ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার ঘটনাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। মাদুরোকে সহজে আটক করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজসম্পদের ওপর প্রভাব বাড়াতে পারেনি, একই সঙ্গে কিউবার জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি করেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে থাকা কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে তার যৌথ সামরিক অভিযানও একইভাবে সফল হবে। ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও ট্রাম্পের বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হবেন।
জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এই ধাক্কা সামাল দিতে পারবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে এবং নিরাপত্তা ও শান্তির তুলনায় সাময়িক উচ্চমূল্য খুবই ছোট বিষয়।
ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসের আরেকটি কারণ হলো, তার কিছু বিতর্কিত নীতির পরও অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা যায়নি। শুল্ক বৃদ্ধি, সরকারি কর্মী ছাঁটাই, অভিবাসী শ্রমিকদের বহিষ্কার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পরও কয়েক সপ্তাহ আগেও অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারে।
জ্বালানিতে সুবিধাজনক অবস্থান
জ্বালানির দাম বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটিতে তেল উৎপাদন বেড়েছে, ফলে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস এখন জ্বালানি সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছে, যার দাম বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামায় তুলনামূলক কম প্রভাবিত হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে তেল থেকে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় এই হার ছিল আরও বেশি। তখন ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করায় এবং কাতার এলএনজি স্থাপনা বন্ধ করায় ইউরোপীয় বাজারে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এখনো রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি রয়েছে।
জনমতের চাপ বাড়ছে
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু থেকেই দেশটিতে খুব একটা জনপ্রিয় নয়। অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে এই বিরোধিতা আরও তীব্র হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানিতে অনেকটা স্বনির্ভর, তবু বৈশ্বিক বাজারের কারণে তেলের দাম দেশটির অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ৫০ ডলারের বেশি, যা ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সর্বোচ্চ।
সরকারি পূর্বাভাস বলছে, পেট্রলের দাম ২০২৫ সালের স্তরে ফিরতে ২০২৭ সালের শরৎ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ডিজেলের দামও অন্তত আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগের তুলনায় বেশি থাকতে পারে।
এতে পরিবহন খরচ বাড়বে এবং ট্রাকিং কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত সেই খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপাবে। কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, ফলে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খুচরা ব্যবসা ও বিমান পরিবহন খাতও উচ্চ জ্বালানি মূল্যের চাপে পড়বে।
এর প্রভাব মুদ্রাস্ফীতিতেও পড়তে পারে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ২ দশমিক ৪ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে তা আবার বাড়তে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলবে। একই সঙ্গে জ্বালানির উচ্চমূল্য আমেরিকানদের জনপ্রিয় এসইউভি গাড়ির বিক্রিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে কঠিন পথ
পরিস্থিতির ঝুঁকি ট্রাম্প প্রশাসনও বুঝতে পারছে। তাই তেলের দাম কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তেলবাহী জাহাজকে বিমা সুবিধা দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা। পাশাপাশি রাশিয়ার কিছু তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত তিন দশকের মধ্যে তেলের দামের এই বড় উল্লম্ফন সামাল দেওয়া সহজ হবে না। এর জন্য হয় যুদ্ধ শেষ করতে হবে, নয়তো ইরানের এমন সামরিক সক্ষমতা নষ্ট করতে হবে, যাতে তারা আর হরমুজ প্রণালিতে হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে। ট্রাম্প একদিকে ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন, আবার অন্যদিকে বলছেন যুদ্ধ প্রায় শেষ। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করলেই দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ জেতা যায় না।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড ও বাসিজ বাহিনীর মতো শক্তিগুলো সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে এখনো বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছেন, যারা লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। এ অবস্থায় ট্রাম্প চাইলে বিজয়ের দাবি করে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারেন, কিন্তু তাতে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে স্থল বাহিনী মোতায়েন বা দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানোর মতো পথও খোলা রয়েছে, যার কোনোটিই দ্রুত সমাধান নয়।
ফলে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।