ঘুরে বেড়ানোর জন্য আমাদের দেশে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। এ জেলায় রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্যে ঘেরা অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। এমনকি পদ্মা মেঘনার একমাত্র মিলনস্থলের অপরূপ সৌন্দর্য। তবে এ জেলাটির বিশেষ আকর্ষণ সুস্বাদু রুপালি ইলিশ। একদিনেই ঘুরে বেড়ানোর জন্য নির্ভরযোগ্য স্থান চাঁদপুর সম্পর্কে জানাব আজ।
রূপসা জমিদারবাড়ি
চাঁদপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ফরিদগঞ্জ উপজেলা শহর। সেখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া যায় রূপসা জমিদারবাড়িতে। এটাই চাঁদপুরের একমাত্র জমিদারবাড়ি, যার অবস্থান জনবহুল জায়গায়, একদম রূপসা বাজারের পাশে। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করা হয় এই বাড়িটি। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আহম্মদ রাজা চৌধুরী। দেশের বেশির ভাগ জমিদারবাড়ির যখন ভগ্নদশা, তখন চাঁদপুরের এই জমিদারবাড়িটি সংস্কার করে এখনো প্রায় আগের মতোই সুন্দর করে রাখা হয়েছে। প্রায় ২৫০ বছর আগে বংশাল গ্রামের, বর্তমান খাজুরিয়া গ্রামের হিন্দু জমিদারদের জমিদারির পতন হলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে এই জমিদারি কিনে নেন আহম্মদ রাজা চৌধুরী। তিনি রূপসা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন; যদিও এই জমিদার বাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা কে তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। এ ছাড়া এ উপজেলায় আরো রয়েছে কড়ৈতলী জমিদারবাড়ি, শোল্লা জমিদারবাড়ি ও লোহাগড় জমিদারবাড়ি। এমনকি পুরো চাঁদপুর জেলায় রয়েছে ইতিহাস ঘেরা এরকম আরো ছয়টি জমিদারবাড়ি।
ঐতিহাসিক বড় মসজিদ
চাঁদপুর জেলা শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার পূর্বে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে হাজীগঞ্জ বাজারে অবস্থিত। এই মসজিদটি চাঁদপুর জেলার একটি প্রাচীন মসজিদ। শুধু বয়সের দিক থেকে নয়, আয়তনের দিক দিয়ে এই মসজিদটি উপমহাদেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ মসজিদ। জুমাতুল বিদার বৃহত্তম জামাত এই মসজিদে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। এসব কারণে মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
বর্তমানে ২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুট ভূমির ওপরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান। ১৮৮ ফুট উচ্চতার মিনার বেষ্টিত মসজিদটি আহমাদ আলী পাটোয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলা একাদশ শতকের শুরুর দিকে মকিম উদ্দিন (রহ.) আরব দেশে থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে হাজীগঞ্জ আসেন। তার নামানুসারেই পরবর্তী সময়ে এই স্থানের নাম হয় মকিমাবাদ। সেই সময়ে মসজিদটি খড়ের নির্মিত একচালা ছিল। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৭ আশ্বিন মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.) পাকা মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণকাজ শেষ হলে ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ১০ অগ্রহায়ণ এই মসজিদে প্রথম জুমার নামাজ পড়ানো হয়। সেই নামাজে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
মিনি কক্সবাজার
পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত মিনি কক্সবাজার পর্যটনকেন্দ্রটি। এটি নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটনকেন্দ্র। এর চারদিকে নদী হওয়ায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো দেখায়। তাই পর্যটকরা এমন নাম দিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে বালু চর, পদ্মার চর ও মেঘনার চর নামেও এর পরিচিতি রয়েছে। ডিসেম্বর থেকে চলমান এই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এই স্থানে ঘুরতে আসেন।
অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন না থাকলেও স্বল্প খরচ আর কম সময়ের মধ্যে ঘুরে দেখা যায় এ স্থানটি। চাঁদপুর বড় স্টেশন থেকে জনপ্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ট্রলার নিয়ে ঘুরে আসা যায় মিনি কক্সবাজারখ্যাত পদ্মার বালুর চর থেকে। জানুয়ারিতে এখানে রয়েছে আরও একটি সৌন্দর্য। স্থানীয় কৃষকরা এই চরে সরিষার চাষ করেন। হলুদের সমারোহে সরিষা ফুলে মন জুড়িয়ে যায় যেকোনো পর্যটকের। দলবেঁধে কিংবা পিকনিক স্পটের জন্য খোলামেলা এ স্থানটি হতে পারে বিনোদন স্পট।
ত্রি নদীর মোহনা
দেশের পদ্মা ও মেঘনা নদীর একমাত্র মিলনস্থল এই চাঁদপুরে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডাকাতিয়া নদীও। এই তিন নদীকে ঘিরে স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন ত্রি নদীর মোহনা। মূলত এটি চাঁদপুর বড় স্টেশন কিংবা মোল হেড নামেও বেশ পরিচিত। শহরের কাছেই নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর সুন্দর একটি স্থান। এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কেন্দ্র নেয়, বরং রহস্যময় কাহিনি ও বিপদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবেও পরিচিত। এখানে নদীর বিশাল স্রোত আর ভয়ংকর ঘূর্ণিপাক দেখার জন্য প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমায়। মোলহেড থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা অপূর্ব। নদীর তীর থেকে পশ্চিম দিকে বিস্তৃত দিগন্তজোড়া সূর্যের মেলান্দাজ এ স্থানের প্রধান আকর্ষণ। তিনটি নদীর জলধারা একত্রে মিশে যে দৃশ্যপট সৃষ্টি করে তা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। পদ্মা, মেঘনা এবং ডাকাতিয়ার তীব্র স্রোত মোলহেড এলাকায় বিশাল ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করে।
আরও কিছু দর্শনীয় স্থান
চাঁদপুরে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আরও আছে বাংলাদেশের একমাত্র মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, চাঁদপুর সদরের ফারিসা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, মতলব উত্তরের মোহনপুর পর্যটনকেন্দ্র, কচুয়ার সাচারের কলাকোপা কৃত্রিম পার্ক, চাঁদপুর শহরে রয়েছে অঙ্গীকার ভাস্কর্য, বড় স্টেশন মোলহেডে রয়েছে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত রক্তধারা ভাস্কর্য ও জাতীয় মাছ ইলিশের আদলে নির্মিত ইলিশ ভাস্কর্য। যদিও শহরের প্রবেশদ্বার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে ইলিশ চত্বর। এমনকি চাঁদপুর সদর ও ফরিদগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ডাকাতিয়া নদীর উপর নির্মিত সবচেয়ে বড় দৃষ্টিনন্দন ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ সেতু।
কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো স্থান থেকে সড়ক, রেল ও নৌপথে খুব সহজেই যাওয়া যায় চাঁদপুরে। সড়কপথে যেতে হলে কুমিল্লা হয়ে চাঁদপুর জেলা শহরে আসা যায়। এ ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা থেকে বিআরটিসি ও পদ্মা বাস পাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এ ছাড়া স্বল্প সময়ে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে গৌরীপুর বা শ্রী রায়েরচর থেকে মতলব হয়ে বাবুরহাট দিয়েও চাঁদপুর জেলা শহরে আসা যায়।
নৌপথে আসতে চাইলে ঢাকা সদরঘাট থেকে সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চাঁদপুরের উদ্দেশে বিভিন্ন লঞ্চ ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে আসনভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে অটোরিকশায় ১০ টাকায় শহরের কালিবাড়ি বা কোর্ট স্টেশনে আসতে পারবেন। তা ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকেও বেলা ১১টায় সাগরিকা এবং রাত ৮টায় আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় চাঁদপুর কোর্ট স্টেশন বা বড় স্টেশনে এসে নামা যায়।
কোথায় থাকবেন
চাঁদপুর শহরে থাকার জন্য হোটেলের মধ্যে সদর হাসপাতালের সামনে হোটেল গ্র্যান্ড হিলশা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া চাঁদপুর কোর্ট স্টেশনের কাছে মোটামুটি মানের কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন। আর চৌধুরী ঘাট বা নতুন ব্রিজের কাছে নদীর পাড়ে আরও কিছু মধ্যম মানের হোটেল রয়েছে।
কোথায় খাবেন খিদে মেটানোর জন্য চাঁদপুরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু খাবার হোটেল রয়েছে। আপনার পছন্দমতো যেকোনো হোটেলে খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। বড় স্টেশনের হিলশা কিচেন কিংবা কালিবাড়ি কয়েকটি বাংলা ও চাইনিজ হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
এ ছাড়া হাজীগঞ্জ শহরে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের হোটেল রয়েছে। অবশ্যই ফরিদগঞ্জের আউয়াল ভাইয়ের মিষ্টি এবং ওয়ান মিনিট আইসক্রিমের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। যেহেতু ইলিশের রাজধানী চাঁদপুর, তাই তাজা ইলিশ খেতে হলে বড় স্টেশনের ঝুপড়ির হোটেল অথবা লঞ্চ ঘাটের হোটেলগুলোয় ঢু মারতে পারেন।
লেখক: সমাজকর্মী






