জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর যারা গুলি চালিয়েছে, তাদের বিচারে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন শহিদ ও আহতদের অভিভাবকরা। বিচারের প্রত্যাশায় এক উপদেষ্টা থেকে আরেক উপদেষ্টার কাছে ধরনা ধরতে ধরতে অনেকেই হতাশ।
অভিভাবকরা বলছেন, তাদের সন্তানদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় বসলেও উপদেষ্টারা ভুলে গেছেন শহিদ ও আহতদের অবদানের কথা। তা না হলে সবার আগেই দোষীদের বিচারে গুরুত্ব দিতেন। তারপর ভাবতেন সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু বিচারে বিলম্ব করে ভাবা হচ্ছে সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে।
সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচারের আগে কোনো নির্বাচন হতে দেবেন না শহিদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। না হলে তারা কিছুদিনের মধ্যে রাজপথে নামবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ প্রদানের’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শহিদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা এসব কথা বলেন। সন্তান ও অভিভাবক ফোরাম (এসওএফ) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) ও কোয়ালিটি লাইফ ফাউন্ডেশন (কিউএলএফ)।
গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকেই পঙ্গুত্বের শিকার বা চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে একদিকে যেমন মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যাদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে আহত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বাছাই করা ১০০ জনকে স্কলারশিপ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে এসওএফ, বিপিএ ও কিউএলএফ। মাসে প্রতি শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঁচ হাজার টাকা করে দাতা অভিভাবকরা দিয়ে যাবেন ।
২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানসংক্রান্ত বিশেষ সেলের তথ্য অনুযায়ী ৮৫৮ জন শহিদের নাম তালিকাভুক্ত হয়। এরপর চিকিৎসাধীন আরও একজন শহিদ হন। এ ছাড়া ১১ হাজার ৫৫১ জন আহতের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে শহিদ ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘যারা এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, আমি বলব তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিতে গেলে দেখা যাবে আরেক ফ্যাসিস্টদের আবির্ভাব হয়ে যাবে। আমরা প্রথমেই চাইব বিচার। এরপর সংস্কার, তারপর নির্বাচন। যদি বিচার ও সংস্কারের আগে কোনো নির্বাচন হয়, তাহলে আমরা রুখে দাঁড়াব। রাজপথ ছাড়ব না।’
শহিদ আননাফের মা বলেন, ‘আমি আইন উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিন মাস পর ওবায়দুল কাদের কীভাবে পালিয়ে যান? জবাবে তিনি বলেছেন, এটা তার বিষয় নয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বিষয়। তার কাছে যেতে। আমাকে বলেন, আপনি বেশি কথা বলেন।’
আননাফের মা আরও বলেন, ‘এখনো বোঝা যাচ্ছে না আমরা কী করব, কার কাছে যাব। কার কাছে গেলে আমরা সুষ্ঠু বিচার পাব। আমাদের আবার রাজপথে নামতে হবে। রাজপথ ছাড়া উপায় নেই। সবাইকে আবারও গর্জে ওঠার অনুরোধ করছি। আমরা যদি গর্জে না উঠি, কিছু হবে না এই দেশে।’
‘সব পা-চাটার দল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যখনই দেখবেন তারা গদি পেয়ে গেছেন, তখনই ভুলে যাবেন পেছনে কী হয়েছিল। যাদের এক ডাকে আপনারা রাস্তায় বের হয়েছিলেন, তারা কি আপনাদের দেখছে? এ সময় অনেকে বলে ওঠেন ‘না’। আমার তো মনে হয় না। এই পর্যন্ত কি নাহিদ-আসিফ ওনারা আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন? তখনো অনেকে বলে ওঠেন ‘না’।”
চার আগস্ট মিরপুর ১০ নম্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন শাহরিয়ার হাসান আলভি। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলভি ছিল আবুল হাসানের একমাত্র সন্তান। বাবা আবুল হাসান বলেন, ‘আমার যে সন্তানরা আজ আহত, যে সন্তানরা শাহদতবরণ করল, তাদের জন্য এই সরকার। তারা আমাদের জন্য কী করল? ছয়টি মাস হয়ে গেল। আমি একজন শহিদের বাবা। আমার নিরাপত্তার জন্য আমাকে ট্রাইব্যুনালে যোগাযোগ করতে হয়।
আমাকে গিয়ে ধরনা ধরতে হয়। ট্রাইব্যুনালকে গিয়ে বলতে হয়, আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। আমরা কোথায় আছি একটু চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারি।’
তিনি জানান, ১৯ আগস্ট মামলার করার পর ২৪ আগস্ট তার বাসায় অতর্কিত হামলা হয়। তিনি পুলিশের কাছে সহযোগিতা চেয়েও পাননি। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের জনবলসংকট। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘তাহলে আমরা কোনো রাষ্ট্রে বসবাস করি। আমি কি সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তা পেতে পারি না?’
উপদেষ্টাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা যদি জীবন না দিত, আপনারা উপদেষ্টা হতেন কীভাবে? আপনারা তো সেই বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। আপনাদের তো খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই আমাদের ক্ষেত্রে কেন এত অবহেলা। যারা আমাদের সন্তানকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে, অন্তত আমাদের জীবদ্দশায় হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই।’