড়িয়াখানা বাসস্ট্যান্ডে। এ ছাড়া রাইড শেয়ারে অর্থাৎ উবার-পাঠাওয়ে সহজেই চিড়িয়াখানায় যাওয়া যায়।
সতর্কতা
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণীদের সুস্থতার স্বার্থে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন। যেমন-
○ প্রাণীদের খাঁচায় কিছু ফেলবেন না: খাবার, বোতল, কাগজ বা কোনো বর্জ্য প্রাণীদের ক্ষতি করতে পারে।
○ প্রাণীদের উত্ত্যক্ত করা বা ভয় দেখাবেন না: চিৎকার, পাথর ছুড়ে মারা বা লাঠি দিয়ে খোঁচানো নিষেধ।
○ খাঁচার খুব কাছে বা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন না: নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
○ নিজস্ব খাবার প্রাণীদের খাওয়াবেন না: চিড়িয়াখানার প্রাণীরা নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা অনুসারে খাবার পায়।
○ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: নির্ধারিত ডাস্টবিনে ময়লা ফেলুন; পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে সহায়তা করুন।
○ শিশুদের চোখে চোখে রাখুন: শিশুরা যাতে খাঁচার বেশি কাছে না যায় বা প্রাণীদের বিরক্ত না করে, তা নিশ্চিত করুন।
○ নির্ধারিত পথ অনুসরণ করুন: নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও সময় বাঁচাতে মূল পথ বা নির্দেশনা মেনে চলুন।
○ প্রয়োজনে গাইড বা নিরাপত্তাকর্মীদের সাহায্য নিন: কোনো বিপত্তি বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্বিধা না করে সহায়তা নিন।
○ প্রাণীদের ছবি তুললেও ফ্ল্যাশ ব্যবহার করবেন না: ক্যামেরার ফ্ল্যাশ অনেক প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। এটা দেখে তারা উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে।
○ চিড়িয়াখানার নিয়মকানুন মেনে চলুন: প্রবেশপত্রের পেছনে বা প্রবেশদ্বারে লেখা নিয়মাবলি ভালোভাবে পড়ে অনুসরণ করুন।
○ ধূমপান ও আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ: এটি প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আইনত দণ্ডনীয়।
○ রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি এড়িয়ে চলুন: অন্য দর্শনার্থীদের বিরক্ত না করে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন।






