কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশায় এবার কোথাও তেমন ঘুরতে যাওয়া হয়নি। মাঘের শেষে মনের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে একদিনের ছুটিতে ঢাকার কাছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভাণ্ডার নবাবগঞ্জ উপজেলার আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিই। আবহাওয়ার পালাবদলে শীতের শেষে স্নিগ্ধ সকালে রাজধানীর কদমতলী থেকে সারা দিনের জন্য মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে রওনা হলাম। আমার ভ্রমণসঙ্গী হলেন পূর্ণিমা, রুদ্রদীপ, রুপন, কৌশিক, কনা ও বড় ভাই অনিক।
ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত তুলসীখালি সেতু পার হওয়ার পর রাস্তার দু-পাশের সরিষা ফুলে হলুদের সমারোহ ভ্রমণের আনন্দ বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ রুদ্রদীপ বায়না ধরল হলুদ চাদর বিছানো সরিষা ফুল ছুঁয়ে দেখার। মাইক্রোবাস থামল। নানা রঙের প্রজাপতি আর সরিষা ফুলে মৌমাছির মধু সংগ্রহ করার দৃশ্য দেখে নিলাম। এর পর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য কলাকোপায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ি বজ্র নিকেতনে। আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকা আরেক প্রিয়জন হৃদয় এই ভ্রমণে যুক্ত হয়েছেন নবাবগঞ্জ থেকে। তিনি আমাদের নবাবগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখাবেন।
এক এক করে আমরা বজ্র নিকেতনের প্রবেশপথ ধরে ভেতরে ঢুকলাম। দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই অন্যরকম এক ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। ব্রজ নিকেতন বর্তমানে জজবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চোখধাঁধানো নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হলাম। ২০০ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে এটি নির্মাণ করা হয়। জমিদারবাড়িটি অতি প্রাচীনকালের ঐতিহ্যবাহী নকশায় তৈরি। দেয়াল, থাম, দরজা ও বারান্দা বিভিন্ন অলংকরণে নান্দনিক রূপ রয়েছে। দ্বিতলবিশিষ্ট বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নশালা। চারদিকে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ শোভা। জজবাড়িটির সামনে খানিকটা বাগান। সেটা ফল ও ফুলগাছে পরিপূর্ণ। বিশালাকৃতির ঐতিহ্যবাহী বাড়ির পাশেই রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট।
এর পর গেলাম জজবাড়ির পাশেই প্রাচীন আরেক জমিদারবাড়িতে। এটি উকিলবাড়ি নামে খ্যাত। অনিন্দ্য সুন্দর বাড়িটি। চারদিকে দৃষ্টিনন্দন গাছ-গাছালিতে ভরপুর। ছায়া সুনিবিড় সুন্দর পরিবেশ। ঠিক সামনে রয়েছে পুকুরঘাট। পুকুরপাড়ে একটি বাংলো আকৃতির বাড়িও আছে। উকিলবাড়িটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝরনা গার্ডেন রেস্তোরাঁ।
শান বাঁধানো ঘাটে বিশ্রাম নিয়ে আঁকবাঁকা পথ ধরে কিছুটা হেঁটে চলে এলাম খেলারাম দাতার আন্ধারকোঠা বাড়ির সামনে। খেলারাম দাতার বাড়ি নবাবগঞ্জের মূল আকর্ষণ। জনশ্রুতি রয়েছে, খেলারাম ধনীদের ধনদৌলত ডাকাতি করে গরিবদের মাঝে দান করতেন। অনেকেই বলেন, এক রাতে পাঁচতলা বিশাল বাড়িটি মাটি থেকে উঠে এসে ৩ তলা মাটির নিচে দেবে যায়। বর্তমানে দ্বিতীয় তলা অবশিষ্ট রয়েছে। আট গম্বুজবিশিষ্ট দালানটির ভেতরের পরিবেশ অন্ধকার। বাড়িটি কয়েক শ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল শুধু চুন, সুরকি আর ছোট ছোট ইট দিয়ে। কী অদ্ভুত, ভাবা যায়! সিঁড়ি ধরে আমরা সবাই দোতলায় উঠেই অভিভূত হলাম এর নির্মাণকাজ দেখে। আন্ধারকোঠা থেকে বেরিয়ে নববাগঞ্জের আকর্ষণীয় প্রাচীন বেশকিছু জমিদারবাড়ি দেখে বেরিয়ে পড়লাম।
আবার মাইক্রোবাস চলা শুরু করল। হলিক্রস স্কুলের পাশ ঘেঁষে চলে আসি হৃদয়ের বসতবাড়ি বান্দুরায়। সূর্যের উষ্ণতা ধীরে ধীরে অনুভব করছি। শীতের শেষের এই মিষ্টি রোদের উজ্জ্বল আলোয় দুপুর ভালো লাগে। দুপুরের সূর্যটা খানিকটা দক্ষিণে বেঁকে যায়। হৃদয়ের বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে যার যার মতো বিশ্রাম নিলাম।
বিকেলে আবারও ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি হৃদয়ের বাড়ির কাছেই জপমালা রানির গির্জা দেখতে। এলাকাটির নাম হাসাবাদ। পবিত্র জপমালা রানির গির্জাটি নির্মাণ হয়েছিল ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে। গির্জাটি হলুদ বর্ণের সুন্দর কারুকাজে ভরা। গির্জাটির ছাদে রয়েছে বিশাল একটি ঘণ্টা। প্রার্থনা কক্ষ, সমাধিস্থল, চূড়া ও জপমালা দেবীর নামাঙ্কিত ফলকসহ অনেক কিছু দেখে মন ভরে গেল।
বান্দুরা বাজার দিয়ে বয়ে চলেছে ইছামতী নদী। আমরা নৌকা ভাড়া করলাম। ইছামতীর নদীর জোয়ারের পানিতে ঢেউ কেটে এগিয়ে চলছে নৌকা। শীতের শেষ সময়ের মৃদু বাতাসে আমরা কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলাম। নৌকায় বসে নদীর দুই ধার দেখতে দেখতে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। এখানকার মিষ্টি নামকরা। পুরাতন বান্দুরা বাসস্ট্যান্ড চলে এলাম শান্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। পেট ভরে রসগোল্লা খেয়ে পথ ধরলাম ঢাকার উদ্দেশে।
কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে নবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটার। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে এসি ও নন-এসি বাস কিছুক্ষণ পরপর নবাবগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নন-এসি ‘নবকলি’ বাস ভাড়া জনপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকা। নবাবগঞ্জ-ঢাকা রুটে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ‘দোহার-নবাবগঞ্জ এক্সপ্রেস’ নামে নতুন এসি বাস চালু হয়েছে। যা বান্দুরা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করে। আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস ভাড়া ১৪০ টাকা। নবাবগঞ্জ অথবা বান্দুরা নেমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে এই এলাকার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখা যাবে। এ ছাড়া মাইক্রোবাস ও সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সারা দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন। নবাবগঞ্জ দিনে এসে দিনেই ফেরা যায়। ইছামতী নদীর সৌন্দর্য দেখতে নৌকা ঘণ্টা চুক্তিতে ভাড়া করে ঘুরে দেখা যায়।
থাকা ও খাওয়া: প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় থাকা বা খাওয়ার জন্য তেমন কোনো ভালো মানের হোটেল/ মোটেল এখানে নাই। নবাবগঞ্জ উপজেলা ও তার আশপাশে রাত্রি যাপনের জন্য মাঝারি মানের নামমাত্র স্থানীয় আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে। বিশেষ করে কোনো রিসোর্ট নেই। পর্যটকদের সাধারণত স্থানীয় হোটেলগুলোই ভরসা। সরকারি ডাকবাংলো, সার্কিট হাউস, শামীম গেস্ট হাউস ও কলাকোপা গেস্ট হাউসে রাত্রি যাপন করা যায়। খাওয়ার জন্য হাজি বিরিয়ানি, কাচ্চি ডাইন, আল মদিনা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, হলিডে মিনি চাইনিজ, আশা হোটেল, শহীদ বিরিয়ানি, রাজভিউ চায়নিজ রেস্টুরেন্টসহ স্থানীয় কিছু খাবার হোটেল রয়েছে।
এ ছাড়া এখানকার মিষ্টি খুব নামকরা। সহদেব ঘোষের ১৩০ বছরের ‘শান্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। এখানে পাওয়া যায় খাঁটি দুধের তৈরি রসগোল্লা, মালাইচপ, জলসিরা, চমচম, রসমালাই ও দই। চাইলে পেট ভরে খেয়ে বাড়ির জন্য নিয়ে আসতে পারেন।
সতর্কতা: নবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গেলে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। অনেক জমিদারবাড়ি ও প্রাচীন স্থাপনার অংশ ভগ্নপ্রায় হওয়ায় সেখানে ওঠানামা বা দৌড়ঝাঁপ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সাবধানে চলাফেরা করা উচিত। নদীতে নৌ ভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি না নেওয়াই নিরাপদ। গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সব সময় নাও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পানি ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখা ভালো। এ ছাড়া পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলা এবং স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানো ভ্রমণকে আরও সুন্দর ও দায়িত্বশীল করে তুলবে।



