প্রাচীন জনপদের শহর সিলেট। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত পাহাড়ি, সমতল ও হাওর ঘেরা একটি অঞ্চল। বাংলাদেশের বিশাল অংশ যখন সাগরের গর্ভে বিলীন, সিলেট তখনও ছিল সভ্য সমাজ। সিলেটের ভাটি এলাকা এক সময় ছিল সমুদ্র। কিন্তু উঁচু ও পার্বত্য এলাকায় ছিল জনবসতি। ইতিহাসের প্রাচীন যুগ থেকে সিলেটে জনবসতি শুরুর হদিস পাওয়া যায়। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের অবলম্বন প্রায় সর্বত্রই পৌরাণিক গ্রন্থাদি, কিংবদন্তি, তন্ত্রমন্ত্র শিলালিপি প্রভৃতি। এসব উৎস হতে দেখা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার অব্দেও সিলেটে উন্নত সমাজ বর্তমান ছিল। প্রাচীন এই শহরে এখনো বিদ্যমান আছে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর সিলেটকে আজও বলা যায় ঐতিহ্যের শহর। তার সঙ্গে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে জুড়ায় চোখ। মনে আসে প্রশান্তি।
ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিশেলে সিলেট হয়ে উঠেছে পর্যটননগরী। সিলেটের ঐতিহ্যের কথা বললে যে নামটি সর্বপ্রথম আসে তা হলো হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.)-এর মাজার। ক্রমান্বয়ে সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে আরও অনেক গুণীজন ও স্থাপনা। সিলেটের ঐতিহ্যে জড়িয়ে আছে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের বাড়ি, কিনব্রিজ, আলী আমজদের ঘড়ি, মনিপুরী রাজবাড়ী, সিলেটী নাগরী লিপি, শাহী ঈদগাহ ও জিতু মিয়ার বাড়ি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসবে চা-বাগানের নাম। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে সবুজ টিলা, জল-পাথরের জাফলং, সাদা পাথর, রাংপানি, বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লালাখাল। এ ছাড়া রাতারগুল জলাবন, শাপলা বিলের সমন্বয়ে সারা বছরই নৈসর্গিক সৌন্দর্য বিরাজ করে সিলেটে।
চা-বাগান
‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ’ হিসেবে পরিচিত সিলেট এবং চা-বাগানের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। উপমহাদেশে প্রথম চা-চাষ হয় সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে। তাই সিলেটকে বাংলাদেশের ‘চায়ের রাজধানী’ বলা হয়। দিগন্তজোড়া সবুজ বাগানগুলো যেকোনো ঋতুতে প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। শীতের ভোরে সবুজ চা-বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তায় যখন শান্ত ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ে, হিমেল হাওয়ায় গাছের ফাঁকে ফাঁকে নেমে আসা সূর্যের কোমল রশ্মি চারপাশে স্বর্গীয় আবেশ তৈরি করে। গ্রীষ্মের বিকেলে শীতল সবুজ চা-বাগান মনকে শান্ত করে। সিলেট নগরীর আশপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি চা-বাগান। তাই পর্যটকরা যেকোনো সময় চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
জল-পাথরের অপরূপ দৃশ্যপট
সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি বড় অংশে মিশে আছে জল আর পাথর। সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং, শ্রীপুর লেক, রাংপানি, বিছানাকান্দি, পান্থুমাই। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় আছে সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্র, উৎমাছড়া, তুরুংছড়া। এসব স্পটে চলে জল-পাথরের খেলা। এই পর্যটন স্পটগুলোর আরেকটি আর্কষণ হলো ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে সবুজ পাহাড়ের বেষ্টনী। পাথর আর জল খেলার উৎপত্তি ভারতে হলেও এর সৌন্দর্য ভোগ করছে সিলেট। নানা রঙের পাথরের স্তূপ, সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলতরঙ্গ আর আকাশে মেঘের খেলা দেখে মুগ্ধ হবেন যে কেউ। সারা বছরই প্রকৃতির বিছানো পাথরে হাঁটাহাঁটি, পানিতে সাঁতার কাটতে এসব স্থানে এসে আনন্দ-উল্লাস করেন পর্যটকরা।
শাপলা বিল
সিলেটে পর্যটকপ্রিয় একটি স্থান সিলেটের লাল শাপলা বিল। শাপলা বিল মূলত ডিবির হাওর নামে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের অবস্থান সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায়। শীতের শুরুতেই ফুটতে শুরু করে ডিবির হাওরের লাল শাপলা। বিলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছোট নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। বছর দশেক ধরে এই লাল শাপলা বিল ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে পরিচিতি পায়। এখন সিলেটের পর্যটনের একটি অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে লাল শাপলা বিল।
রঙিন জলের রাতারগুল
ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাদুপানির জলাবন তিনটি। এর মধ্যে একটি শ্রীলংকায় আর বাকি দুটি বাংলাদেশে। দেশের দুটি জলাবনই সিলেট বিভাগে পড়েছে। এই দুটির একটি জলাবনের অবস্থান সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ‘রাতারগুল জলাবন’। আরেকটি জলাবনের অবস্থান হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ‘লক্ষ্মীবাউর জলাবন’। স্বচ্ছ জলের ওপর সবুজ গাছ আর নীল আকাশের ছাপ। রঙিন এই জলের বুক চিড়ে ভাসে নৌকা। চারপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে হিজল, করচ, বরুণগাছ। রয়েছে মূর্তা, জালিবেতসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। নৌকা যত বনের ভেতরে প্রবেশ করবে ততই মুগ্ধ হবেন। গাছের সৌন্দর্যের সঙ্গে যোগ হবে পাখির কিচিরমিচির। শুধু শব্দ নয়, দেখতে পারবেন হিজলগাছের ডালে বসে শামুকখোল পাখির খেলা। বলা যায় এখানে প্রবেশ মানে আপনার চোখ, কান থেকে শুরু করে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রশান্তির ছোঁয়া পাবে। সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মিঠা পানির জলাবন রাতারগুল। উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা গোয়াইন নদী, দক্ষিণে বিশাল হাওর, মাঝখানে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ভরপুর জলাবন রাতারগুল। সিলেটের স্থানীয় ভাষায় পাটি গাছ ‘রাতা গাছ’ নামে পরিচিত। এর নামানুসারে বনটির নাম রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট।
হযরত শাহজালাল (র.) মাজার
ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (র.) ছিলেন উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত দরবেশ ও পীর। সিলেট অঞ্চলে তার মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটে। ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিলেটে আগমন করেন। সিলেটের প্রথম মুসলমান শেখ বোরহান উদ্দিনের (র.) ওপর রাজা গৌড়গোবিন্দের অত্যাচার এবং এর প্রেক্ষিতে হযরত শাহজালাল (র.) ও তার সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার সিলেট আগমন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ কারণে সিলেটকে ৩৬০ আউলিয়ার দেশও বলা হয়। আরব দেশের মাটি ও সিলেটের মাটির মিল কথিত আছে। প্রাচ্যদেশে আসার আগে শাহজালাল (র.)-এর মামা মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবীর (র.) তাকে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্বাদে বর্ণে গন্ধে এই মাটির মতো মাটি যেখানে পাবে সেখানে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করবে।’ হযরত শাহজালাল (র.) অন্যতম শিষ্য শেখ আলীকে এই মাটির দায়িত্বে নিয়োগ করেন এবং নির্দেশ দেন যে, যাত্রাপথে বিভিন্ন জনপদের মাটির সঙ্গে যেন এই জনপদের মাটির তুলনা করে তিনি দেখেন। পরে এই শিষ্যের উপাধি হয় চাষণী পীর। সিলেট শহরের গোয়াইপাড়ায় তার মাজার বিদ্যমান। সিলেটের মাটির সঙ্গে আরবের মাটির মিল পাওয়ায় হযরত শাহজালাল (র.) সিলেটে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। সিলেটে তেল ও গ্যাস পাওয়ায় আরবের মাটি ও সিলেটের মাটির মিল প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করে ইতিহাসবিদরা। তিনি ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে ৬৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। এ জন্যই হযরত শাহজালালকে (র.) বলা হতো মজররদ।
কিনব্রিজ
সিলেটের প্রবেশদ্বার কিনব্রিজ। সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থলে এই কিনব্রিজ এলাকা। সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জানান দেয় সুরমা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্রিজ। ১৯৩৩ সালে নির্মিত হয় কিনব্রিজ। এটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৯৩৬ সালে। ভারতের আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামেই কিনব্রিজ হিসেবে নামকরণ করা হয়। লোহা দিয়ে তৈরি কিনব্রিজের আকৃতি অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকানো। এর দৈর্ঘ্য ১,১৫০ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। প্রায় আট দশক ধরে সচল সেতুটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে সংস্কারকাজ শেষে আবারও সচল হয় সেতুটি। নব্বই দশকের পর সিলেটে সুরমা নদীর ওপর আরও চারটি সেতু নির্মাণ করা হয়। ব্রিজটি দেখার জন্য এবং এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য সিলেটে আগত পর্যটক ভিড় জমান।






