গত শতাব্দীতে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কোনটি, এ প্রশ্ন যদি ওঠে তবে বলতে হবে সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠা। গত শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বাঙালির জন্য এমন বড় গৌরবের ঘটনা কমই ঘটেছে। কিন্তু তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হচ্ছে বাংলার এই রাষ্ট্রভাষা হওয়া। ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই শেষ দিনগুলোতে কল্পনা করাও কঠিন ছিল যে, এমন ঘটনা সম্ভবপর হবে। আমরা পরাধীন জাতি, অনেককাল পরাধীন থাকব, এই ছিল সাধারণ অনুভূতি। তার পর ইতিহাসের অনিবার্য স্রোতধারায় ইংরেজ চলে গেছে, বিভক্ত বঙ্গের একাংশ সংলগ্ন হয়ে গেছে ভারতের, সেখানে অধীন হয়ে যাবে সে হিন্দির; অপর অংশ যুক্ত হয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে, আশঙ্কা ছিল অধীন হয়ে যাবে সে উর্দুর, কিন্তু তা হয়নি, বের হয়ে এসেছে সে তার দ্বিতীয় শৃঙ্খল ভেঙে, এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্র ভেঙে সশস্ত্র যুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানিদের পরাজিত করে স্বাধীন হয়েছে। তার রাষ্ট্রভাষা এখন বাংলাভাষা।
আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে ভাষাই হচ্ছে প্রধান উপাদান। আমরা ভাষার পরিচয়ে পরিচিত হতে ভালোবাসি। সাহিত্য নিয়ে গৌরব করি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি তাই দুই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ- একদিকে সে রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি। বঙ্গদেশ দীর্ঘকাল পরাধীন ছিল, তার ভাষা কখনো রাষ্ট্রভাষা হয়নি, তাই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তার এ প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ বৈকি, আসলে সবচেয়ে বড় ঘটনাই।
আর এই যে রাষ্ট্রভাষা হওয়া, এর প্রক্রিয়ায় আরও একটা ব্যাপার ঘটে গেছে, যার দরুন সংস্কৃতির কেন্দ্র এখন একটি নয় দুটি। এক সময়ে কলকাতা ছিল প্রধান, প্রায় একচেটিয়া। ঢাকা ছিল পশ্চাৎপদ পূর্ববঙ্গের একটা শহর। সাংস্কৃতিকভাবে এখন ঢাকাই বরঞ্চ অধিক সম্ভাবনাময়, কলকাতার তুলনায়। এর সহজ কারণটা এই যে, ঢাকা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী, কলকাতা যা নয়। তদুপরি ঢাকা এমন একটা রাষ্ট্রের রাজধানী বটে, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এক সময়ে এই শহর তথাকথিত বাঙাল ছিল, এখন পরিপূর্ণরূপে বাঙালি হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা, নাকি উর্দু- এ প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, গত শতাব্দীতেই। আজ সে প্রশ্ন তুললে বালকেও হাস্য করবে। বালকেরাই বরঞ্চ বেশি হাসবে।
কিন্তু ঘটনাটির আরও একটি দিক রয়েছে। সেটা এই যে, যে বাংলা ভাষা আমাদের জন্য ঐক্যের অত্যাবশ্যক সূত্র, সে-ই বলে দেয় যে, আমাদের সংস্কৃতি ঐক্যবদ্ধ নয়। অতীতে ছিল না, এখনো হয়নি। ব্যবধান শিক্ষিত-অশিক্ষিতে। অশিক্ষিতরা বাংলা জানে না এবং অতিবেশি শিক্ষিতরা বাংলা পছন্দ করে না। এটা অতীতে সত্য ছিল, সব অগ্রগতি সত্ত্বেও আজও রূঢ়ভাবে সত্য হয়ে রয়েছে।
এ বিভাজনকে কিছুতেই বৈচিত্র্য বলা যাবে না, বলতে হবে এ হচ্ছে বৈষম্য। বৈষম্য বাঙালির অতিপুরাতন শত্রু, শতাব্দী থেকে শতাব্দীজুড়ে আর যা কিছুই বদলাক, বৈষম্যের বাস্তবতা বদলায়নি।
ইংরেজ আসার আগেও এ দেশে বৈষম্য ছিল, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি ইংরেজ শাসনেই সৃষ্টি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে দেখলাম। সেই বৃদ্ধিতেই শেষ পর্যন্ত বাঙলা বিভক্ত হয়েছে। ১৯০৫-এ বিভাজনের চেষ্টা হয়েছিল, বিভাজন হয়নি; কিন্তু তাতে ঐক্য যে বাড়ল তা নয়। বাড়ল না; এবং বাড়ল না বলেই সাতচল্লিশের বিভাজন অনিবার্য হয়ে পড়ল।
অপসৃয়মাণ গত শতাব্দীটিতে সাংস্কৃতিকভাবে বড় সামাজিক ঘটনা হচ্ছে মধ্যবিত্তের বিকাশ। কলকাতাকে কেন্দ্র করে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণি বেড়ে উঠল, যা ছিল প্রধানত হিন্দুদের নিয়ে গঠিত। ঢাকাকে কেন্দ্র করে তুলনায় দ্রুতগতিতে আরেকটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি আত্মপ্রকাশ করল, যেটা মূলত মুসলিম। ঢাকায় মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাগুলো বিভিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন- সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্য এদের চর্চা প্রায় ছিলই না, পরে হয়েছে। নাটক এসেছে। আরও একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো নারী শিক্ষার অগ্রগতি। শিক্ষিত মেয়েরা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রকাশ্য ভূমিকা নিচ্ছে, নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, বিরোধী দলেন নেত্রী হয়েছেন।
তাদের চলাফেরায় এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। ওদিকে শিক্ষার সুযোগ পায়নি এমন মেয়েরা কলে-কারখানায় কাজ করছেন। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে এসব ছিল অকল্পনীয়।
গত শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেন। বঙ্গদেশ তখন ইংরেজের অধীন। ওই ঘটনা বাংলাভাষার জন্য বিশ্বস্বীকৃতি এনে বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করল। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের জন্য আরও একটা বড় কাজ করেছিলেন, সাহিত্যকে তিনি অসাম্প্রদায়িক করলেন। সাহিত্যচর্চা এখন গুণে বেড়েছে, পরিমাণে বেড়েছে, কিন্তু তবু, মানতেই হবে যে, জনসংখ্যার তুলনায় পাঠকের সংখ্যা বাড়েনি। বরং নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে।
চলচ্চিত্র এল। এ শিল্পমাধ্যমে বাঙালির অবদান সামান্য নয়। কিন্তু তবু সে অনেক দূর যে যাবে তা হয়নি। বাদ সেধেছে মুম্বাই। আসলে যেমন পশ্চিমবঙ্গে তেমনি বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্য পুঁজির অবাধ দৌরাত্ম্য। এরই মধ্যে একজন সত্যজিৎ রায় বের হয়ে এসেছেন। চলচ্চিত্রে যার সাফল্য সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের সাফল্যের সঙ্গে তুলনীয়।
এসেছে টেলিভিশন। তাতে বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি পেল। কিন্তু আবার ওই পথেই পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি এবং বাংলাদেশে ইংরেজি ও হিন্দি রিমেক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ খুঁজে পেয়েছে।
এক শতাব্দীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ। সংখ্যা বেড়েছে, জীবন-যাপনের মান বাড়েনি। গুণগত বৃদ্ধি যেটুকু তা সীমাবদ্ধ রয়েছে ওপরতলায়। ওপরের মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, খাদ্যাভাস ও রুচিতে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু নিচের মানুষ তার আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। আসলে সেখানেও নেই, বিপুল সংখ্যক মানুষ নিচে নেমে গেছে। সামন্তবাদ ভেঙে পুঁজিবাদ এল। কিন্তু এই পুঁজিবাদ উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করতে পারল না। যার দরুন উৎপাদন তেমন বাড়ল না। আজ দেখছি যে কৃষক এক সময়ে জমিদারের অধীন ছিল, এখন সে অধীন হয়েছে পুঁজির মালিকের, কিন্তু এ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় উৎপাটিত হয়েছে সে বসতবাড়ি থেকে। আজ সে ভূমিহীন, তার পরিচয় খেতমজুর হিসেবে; কিন্তু খেতেও সবাই যে কাজ পায় তা নয়, তাকে চলে আসতে হয় শহরে, ভাসমান রূপে। পুঁজিবাদের দাপটে এ অঞ্চলের মানুষ ও পরিবেশ উভয়ই আজ অত্যন্ত বিপন্ন।
সমাজ ও সংস্কৃতিতে বুর্জোয়া বিকাশের নানান চিহ্ন এখন বিদ্যমান। লোকে গণতন্ত্র চায়, ধর্মনিরপেক্ষতা পছন্দ করে, পারস্পরিক সম্পর্কে গণতান্ত্রিকতাকে প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু তবু অভ্যন্তরে সামন্তবাদী উপরকণগুলো নানা মূর্তিতে রয়ে গেছে এবং উৎপাত করছে। বর্তমান দক্ষিণপন্থার আধিপত্যে উগ্র জাতীয়তা, ধর্মান্ধতা এমনকি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে পর্যন্ত খাটো করে পশ্চাৎ অভিমুখে ঠেলে দেওয়ার তৎপরতা ভয়ানক মাত্রায় পৌঁছেছে। সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
মোট কথা, আলো অবশ্যই বেড়েছে কিন্তু সেই উজ্জ্বল আলো অন্ধকার দূর করেনি, বরঞ্চ বলা যাবে যে, পটভূমিতে অন্ধকার থাকার দরুনই আলোকে আরও বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

