একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা এবং দেশটির তেলখাতসহ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনায় সমগ্র বিশ্ব।
ভুক্তভোগী দেশ ভেনেজুয়েলার সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অভিযোগ করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে আগ্রাসী নীতি অনুসরণ করছেন।
গত বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাইছি না।’
এ প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার এই নীতিগুলোকে কেবল তার ‘own morality বা নিজস্ব নৈতিকতা’ই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এভাবেই তিনি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা উচিত কি না—তখন ট্রাম্প বলেন, তিনি তা করেন, তবে এটি ‘আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা কী তার ওপর নির্ভর করে।’ ট্রাম্প তার বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘brute force’ বা ‘পাশবিক শক্তি’ ব্যবহার করার ইচ্ছা প্রদর্শন করেছেন।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন অ্যাবস্যালুট ডিজল্ভ’ পোড়ীচালোণা কোড়ে। এদিন রাজধানী কারাকাস এবং ভেনেজুয়েলার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
এদিন শেষ রাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ডেল্টা ফোর্স।
এ অভিযানে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য প্রায় ৪০ জন নিহত হন ।
প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস, মাদক পাচার ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ এনেছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এসব অভিযোগের বিচার হবে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদুরো।
সমালোচকেরা বলছেন, এটি জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা ‘যেকোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি’ নিষিদ্ধ করে।
ভেনেজুয়েলায় এই হামলা মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, হামলার পরপরই ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল-খাত ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং তেল বিক্রয় করা অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে তাও তারাই ঠিক করবে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানায়, তারা বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার তেল ‘বিপণন শুরু করেছে’। এই বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ প্রাথমিকভাবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ব্যাংকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
এছাড়া, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে যে, তারা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগুয়েজের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে নীতি ‘নির্দেশ’ দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অমান্য করা হলে ‘দ্বিতীয় দফার’ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত রবিবার দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প রদ্রিগেজ সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি যদি সঠিক কাজটি না করেন, তবে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ওপর হামলা চালানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন এবং ডেনমার্কের অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচারণাও জোরদার করেছেন।
এর আগে গত জুন মাসে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিনা উস্কানিতে শুরু হওয়া যুদ্ধে যোগ দেন এবং দেশটির তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি এই অবজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন হলো এমন কিছু নিয়ম ও রীতির সমষ্টি যা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক পরিচালনা করে। এর মধ্যে জাতিসংঘের কনভেনশন এবং বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলো অন্তর্ভুক্ত।
সুলতানা দিনা/