যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইলন মাস্কের বিরোধ এখন প্রকাশ্য। অথচ কয়েকদিন আগেও তাদের 'বন্ধুত্ব' ছিল সবার আলোচনার বিষয়। এবার তাদের মধ্যকার দূরত্বের গুঞ্জন মুহূর্তেই 'বাগযুদ্ধ' হিসেবে সবার সামনে আবির্ভূত হলো।
সরকারি একটি বিলকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া শুরু হয়েছে ইলন মাস্কের। প্রেসিডেন্টকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে উল্লেখ করে মার্কিন এই ধনকুবের দাবি করেন, তিনি যদি আর্থিক সহায়তা না দিতেন— তাহলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যেতেন ট্রাম্প।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় মাস্ক বলেন, ‘আমি না থাকলে ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে যেতেন, রিপ্রেজেন্টেটিভের (মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ) নিয়ন্ত্রণ থাকত ডেমোক্র্যাটদের দখলে আর সিনেটে (কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ) রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাটদের অনুপাত থাকত ৫১-৪৯।’
এরইমধ্যে, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ভর করে ইলন মাস্কের যেসব ব্যবসা চলছে সেগুলো নিয়ে তাকে হুমকিও দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব ব্যবসাকে মাস্কের স্পেসএক্স কর্মসূচির প্রাণ বলা চলে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেন, ‘আমাদের বাজেটে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয়ের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ইলনের সরকারি ভর্তুকি এবং চুক্তি বাতিল করা। ’
আর ট্রাম্প যদি সত্যিই তার সরকারকে মাস্কের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন, তাহলে এই টেক বিলিয়নেয়ারের চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (০৫ জুন) বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, এদিন ওভাল অফিসে জার্মান নেতার সাথে দেখা করার সময়, ট্রাম্প মাস্কের প্রতি তার হতাশার কথা খোলামেলাভাবে বলেন।
এর জবাবে,মাস্ক এক্স-এর পোস্ট করে, ট্রাম্পকে একের পর এক আক্রমণ শুরু করেন, যেখানে তিনি প্রমাণ ছাড়াই ইঙ্গিত দেন যে প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের সাথে সম্পর্কিত অপ্রকাশিত ফাইলগুলিতে ট্রাম্পের কারসাজি রয়েছে।
এরপর ট্রাম্প বেশ কয়েকবার পাল্টা আক্রমণ করে বলেন যে, মাস্ক ‘ পাগল ’ হয়ে গেছেন এবং এরপর তাকে ট্রাম্প প্রশাসন ছেড়ে দিতে বলা হয়। এছাড়া তিনি মাস্কের কোম্পানিগুলোর সাথে সরকারি চুক্তি বাতিল করার হুমকিও দেন ।
এদিকে এই লড়াইয়ের মধ্যে, টেসলার শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে ১৪% কমে গেছে, যা মাস্কের ইভি জায়ান্টকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমার নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওইয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠতার শুরু । সে সময় রিপাবলিকান পার্টির ট্রাম্পের বিভিন্ন প্রচারণা সভায় মাস্ককে নিয়মিত দেখা গেছে।
এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায় , ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা তহবিলে কমপক্ষে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার চাঁদা দিয়েছেন মাস্ক।
নির্বাচনে জয়ী হয়ে শপথ নেওয়ার পর সরকারি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় সংকোচন করতে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি বা ডোজ নামের একটি দপ্তর খোলে ট্রাম্প প্রশাসন। সেই দপ্তরের প্রধান করা হয় মাস্ককে।
মাস্ক ডোজর প্রধান নির্বাহী হওয়ার পর কয়েক মাস ধরে সরকারি অর্থ অপচয় রোধের নামে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও বিভাগের হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়, স্থগিত করা হয় প্রায় সব ধরনের বৈদেশি সহায়তা প্রদান।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাতেও সরকারি ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তা কমতে থাকে ট্রাম্পের। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একাধিক আদালতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন চাকরিচ্যুত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ সহায়তা প্রদান স্থগিত করায় দেশের ভেতরেও সমালোচনায় বিদ্ধ হতে থাকে ট্রাম্প প্রশাসন।
মাস্কের নিয়োগ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের এমপিদের একাংশ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীদের একাংশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। কংগ্রেস এখনও ডোজকে সরকারি বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল মাস্কের। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি বিল স্বাক্ষরকে ঘিরে নতুন তিক্ততার সৃষ্টি হয় ট্রাম্প ও মাস্কের মধ্যে।
গত মাসে কর হ্রাস সংক্রান্ত ‘জনকল্যাণমূলক’ বিলে অনুমোদন দেওয়ার পরে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি বড় এবং সুন্দর বিল’ (ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট)। তার পরেই ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে।
মাস্ক দাবি করেন, তিনি এবং তার সহকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরে থেকে এত দিন ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয়’ কমাতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেসব ব্যর্থ হয়ে যাবে ওই একটি বিলের কারণে। বিলটি তাকে দেখানোর আগেই ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসে পাশ করানোর জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন বলেও সমাজমাধ্যমে অভিযোগ করেন মাস্ক।
সুলতানা দিনা/