বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনটি দিন ২৬ মার্চ ১৯৭১, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এবং ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ একসূত্রে গাঁথা। এ তিনটি দিবস স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। জনগণের মুক্তি, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে পরাধীনতার শিকল থেকে রক্ষা করার এ দিবসগুলো জাতির ইতিহাসে চির অম্লান ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চের ঘোষণা ‘আমি জিয়া বলছি’ নিজের কানে শোনা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনীর ক্রাকডাইন চলছে। বোমা হামলার পর অসংখ্য মানুষ ঢাকা শহর ছেড়ে পালিয়ে গেল। আমরাও ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেলাম। তখন দেশের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। ২৫ তারিখ ছিল জেনোসাইড বা গণহত্যা। আমরা সবাই পালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে গেলাম। জাতি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। সবাই দিশেহারা। এ সময় সম্ভবত ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা এল- ‘আমি মেজর জিয়া বলছি। আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ এটা বললেন, তার পর তিনি আরেকটা ঘোষণা দিলেন, ‘আমি মেজর জিয়া। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ প্রথম ঘোষণাটা তিনি নিজে দিয়েছেন। সারা জাতি তখন একটা দিকনির্দেশনা পেল। সবাই তখন ভাবলো যে, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মেজর জিয়া ৭ নভেম্বরে আবার একই ভয়েস দিলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। আমি ঘোষণা করছি- আমাদের সিপাহি-জনতা, আমরা বাংলাদেশকে পৃথক ঘোষণা করছি। দেশে যে বিশৃঙ্খলা ছিল আমরা দূর করেছি। আমরা আবার নতুন করে পথ চলব। আমরা বাংলাদেশকে আবার নতুন করে নির্মাণ করব। ৭ নভেম্বরের পর ধীরে ধীরে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন। এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি ক্ষমতায় এসে প্রথমে বাকশাল নামে যে শাসন ছিল, সেখান থেকে দেশকে মুক্ত করলেন। এখানেই ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য। এর পর থেকে বাকশাল ভেঙে গেল। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করলেন। সব রাজনৈতিক দলকে কাজ করার অনুমতি দিলেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলো আগে যেভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, কাজ করেছে, কর্মসূচি দিয়েছে- ঠিক একইভাবে তারা তা পালন করতে পারবে।
৭ নভেম্বরের উদ্দেশ্য বা সুদূরপ্রসারি যে ফল, সেটা হলো- দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা থাকবে না। বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সে সময় চারটি সংবাদপত্রের অনুমতি ছিল। জিয়াউর রহমান বললেন, সংবাদপত্র পূর্ণ স্বাধীন। আগে যেভাবে সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো এখনো সেভাবেই সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে। এভাবে তিনি বাংলাদেশকে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রূপান্তরের চেষ্টা করলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলেন, বাকস্বাধীনতা বলেন- এগুলো তার সময়ে ছিল। ১৯৭০ থেকে ’৭৫-এ একটা দুর্ভিক্ষ হয় এ দেশে। এবং সেই সময়টাতে রক্ষীবাহিনী প্রচুর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হত্যা করে। সেখান থেকে তিনি দেশকে উদ্ধার করলেন। এটা ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ফল বলা যেতে পারে। তার পর তিনি মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন। তিনি জনগণের গণ-অধিকার ফিরিয়ে দিলেন। এভাবেই ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য যুক্ত হয়।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে খাদ্যসংকট ছিল- যা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বলা হয়- খাদ্যের অভাব ছিল না, খাদ্য মজুত করার ফলে এক শ্রেণির লোক খাদ্য লুকিয়ে রেখেছে। এ কারণেই ’৭৪-এ দুর্ভিক্ষ হয়। সেখান থেকেও জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বলতে যা বোঝায় তা তিনি করলেন। খাদ্যের জন্য মানুষ যেন না মারা যায়, তার ব্যবস্থা করলেন। বিদেশে যারা এ দেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন তাদের তিনি বললেন, আপনাদের প্রধান কাজ হবে বাংলাদেশের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা। আমি সে সময় সুইডেনে এক কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন জাস্টিস মাকসুদুল হাকিম। তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আমাকে গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন যে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাকে বলেছেন যে, আমি কোনো মানুষকে না খেয়ে মরতে দেব না। আমাদের যেহেতু খাদ্যসংকট চলছে, আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হবে। এখন আমাদের প্রধান কাজ হবে খাদ্য সংগ্রহ করা। যেটা এমনি হতে পারে, লোন হতে পারে, সেটা এইড হতে পারে। রাষ্ট্রদূত বললেন, আমার প্রধান কাজ হলো বাংলাদেশের জন্য চাল, গম, গুঁড়াদুধ সংগ্রহ করা। এ কথাগুলো সব অ্যাম্বাসিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ম্যাসেজ দিয়ে দিলেন।
জিয়াউর রহমানের একটা লক্ষ্য ছিল যে, খাদ্যে বাংলাদেশ স্বংয়সম্পূর্ণ থাকা। সে লক্ষ্যে তিনি অনেক উন্নয়ন করতে পেরেছিলেন। তার খাল খনন কর্মসূচি, পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচি, তিনি বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘রাখাল রাজা’ বলা হতো। তিনি রাজা হয়ে রাখালের সঙ্গে মিশেছেন। তিনি বলেছেন, আমি রাজনীতি শহরমুখী করব না, গ্রামমুখী করব এবং তাই তিনি করেছেন। এগুলো তার কৃতিত্ব। তিনি পল্লি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্পে সিপাহি ও জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসে। এ ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ জাতীয় সংহতির শক্তি প্রদর্শন করে স্বাধীনতার চেতনা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে নতুন অভিযাত্রায় ধাবিত করে। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র অর্থাৎ গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়। রাষ্ট্র পরিণত হয় এক ব্যক্তি শাসিত রাজার রাজ্যে, যেখানে বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার রুদ্ধ হয়ে যায়। সেই বিভীষিকাময় একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় সিপাহি-জনতা স্বাধীনতার ঘোষক ও রণাঙ্গনের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, সাহস ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা স্থাপন করে। ৭ নভেম্বর, দেশপ্রেমিক সিপাহি ও জনতা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করে। গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে জিয়াউর রহমান একপর্যায়ে রাজনীতিতে আসেন, জাতিকে সংকট থেকে উদ্ধার করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। তিনি সব মত ও পথের মানুষের সন্নিবেশ ঘটিয়ে গণমানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু করেন।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন, তার মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের সব নাগরিক, অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশানির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করে একক জাতিরাষ্ট্র গড়ে তোলা। এ আদর্শে জাতির জন্য একটি অভিন্ন ও গৌরবময় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা গণতন্ত্রকামী জনগণের সহাবস্থানের পাথেয় হয়ে ওঠে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়; বরং গণতান্ত্রিক অধিকার, মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয়। এ আদর্শকে ধারণ করে আজও স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশ ও জনগণের মুক্তির রাজনীতি করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, যেখানে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হবে সহিষ্ণু, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক। শতসহস্র শহিদের রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অর্জিত একবিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক বিপ্লব আমাদের সামনে একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও আইনের শাসনের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
.jpg)
