শিল্পমন্ত্রী আবুল মুক্তাদির ঈদুল আজহার আগে জোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এবার কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মন্ত্রীর সেই আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়নি। কোরবানির মাঠের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো এবং হতাশাজনক।
বিগত বছরের তুলনায় এবার পশুর চামড়া আরও কম দামে বিক্রি হয়েছে। ন্যায্য মূল্য পাওয়া তো দূরের কথা, বহু মানুষের চামড়া পরিবহনের ন্যূনতম খরচও ওঠেনি। ক্রেতা না পেয়ে অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। আবার অনেকে বাধ্য হয়ে চামড়া মাটিচাপা দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক যুগ ধরে কোরবানির চামড়ার বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট কৌশলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেট সরকারের বেঁধে দেওয়া দামকে তোয়াক্কা করে না। তারা অনেক কম দামে চামড়া কেনে। ফলে প্রতিবছর প্রচুর চামড়া নষ্ট হয়। মূলত সঠিক সংরক্ষণের অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে তার মতামত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা নিয়ে চরম নৈরাজ্য তৈরি হয়। সরকারকে দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। সরকার বিভাগীয় শহরগুলোতে বিসিকের শিল্প প্লট ব্যবহার করতে পারে। সেখানে চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারা চামড়া কেনার পর সেখানে তা সংরক্ষণ করবেন। পরবর্তী সময় ভালো দাম পাওয়া গেলে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কাছে তা বিক্রি করা যাবে। এতে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। একই সঙ্গে কম দামে দ্রুত চামড়া বিক্রি করার তাড়াও থাকবে না।
চামড়ার বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে শিল্প মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই প্রতিবেদনেও সরকারি উদ্যোগে চামড়া সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি কারখানাগুলোর অব্যবহৃত জায়গায় সংরক্ষণ কেন্দ্র করা সম্ভব। এসব কেন্দ্রে আশপাশের এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে সহজেই সংরক্ষণ করা যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের পরেই চামড়া খাতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতের ওপর ভিত্তি করে দেশের লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্ভাবনাময় খাতের জন্য সরকারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেই। খোদ শিল্পমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, চামড়া খাতের উন্নয়নে সরকারের বর্তমানে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই। তবে তিনি জানিয়েছেন, অতি শিগগির একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
অথচ ঈদুল আজহার আগে শিল্পমন্ত্রী কয়েক দফায় গণমাধ্যমে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এবার চামড়া বাজারে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হবে। মাঠপর্যায়ে কোথাও যেন অনিয়ম না হয়, সে জন্য প্রশাসন কঠোর নজরদারি করবে। চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য বাজারে প্রচুর পরিমাণে লবণ সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি চামড়া সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী এমন সব বড় বড় উদ্যোগের কথা বললেও মাঠের বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। খবরের কাগজের ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদকদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কোথাও কোরবানির চামড়ার ন্যায্য দাম মেলেনি।
ঈদের দিন বিকেলে বরিশাল নগরের পদ্মাবতী ও পেঁয়াজপট্টি এলাকার চামড়ার পাইকারি আড়তগুলোতে গিয়ে চরম মন্দা দেখা যায়। সেখানে গরুর চামড়া অত্যন্ত কম দামে কেনাবেচা হচ্ছিল। তবে ছাগল ও বকরির চামড়ার দিকে ব্যবসায়ীরা ফিরেও তাকাচ্ছিলেন না। রিকশা, ভ্যান ও ট্রাকে করে চামড়া নিয়ে আসা কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়েন। আড়তদাররা অনেক ক্ষেত্রে তাদের চামড়া ফেরত নিয়ে যেতে বলেন। উপায় না পেয়ে চামড়া সংগ্রহকারীরা আড়তের সামনেই চামড়া ফেলে রেখে চলে যান।
বরিশাল নগরের কাউনিয়া বিসিক সড়ক এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম রিপন নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আগে অন্তত ১০ থেকে ২০ টাকায় হলেও ছাগলের চামড়া বিক্রি করা যেত। কিন্তু এ বছর চামড়া নিয়ে আড়তে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি। শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত চামড়া দোকানের সামনেই ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছি।
চামড়া ফেলে দেওয়ার এই চিত্র দেখা গেছে বগুড়াতেও। বগুড়া সিটি করপোরেশন থেকে বাঘোপাড়া ডাম্পিং স্টেশনে নিয়োগ করা ট্রিপ গণনাকারী মো. মনিরুল ইসলাম তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ঈদের দিন রাত ২টা থেকে রবিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই ডাম্পিং স্টেশনে প্রচুর চামড়া ফেলা হয়েছে। ছাগল, ভেড়া ও গরুর চামড়া নিয়ে প্রায় ২০টি ট্রাক সেখানে আসে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৫০০টি করে চামড়া ছিল। মো. মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, এই ডাম্পিং স্টেশনের বাইরেও বেশ কিছু এলাকায় চামড়া মাটিতে চাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস তার লোকসানের কথা জানান। তিনি বলেন, ঈদের দিন নগরের চকবাজার এলাকা থেকে ৩৫০ টাকা দামে বড় আকারের গরুর চামড়া কিনেছিলাম। সেদিন বিকেল ৪টার দিকে চামড়াগুলো বিক্রির জন্য নগরের আতুরার ডিপোতে নিয়ে যাই। কিন্তু আড়তদাররা প্রতি পিস চামড়ার দাম মাত্র ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। ভেবেছিলাম এবার চামড়া বিক্রি করে ভালো লাভ পাব। কিন্তু এভাবে বড় অঙ্কের লোকসান দিতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।
জয়পুরহাটেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। সেখানকার ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে ৩০০ টাকায় চামড়া কিনে আড়তে মাত্র ১০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এই দামে চামড়া বিক্রি করে তাদের লাভ তো দূরের কথা, যাতায়াত ও গাড়ি ভাড়ার টাকাই ওঠেনি। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে আড়তদাররা চামড়া কিনছেন না। তারা সিন্ডিকেট করে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে চামড়া কিনছেন। জয়পুরহাটের বাজারে প্রতিটি গরুর চামড়া মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর ছাগলের চামড়া কেনার প্রতি ব্যবসায়ীদের কোনো আগ্রহই ছিল না।
জয়পুরহাট শহরের নতুনহাট এলাকার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং জামালগঞ্জ বাজারের মেহেদী হাসানসহ একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ী একই কথা বলেন। তারা জানান, কোরবানির চামড়ার বাজারে আকস্মিক এই দরপতন তাদের দিশেহারা করে ফেলেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলাজুড়ে এবার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এক নজিরবিহীন লঙ্কাকাণ্ড ঘটেছে। সরকারের নানামুখী আশ্বাস এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মাঠপর্যায়ে চামড়া বিক্রি হয়েছে একেবারে পানির দামে। অনেক জায়গায় চামড়া কেনার জন্য কোনো ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এতে চরম ক্ষোভ ও হতাশায় জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে।
জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের রামনগর মাদিনাতুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ক্রেতার অভাবে ১৫০টি চামড়া মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। মাদ্রাসার সুপার হাফেজ মাওলানা শহীদ উল্যাহ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান, বিপুল উৎসাহ নিয়ে তারা বাড়ি বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু দিনভর অপেক্ষা করেও কোনো পাইকারি ক্রেতার দেখা মেলেনি। কেউ চামড়া কিনতে রাজি হয়নি।
তিনি আরও জানান, শ্রমিক ও গাড়ি ভাড়া দিয়ে এই চামড়াগুলো সংগ্রহ করতে মাদ্রাসার কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। তীব্র গরমে একপর্যায়ে চামড়াগুলো পচতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার্থে গত শুক্রবার রাতে চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এর ফলে মাদ্রাসার এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের ফান্ডের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল। শুধু চন্দ্রগঞ্জেই নয়, লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম।
পবিত্র ঈদুল আজহার দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহের তোড়জোড় দেখা যায়। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার অর্থের জোগান দিতে লোকজন গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। মাধবদী, পাঁচদোনা, ভেলানগর ও ইটাখোলা মোড়ে এসব চামড়া এনে জড়ো করা হয়।
মাধবদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দামের চরম বিপর্যয়। সেখানে খাসির চামড়া মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর গরুর একটি চামড়া সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে এক মাদ্রাসার হুজুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সময়ে একটি গরুর চামড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হতো। কিন্তু আজ সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে চামড়াগুলো একেবারে পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এর ফলে মাদ্রাসার গরিব ও এতিম ছাত্রদের হক চরমভাবে নষ্ট হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের চামড়া ক্রেতা কবির হোসেন ও আকবর আলী নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, তারা খাসির চামড়া ২০ টাকায়, গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় এবং মহিষের চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে কিনছেন।
তারা আরও বলেন, এসব চামড়া সংগ্রহ করে ঢাকায় নেওয়ার পর ট্যানারি মালিকরা আরও কম দাম নির্ধারণ করেন। ট্যানারি মালিকদের এমন খামখেয়ালিপনা ও আচরণের কারণে মাঠপর্যায়ে তাদেরও লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে হয়। মূলত পুরো চেইন জুড়েই এক ধরনের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব কাজ করছে। এর ফলে প্রান্তিক কোরবানিদাতা থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।