বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে অন্তত তিনবার সেফ এক্সিটের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ‘সেফ এক্সিটের’ কথা ভাবছেন - এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের এমন মন্তব্য প্রচারের সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রাজনীতির মাঠে এখনো এই প্রসঙ্গে আলোচনা যেন থামছেই না।
সেই সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লিঁয়াজো রেখেছে এবং তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথাও ভাবছে।’
এ নিয়ে সাংবাদিকরাও নিয়মিতভাবেই সংবাদ সম্মেলন কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করছেন উপদেষ্টাদের। তাদের দিক থেকেও আসছে নানা ধরনের জবাব। কিন্তু এতসব আলোচনার ভিড়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, এই সেফ এক্সিট বিষয়টা কী? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রসঙ্গ কীভাবে এলো?
‘কোথায় সেফ এক্সিট নেবে? পৃথিবীতে সেফ এক্সিট নেওয়ার একটাই জায়গা, সেটা হলো মৃত্যু’ - এই মন্তব্য করেন এনসিপির আরেক নেতা সারজিস আলম। নাহিদের বক্তব্যের পরই গত সপ্তাহে তার এই মন্তব্য আসে।
এমনকি গত শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক সমাবেশে গিয়ে বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সেফ এক্সিটের ব্যাপারে কী বলবো ভাই? প্রত্যেকটা উপদেষ্টাই বিদেশি নাগরিক’।
‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে নাহিদ ইসলামের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন উপদেষ্টাদেরও অনেকে।
সেফ এক্সিট কী?
সাধারণভাবে সেফ এক্সিট বলতে কোনো স্থান থেকে নিরাপদে প্রস্থান বা চলে যাওয়াকে বোঝায়। তবে রাজনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টা আরেকটু জটিল। রাজনীতিতে সেফ এক্সিট বলতে জটিল কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বোঝায় যখন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জবাবদিহিতার বাইরে রেখে নিরাপদে প্রস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
সেফ এক্সিট কথাটা এভাবে আলোচনায় প্রথমবারের মতো এলেও ১৯৭৫ সাল, ২০০৯ সাল এবং ২০২৪ সালে – রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে অন্তত তিনবার বাংলাদেশে সেফ এক্সিটের ঘটনা ঘটেছে।
১৯৭৫ সালে
বিশ্লেষকদের মতে, সেফ এক্সিটের প্রথম ঘটনাটি বাংলাদেশে ঘটে ১৯৭৫ সালে। পরিবারের ১৮ জন সদস্যসহ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের রক্ষার জন্য ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক হিসেবে ও বিদেশি মিশনের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মূলত অপরাধ করার পরও বিচারের আওতায় না এনে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রথম উদাহরণ এটিই। ঘটনার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা এলে প্রথমবারের মতো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
এক-এগারোর সরকার
'এক্সিট' শব্দটি প্রথম আলাপে এসেছিল ২০০৭ সালে দায়িত্ব নেওয়া এক এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সময় আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় রাজনীতিবিদদের অনেককে। তবে শেষ অব্দি পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া শুরু করে তৎকালীন সরকার। সব হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ক্ষমতা ছাড়ার আগ দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে পড়েন সরকারের শীর্ষ পদধারীরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘এক-এগারো’ বইতে লিখেছেন, এ সময় ক্ষমতা ছেড়ে কীভাবে তারা নিরাপদে বেরিয়ে যাবে তার ‘এক্সিট প্ল্যান’ নিয়ে আলোচনায় বসে দুই শীর্ষ দলের সাথে। ‘এক-এগারোর কুশীলবরা একটা সেফ এক্সিটের জন্য ধর্না দিয়েছিল শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার কাছে। খালেদা জিয়া দেন নাই, সেটা হাসিনা দিয়েছেন’, বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
তিনি জানান, সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যদের নিয়ে ২০০৮ সালের অক্টোবরে এক বৈঠক হয়। সেখানে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, গওহর রিজভীসহ আওয়ামী লীগের আরও অনেকে সেখানে ছিলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে মঈন উ আহমেদ নিউইয়র্কে অবস্থান করায় টেলিফোনে যুক্ত হন, ‘সেখানে এক্সিটের প্ল্যান চূড়ান্ত হয়’। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে দেশত্যাগ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ।
৫ আগস্ট, ২০২৪
সেফ এক্সিটের শেষ ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সেদিন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়েন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশদাতা হওয়া সত্ত্বেও তাকে দেশ থেকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। ‘তিনি তো প্রাণে বাঁচলেন, সেই সেন্সে সেফ এক্সিট। কারণ তিনি তো খুব গোপনে পালান নাই। আমাদের এখানে সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আমাদের সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে করে তাকে ভারতে রেখে আসা হয়েছে’, বলেন মহিউদ্দিন আহমদ।
এ ছাড়াও টালমাটাল পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। সেই যাওয়াকেও কি সেফ এক্সিট বলা যায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ জানান, আর কখনো রাজনীতিতে ফিরবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে তার দেশ ছাড়ার ব্যাপারে সমঝোতা করা হয়েছিল। তার মা খালেদা জিয়াও এই বিষয়ে জানতেন। নিজের নিরাপত্তা নিলেও ‘ওই অর্থে এটাকে ঠিক সেফ এক্সিট বলা যাবে না’, বলেন তিনি।
অমিয়/