ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দিলেন এমপি রেহানা রানু টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলছে: ত্রাণমন্ত্রী এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ফ্যান্টাসী কিংডম-খবরের কাগজ প্রতিদিনের অনলাইন কুইজ বিজয়ী ডিজিটাল নকল প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদলীয় নেতার পোশাক ছাড়া গোসল করলে ওজু থাকবে কি? গুজব ও বিচারাধীন ইস্যুতে সংসদের সময় নষ্ট না করার আহ্বান স্পিকারের চালের বাজারে কারসাজি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চলছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নতুন ও প্রথম আয়কর রিটার্ন  দাখিলকারীর প্রতি পরামর্শ

নির্বাচনের পর সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:২৭ পিএম
আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:৩২ পিএম
নির্বাচনের পর সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা
সাঈদ বারী

বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে গণতন্ত্রের চর্চা ধারাবাহিক ও কার্যকর রয়েছে স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই। (যদিও ‘আয়রন লেডি’খ্যাত  ইন্দিরা গান্ধী  তার শাসনামলে একবার ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে এর ছন্দপতন  ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে তাকে এর প্রায়শ্চিত্তও  করতে হয়েছিল।)

ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যখন রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের প্রতি অসামান্য সম্মান প্রদর্শন করেছে। সেই মুহূর্তগুলো শুধু সৌজন্য প্রকাশ ছিল না, বরং গণতন্ত্রের ভিতকে দৃঢ় করার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অটল বিহারি বাজপেয়ি, মনমোহন সিং, এল কে আদবানি কিংবা নরেন্দ্র মোদি- প্রত্যেকেই কখনো না কখনো বিরোধী পক্ষকে সম্মান জানিয়ে ভারতের সংসদীয় সংস্কৃতিকে আরও উজ্জ্বল করেছেন। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। কেননা, আমাদের গণতন্ত্রের বিকাশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থান ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

ভারতের সংসদে অটল বিহারি বাজপেয়ি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সরকারে থাকুন বা বিরোধী দলে- সংসদের মর্যাদা রক্ষা করেছেন নির্ভীকভাবে। ১৯৯৬ সালে তিনি যখন স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন, বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও সংসদে বলেছিলেন, ‘সংসদে বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণ হয় না।’ পরবর্তীকালে তিনি নিজে বিরোধী নেতা থাকাকালেও শাসক দলের সাফল্যকে স্বীকার করতে কার্পণ্য করেননি। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও তাকে  ‘দেশপ্রেমিক নারী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীও তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করে পারস্পরিক শ্রদ্ধার নজির স্থাপন করেছিলেন।

মনমোহন সিং ও এল কে আদবানির সম্পর্কও এক ভিন্ন মাত্রার ছিল। রাজনৈতিক আদর্শে বিপরীত মেরুর হলেও, মনমোহন সিং সংসদে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘আমাদের মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু আদবানিজির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে।’ এ বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত সৌজন্য নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী নেতার মর্যাদা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তারই স্বীকৃতি। একইভাবে, নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘মনমোহন সিং হুইলচেয়ারে করেও সংসদে এসে ভোট দিয়েছিলেন- এটাই দায়িত্ববোধের উদাহরণ।’ এ বক্তব্যে যে মানবিক স্বীকৃতি প্রকাশ পায়, তা শুধু একজন রাজনীতিবিদের প্রতি নয়, বরং সংসদীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ।

এ উদাহরণগুলো দেখায়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার খেলা নয়; এটি আচরণের, আস্থার ও সম্মানের এক জটিল সমীকরণ। যে দেশে সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে সম্মান জানাতে পারে, সেখানে জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্থায়ী হয়। গণতন্ত্র তখন কেবল শাসনব্যবস্থার কাঠামো নয় বরং একটি সংস্কৃতি হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এ জায়গাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে। আমাদের নির্বাচনি রাজনীতি প্রায়ই এমনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেখানে জয় মানেই সব কিছু পাওয়া এবং পরাজয় মানেই রাজনৈতিকভাবে মুছে যাওয়া। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান অনেক সময় সহাবস্থানের বদলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও ঘনীভূত করে। সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ সংসদই সেই জায়গা, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতকে সংঘাত নয়, যুক্তি ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ তৈরি হয়।

এখানে ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য এক অনুপ্রেরণা হতে পারে। ভারতেও রাজনৈতিক বিভাজন কম নয়, কিন্তু সংসদের ভেতরে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য রক্ষা করা হয়। বিরোধী দলকে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়া, তাদের প্রস্তাব শুনে বিবেচনা করা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা- এসবই সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ। এমনকি সরকার পরিবর্তনের পরও অনেক সময় পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত নীতিগুলোকে ধারাবাহিকতার স্বার্থে অব্যাহত রাখা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংসদকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে, এই ‘পারস্পরিক সম্মান’-এর সংস্কৃতি গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। বিরোধী দলকে শুধু সমালোচক বা শত্রু হিসেবে দেখা নয়, বরং বিকল্প মত ও পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করা- এটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব হলো, সংসদ বর্জন বা হট্টগোলের বদলে সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামত তুলে ধরা। যদি উভয় পক্ষই সংসদকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ নয় বরং জাতীয় স্বার্থের মঞ্চ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে রাজনৈতিক আস্থার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তারা যদি সংসদীয় সৌজন্য ও যুক্তিপূর্ণ বিতর্ককে উৎসাহিত করে, তাহলে রাজনীতিবিদরাও ধীরে ধীরে আচরণগত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবেন। ভারতের সংসদে বাজপেয়ি বা মনমোহন সিংয়ের বক্তৃতা আজও যেমন উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়, তেমনি বাংলাদেশের সংসদেও যদি যুক্তি, তথ্য ও পরস্পরের প্রতি সম্মানভিত্তিক বিতর্কের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষার উৎস হয়ে থাকবে।

আগামী সংসদ নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হোক না কেন, সেটি যদি বিরোধীপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয় বরং অংশীদার হিসেবে দেখে, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকাংশে কমে আসবে। কারণ জনগণ তখন বুঝবে, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করছে- শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকবে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন প্রতিশোধ বা ধ্বংসাত্মক মনোভাবের জায়গা থেকে না আসে।

বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক পথ পেরিয়েছে। এক সময় যে বিরোধিতা অস্তিত্ব সংকট তৈরি করত, আজ তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে- তবে এখনো অনেক পথ বাকি। এই পথের দিশা পেতে হলে ভারতের সংসদীয় সংস্কৃতি আমাদের জন্য এক দর্পণ হতে পারে। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবেই, কিন্তু সেটি যদি শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মানের সীমার ভেতরে থাকে, তবেই গণতন্ত্র বিকশিত হবে।

শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে- এটি মতভেদকে ভয় পায় না বরং তাকে সংলাপের শক্তিতে পরিণত করে। নির্বাচনের পর সরকার ও বিরোধী দল যদি সেই সংলাপের সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের সংসদ কেবল নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র নয়, জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠবে। ভারতীয় সংসদের সেই সম্মান, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমরা যদি উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি, তবে হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতি আর সংঘাতের নয়,  সহযোগিতা ও আস্থার নতুন অধ্যায় রচনা করবে।

এটাই আজকের সময়ের দাবি- রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদকে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র বেঁচে থাকে তখনই, যখন সরকার ও বিরোধী উভয়েই একে অপরের অস্তিত্বকে সম্মান করে।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

৯১তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার
হরিপদ দত্ত

ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু।...

রাজনৈতিক প্রবন্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠক মননে শ্রেণি-শাসিত সমাজ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি করা। যে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পাঠক বসবাস করে সেই সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের অজ্ঞতা, অস্পষ্টতা বা অমনোযোগিতায় আচ্ছন্ন থাকে তারা। রাজনৈতিক প্রবন্ধ সমাজের গতি-প্রকৃতির স্বরূপটি উদ্ঘাটন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরে এবং সে সম্পর্কে কৌতূহলী পাঠককে তাদের সামাজিক দায়দায়িত্ব বোধের আলোর সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। রাজনীতি অবশ্যই একটি জটিল বিষয়। তাই এ বিষয়টিকে পাঠকের সামনে বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল তত্ত্ব নির্মাণই প্রধান কাজ নয়, লেখকের ভাষা বা গদ্যশৈলীটিও হতে হবে শিল্পগুণে অন্বিত। জটিল শব্দ চয়ন, বাক্য-বিন্যাস কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব দ্বারা বিষয়বস্তুকে দুর্বোধ্য করে তুললে রচনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। গদ্যের জটিলতার কারণে যদি বিষয়বস্তুর ভেতর পাঠক প্রবেশ করতে না পারল, তবে লেখক নিজের জন্য তো নয়, পাঠকের জন্যও কোনো সুসংবাদ বহন করতে পারেন না।

বাংলাদেশের সাহিত্যে রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধ তথা প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রবন্ধের ইতহাস খুব বেশি পুরাতন নয়। যদিও এর সূত্রপাত অভিভক্ত বাংলায়, তবু নিজস্ব ধারাটি তৈরি হয়েছে পঞ্চাশের দশকের ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। প্রকৃত অর্থে এর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছে স্বাধীনতা-উত্তরকালে। কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারা থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারাটি যে স্বতন্ত্র তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ষাটের দশকের শেষ দিকে। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন এবং পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) পাকিস্তানি শাসনে থাকার ফলে বাংলার দুটি অংশেরই সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপরীতির পরিবর্তন ঘটে। কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, সাংস্কৃতিক তথা বাংলাভাষার সাহিত্যের বিষয় এবং রূপগত স্বতন্ত্রধারাটিও স্পষ্ট হয়ে পড়ে সে সময়। রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে গোপাল হালদার, বিনয় ঘোষ, আবু সায়ীদ আইয়ুব এবং আরও অনেকে বিষয়-ভাবনা এবং রূপান্তরীতির বিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির আলাদা রাষ্ট্রের দীর্ঘ জন্মযন্ত্রণা এবং জন্মের ধারাবাহিক কম্পন-প্রকম্পনের মধ্যদিয়েই নতুন অভিযাত্রার স্বতন্ত্র রূপ রাজনৈতিক ধারাটি প্রবন্ধ সাহিত্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যায় ড. আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সরদার ফজলুল করীম, দেবেন শিকদার, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা এবং আরও অনেককে। আমার লেখার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ধারার লেখালেখির বিষয় ভাবনা নয়, রূপরীতি তথা গদ্য স্টাইলটি।

সমাজবাদী দর্শনের আলোকে প্রবন্ধ রচনা অত্যন্ত জটিল সাহিত্যকর্ম। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জটিল প্রক্রিয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে আগে শনাক্ত করতে হয়, তার পর শুরু নিজের লেখাটি। কাজটি অনেকটা নিষ্কাম সাধনার মতো। কাজ করা কিন্তু ভোগের তৃষ্ণাকে দমন করা। খ্যাতির মোহ সেখানে অদৃশ্য। কেননা সমাজবাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিজের জন্য বা আত্মরতির জন্য সাহিত্য রচনা করেন না, উদ্দেশ্যটা হচ্ছে সমাজ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানেন তার লেখালেখির উদ্দেশ্য পাঠকের স্নায়ুতে মাদক রস কিংবা আমোদ-প্রমোদ রস প্রবেশ করানো নয়, পাঠকের চিন্তার অনুশীলন দ্বারা সামাজিক সত্যের সামনে দাঁড় করানো। একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠক যদি তার রচনা পাঠক করেন তবেই লেখকের শিল্প কৌশলটি ধরতে পারবেন। দ্বন্দ্বমূলক, বস্তুমূলক বস্তুবাদের সূত্র-উপসূত্র এবং অনুগামী সূত্রগুলোকে তিনি প্রথমেই ছড়িয়ে দেন চলমান সমাজ জীবন ও রাজনীতিতে। তার পর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সমাজস্থিত শ্রেণিগুলোর আচরণ ও গতি-প্রকৃতি। নিরীক্ষণ বা পর্যবেক্ষণের পর বিশ্লেষণের কাজে হাত দেন তিনি। এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তির কাজকর্ম ও জীবনকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বমূলক কৌশলে এবং শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে। ‘তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান’, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা’, ‘শেখ মুজিবের অঙ্গীকার’, ‘বিদ্যাসাগরের কাজ’ ‘আমার পিতার মুখ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ তার দৃষ্টান্ত।

যেকোনো লেখাই (প্রবন্ধ) যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখতে বসেন তখন তার গদ্য রূপটি হয়ে ওঠে একের ভেতর বহুর রূপ। কখনো গল্পের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় কিংবা কখনো কবিতার শব্দ ও ছন্দের অনিবার্য বিন্যাসে সমাজের স্বপ্ন ও আগামী কল্পনার রূপকে নিজের করে নিয়ে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। তার রচনায় ‘উত্তম পুরুষ’ রীতিতে বলা গদ্য এবং ‘সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ’ থেকে বলা গদ্যগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, গদ্যরীতিটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যই উপযুক্ত। তাই মনোযোগী এবং কৌতূহলী পাঠক ভুলে যান তিনি গদ্য কবিতা নাকি গল্প নয় তো প্রবন্ধ পাঠ করছেন। প্রবন্ধের গঠনরীতিটি যে মন্ময় বা তন্ময় উপবিভাগ রয়েছে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যের ভেতর তা মিলেমিশে একাকার হয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রীতিতে পরিণত হয়। সেই গদ্যরীতিটিই তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। তার এই গদ্যশৈলীর পেছনে কাজ করে নিজস্ব গভীর শ্রেণিজ্ঞান বা শ্রেণি চেতনা। সেই জ্ঞানে ঋদ্ধ বলেই তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে ওঠে আসা পাঠক শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের বোধ বা অনুভবের ভাষাকে বুঝতে পারেন।

আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো বাংলাদেশ তো বটেই, পশ্চিম বাংলায়ও বহু পাঠক আছেন যারা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শনে আগ্রহী এবং তার গদ্যের মুগ্ধ পাঠক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতিমান অধ্যাপক অমলেন্দু দের মন্তব্য হচ্ছে, ‘দ্যাখো, মি. চৌধুরীর গদ্য বলার ঢংটি কিন্তু চমৎকার। রাজনীতির শুকনো কথাগুলোকে তিনি কী করে যেন খাঁটি শিল্প বানিয়ে ফেলেন। আজকাল অমনটা কলকাতায়ও খুব একটা দেখা যায় না।’

শিল্পচর্চার বিষয়টিতে অন্য অনেকের সঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রয়েছে পার্থক্য। তিনি প্রতিনিয়ত যে চর্চা করেন তার প্রমাণ তার ক্রমবিকাশমান গদ্যশৈলী। তার প্রবন্ধের গদ্যশৈলী কবিতার মতো অলংকার বহুল। চিন্তার সঙ্গে যুক্তি এবং সূক্ষ্ম অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে কৌতুক। ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’ প্রবন্ধে পাকিস্তান প্রস্তাবের বিষয়টি লেখক এভাবে বর্ণনা করছেন, ‘হক সাহেবের প্রস্তাবটি তার নিজের ছিল না। ধারণা নয়, ভাষাও নয়, সবই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তাবটি হক সাহেব দেখেনওনি, তিনি তৈরি প্রস্তাব পড়ে দিয়েছিলেন শুধু। বলা তাই সম্ভব যে তিনি এটি উপস্থাপন করেননি, তাকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কণ্ঠ তার স্বর অন্যের।’ (নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ: পৃ. ৪৪) এই গদ্য পাঠকচিত্তে যেমনি কৌতূহল সৃষ্টি করে তেমনি করে কৌতুক। অন্যদিকে ‘কণ্ঠ এবং স্বর’ শব্দ দুটি গভীর ব্যঞ্জনা কবিতার মতো হয়ে ওঠে। লেখক গদ্যের শরীরের চিত্রকল্পের আবহ নির্মাণ করে কাব্যের কৌতুক রস পরিবেশনের ভেতর দিয়ে তীব্র শ্লেষ সৃষ্টিতেও দক্ষ। যেমন, ‘মুসলমান সমাজে মাকড়সার জাল বোনা অনেকটাই চলল; শাস্ত্র নিয়ে তর্ক হলো। পুঁথিসাহিত্যের চর্চা হলো। কিন্তু বুর্জোয়া বিকাশের উদার আলো তেমন দেখা গেল না।’ (বেকনের মৌমাছিরা: নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ১৬২)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঘটনা বা তার কার্যকারণের ওপর আলোকসম্পাৎ করে পাঠককে নিজের বোধের অংশীদার করে নেন। যেমন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের কথা তিনি এভাবে বাণীবন্ধন করেন, ‘আমি উৎপাটিত নই, আমি বেড়ে উঠব বৃক্ষের মতো, শেকড় প্রোথিত থাকবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভূমিতে, আকাঙ্ক্ষা ছিল এটাও।’ (বায়ান্নর আন্দোলন: নিঃরাজনৈতিক পৃ. ৪১)। গদ্যের এই বাণীভঙ্গিটি আবেগাত্মক অথচ প্রত্যয়দৃঢ় বাণীর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। পাঠকের স্বপ্ন ও উত্তেজনা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে যায় এ কারণে যে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিত্বও মিশে একাকার হয়েছে। রচনার সঙ্গে লেখক ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধনের বিষয়টি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে আছে। ‘লেনিন কেন জরুরি’ প্রবন্ধে তাকে পাওয়া যায় কী অসীম বিশ্বাসে দৃঢ়। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় লেখক চিত্তে ক্ষোভ-দুঃখ সৃষ্টি হয় কিন্তু আপন বিশ্বাসকে, ব্যক্তিত্বকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেন না তিনি। তিনি লিখলেন, ‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে ততদিন তিনি থাকবেন। মূর্তি ভাঙলেও তিনি অমর হয়ে রইবেন।... পৃথিবী যদি শোষণশূন্য হয় কখনো, লেনিন তখনো থাকবেন। তখন থাকবেন ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে।’ (নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ২৭৬)। বাক্যটিতে বা অনুচ্ছেদটিতে কোথাও আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, নাটকীয় বাণীবিন্যাসও নেই, রোমান্টিক অলীক স্বপ্নও নেই। আছে বিশ্ববাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে দূরদর্শী মানুষের চূড়ান্ত ব্যক্তিত্বের হিসাব। এই ব্যক্তিত্বই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার শিল্প মানসে। তাই তার গদ্য হয়ে ওঠে জনগণের শিল্প সম্পত্তি।

রচনার স্টাইল রচয়িতার মানস ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু। শ্রদ্ধেয় স্যারকে জন্মদিনে জানাই অফুরান শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।...

ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সদ্য পরাজিত শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত বিলুপ্ত হওয়ার পথে। শুধু তাই নয়, একথা এখনই স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া যায় যে, ওই দলটির মাথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে পরাজয় কোনো নতুন বিষয় নয়। ভোটে হারার পর কোনো কোনো দল আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কোনো কোনো দলকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় বিরোধী পক্ষে। তার পর ফিরে আসে ক্ষমতায়। কোনো কোনো দল আবার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। পরিণতি যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক দলকে আসল পরীক্ষার মুখে গড়তে হয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর।

কিন্তু তৃণমূল দলের অবস্থা হলো–এক বিধায়ক প্রকাশ্যে দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাকে সমর্থন করছেন অন্য নির্বাচিত বিধায়করা। পরিষদীয় দলের মতো সংসদীয় দলেও চওড়া হচ্ছে ভাঙন। দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে অধিকাংশ বিধায়ক এনডিএ সরকারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলের প্রবীণ নেতারা শীর্ষ নেতাদের একাধিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন প্রকাশ্যে। এমন কিছু যে হতে পারে তা কয়েক বছর আগে ছিল কল্পনারও অতীত। শুধু কয়েক বছর আগে কেন, এই ২০২৬ সালের প্রথম দিকেও এরকম কোনো সম্ভাবনাকে বাস্তবোচিত বলে মনে করা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আজ তৃণমলের কাছে এসবই ঘোর বাস্তব, চূড়ান্ত সত্যি।

আর তাই বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরাট জয় পশ্চিম বাংলার রাজনীতির সব থেকে বড় খবর নয়। বরং ১৫ বছর ধরে বাংলার শাসনব্যবস্থা যে দলের হাতে ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদই জায়গা করে নিয়েছে শিরোনামে। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় বিরোধী থাকার পর একদা ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই প্রথম অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হচ্ছে। আবারও ক্ষমতায় ফেরার প্রশ্ন তো কোনো ছাড়–ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় তার দল টিকে থাকবে কি না সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নির্বাচন-পরবর্তী বিধানসভার ট্রেজারি বেঞ্চ বা শাসকপক্ষের তরফ থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবরটি আসেনি। এসেছে ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলের তরফ থেকে। উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে যেভাবে একদল তৃণমূল বিধায়ক বিদ্রোহ করেছেন তা কয়েক মাস আগেও ছিল কল্পনার অতীত। তাকে বরখাস্ত করেছে তৃণমূল। কিন্তু বিধানসভার খাতাকলমে এখন তিনিই তৃণমূলের নেতা। এখান থেকেই বোঝা যায়, এখন তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি ঠিক কতটা খারাপ।

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।

তৃণমূলের অসন্তোষের অন্যতম বড় দিক একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তা হলো গত কয়েক বছরের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নেতৃত্বের মডেল। সেসব অভিযোগ এখন খুবই চেনাজানা। পরামর্শদাতা সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীকরণ, দলের ভেতরে বিতর্কের অবকাশ কমে যাওয়া এবং নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারকদের দূরত্ব–এ ধরনের নানা অভিযোগ এখন একত্রিত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা সেটা আর বিবেচ্য নয়। যা বিবেচ্য তা হলো সবাই এখন প্রকাশ্যেই এ ধরনের কথা বলছেন। এ পরিস্থিতিতে মমতার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার গোটা রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে সংকট এসেছে। প্রতিবার তিনি নিজেই তার ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছেন। তার সুনামের নেপথ্যে আছে তার রাজনৈতিক প্রতিরোধ। তাকে এভাবেই দেখতে প্রস্তুত সমর্থকরা। তাই নির্বাচনের পর থেকে মমতার নীরব অবস্থান তার সমর্থকদের কাছে শুধু অচেনাই নয়, উদ্বেগেরও কারণ বটে। তৃণমূলের সংকটের কারণ শুধু একটা নির্বাচনে পরাজয় নয়। বরং ক্ষমতা ছাড়া দলটির অস্তিত্ব থাকে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ষোলোআনা বেআব্রু হয়েছে দলবদলের রাজনীতির কদর্য রূপ। তৃণমূলের ২০ জন সাংসদের সর্বশেষ পদক্ষেপ–এনসিপিআইয়ের মতো অজ্ঞাতনামা একটি দলে প্রত্যেকের যোগদান। দলবদল করলে মুখে অন্তত নতুন দলের আদর্শ সম্পর্কে কিছু কথা থাকত। কিন্তু যে দলটাই অস্তিত্বহীন, সে সম্পর্কে কী-ই বা বলতে পারেন বেপথুরা। কোনো এককালে দলটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের খাতায়। তার পশ্চিমবঙ্গে না আছে কোনো সংগঠন, না কর্মতৎপরতা। এরা একসময় ত্রিপুরায় কয়েকটি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা গেছে। সেখানেও না মিটিং, না মিছিল–কেবল খাতাকলমে নামটা ছিল। সেই দলে যোগ দিতে হলো তৃণমূলের তথাকথিত বিদ্রোহী সাংসদদের। উদ্দেশ্য আসলে একটাই–কী করে সাংসদ পদ বাঁচিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া যায়। বিজেপিতে যোগ দেওয়াটা যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে তখন এ রাস্তায় যাওয়ার বুদ্ধিই দেওয়া হয়েছে। 
 
এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে? বিজেপির পক্ষ থেকে তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, হয় দল বদলাও, নয়তো জেলে যাও। কাজেই এভাবে নিজেদের সাংসদ পদ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ওই সাংসদরা। তবে শেষ রক্ষা হবে কি? ওয়াকিবহাল মহল কিন্তু বলছে, আলাদা দলে যোগ দিয়েও নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই।

এদিকে চলতি সপ্তাহেই সম্প্রতি আগ্নেয়াস্থ এবং বুলেটের স্তূপ উদ্ধার হয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার সন্দেশখালী ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসন্তীতে। এর আগে ধৃত এক তৃণমূল নেতার ভাই এবং ঘনিষ্ঠদের জেরা করে যে তথ্য মেলে, তার ভিত্তিতে রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স স্থানীয় একটি পুকুরে তল্লাশি অভিযান চালায়। সেখান থেকেই এবার প্রচুর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএর আধিকারিকরা মনে করছেন, এই অনুশস্ত্র উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের জিহাদিদের কাছে চালান করা হতো। গোটা ব্যাপারটাই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যবস্থাপনায় হতো সে ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। তৃণমূল সরকারের প্রশাসন সবটাই জানত, কিন্তু তাদের চোখ বন্ধ করে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ মহল থেকে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই
মো. সাখাওয়াত হোসেন

অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে।...

সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের উপস্থিতি একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন, বৈচিত্র্যতা, অপরাধীর সক্রিয়তা ইত্যাদি সার্বিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধী অপরাধ করবেই, সামাজিক বাস্তবতায় অপরাধের সুযোগও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটালাইজের কারণে পৃথিবীর পরিধিও ছোট হয়ে এসেছে। অপরাধীরা এক দেশে বসে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশে বসেও আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অপরাধীর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারি। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ। অনলাইনের ফাঁদে পড়ে রাষ্ট্রের জরুরি তথ্য অন্য দেশের হ্যাকাররা সহজেই ছিনিয়ে নিচ্ছে। বর্ডার-ভিত্তিক অপরাধের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মানব পাচার, মাদক পাচার ও অন্যান্য পাচারের অপরাধ সহসাই ঘটছে। তাছাড়া যুদ্ধময় পৃথিবীতে ভাইরাসের জীবাণু কৃত্রিমভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ জনগণকে আক্রান্ত করা হচ্ছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধের বৈচিত্র্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অপরাধও তীব্রতর হচ্ছে; ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। তাছাড়া পুঁজিবাদ বাজার ব্যবস্থাপনায় একদল মানুষ আর্থিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং অন্য দলের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। যাদের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে তারা নানাভাবে অপরাধে আক্রান্ত হচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই সরকারকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় এবং কতিপয় ক্ষেত্রে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারের প্রচলিত নিয়মে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নির্মূলে সর্বতভাবে কাজ করছে। তথাপি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়ে উঠছে না। জনমানুষের স্বস্তির জন্য হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারকে বিকল্প উপায় বের করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কমিউনিটির ওরিয়েন্টেশনকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সমাজ থেকে অপরাধের সব ধরনের উৎস নির্মূল করতে হবে, অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের কারণগুলো উদ্ঘাটন করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। বিশেষ করে পুলিশের নিয়মিত পেট্রলিং, টহল, জনসাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং দুর্যোগব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য এ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের মূল বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া এ বাজেটে পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও তা খুব বেশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নয়।

নতুন বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জননিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বাজেট নথি অনুযায়ী, জননিরাপত্তা বিভাগের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা এবং অগ্নি ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম। এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি সেক্টরই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ইস্যুকে ভিত্তি করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটির সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধকেন্দ্র নির্মাণ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার হামলা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন গতি আসতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তাও এবার বাজেটের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ৭৩টি আধুনিক কম্পোজিট বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) নির্মাণ, নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নতুন বাজেটে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। উপকূলীয় নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্যও নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিস্থাপক জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে। দেশের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সমস্যাকে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকেও মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারাগারব্যবস্থার উন্নয়নেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কারাগারগুলোকে ধীরে ধীরে আধুনিক সংশোধনাগারে রূপান্তর করা। এদিকে পাসপোর্ট ও অভিবাসনব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট সেবাকে আরও ডিজিটাল ও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্তব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাস্তবায়ন দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এ বিনিয়োগ দেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক বাহিনীকে বিশেষায়িত হিসেবে তৈরি করার নিমিত্তে সরকার বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে। এখন বাস্তবায়নের ওপর বাজেট বরাদ্দের সফলতা ব্যর্থতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

কাজেই সরকারের উচিত হবে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধীদের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে। দেশের সব পর্যায়ের জনসাধারণকে নিরাপদে ও নিশ্চিতে বসবাসের অধিকার প্রদানে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ ও আধুনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
 
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

কে কাকে শক্তি জোগায় বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়
আনু মুহাম্মদ

দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে।...

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচির নামে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পরিচালিত সন্ত্রাস, দখল, যুদ্ধ, গণহত্যা ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ‘বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর’ শিরোনামে যৌথভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন। এগুলো হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল’।

এ রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষা থেকে দেখানো হয়েছে–এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এখনো আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি, প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে প্যালেস্টাইনে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যা অব্যাহত আছে।

২০০১-এর আগে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আল-কায়েদা বা তালেবান ধারার কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। একপর্যায়ে এ অঞ্চলে বিরাট জৌলুস নিয়ে আবির্ভূত হয় আইসিস। যারা তাদের ভাষায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে তারা যেন আচমকা হাজির হয়। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করে। তবে কখনোই ইসরায়েলে হামলা করেনি। তারা আরও বিভিন্ন দেশে একের পর এক মুসলমানসহ ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী মানুষদের আক্রমণ করতে থাকে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করে বীরত্ব দেখাতে থাকে। হঠাৎ  করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয়ের কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়ার ফলে এ দেশগুলোর মানুষকে নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিন পক্ষ–সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের আসল অপরাধ স্বৈরশাসন ছিল না, ছিল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিল। সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই তাদের ওপর গোস্বা ছিল। গাদ্দাফি জীবনের শেষপর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে কথিত পুঁজিপন্থি কিছু সংস্কারের পথে গেলেও তার বড় অপরাধ ছিল সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফি সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভাড়াটিয়া উগ্রপন্থিদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদের কাছে সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদি আরব-ইসরায়েল অক্ষের বিরোধিতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য সে কারণে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদি-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইসরায়েলকে শক্তি জোগানো এবং ইরানকে কাবু করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র জোগানের ওপর ভর করেই এসব উগ্রপন্থি গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিসের পেছনে তাদের ও মিত্র দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলারসহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেলেন। পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী তথ্য যুক্তি দিয়ে সঠিকভাবেই দেখান যে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় মৌলবাদ, সব মৌলবাদের জন্মদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথাগত বিচারে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র অনেক দিকই চিহ্নিত করা যায়। যেমন–অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, সড়ক পথের বিস্তার ঘটেছে অনেক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়, আমদানি-রপ্তানি দুটোই বেড়েছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গার্মেন্টস বড় সাফল্য তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল মজুত তৈরি করেছে, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও মডেল অনেক বিস্তৃত হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, মোবাইল ইন্টারনেট শহর-গ্রামে যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে পেশাগত ও অর্থনৈতিক নতুন নতুন সুযোগ বেড়েছে, জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অনেক; যদিও মানুষের যথেষ্ট এবং নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হয়নি। মানুষের সচলতা বেড়েছে।

এ সমৃদ্ধির গতি ও ধরনের কারণে প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হয়েছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এর সামাজিক ও পরিবেশগত খেসারতও বেশি। নদীনালা, খালবিল, বন শিকার হয়েছে দখল ও বিপর্যয়ের। বৈষম্য বেড়েছে। এ সময়কালেই দেশে একটি অতি-ধনিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত চোরাই টাকার মালিকদের বিত্ত এবং দাপট বেড়েছে বহু গুণ। ঢাকা শহরে এখন একই সঙ্গে বিত্তের জৌলুস এবং দারিদ্র্যের নারকীয়তা দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে। চোরাই কোটিপতির সংখ্যা যখন বেড়েছে তখন মাথাগণনায় দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা বা কোনোভাবে টিকে থাকার আয়সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা চার কোটির বেশি। যদি দারিদ্র্যসীমায় শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই অমানবিক জীবনে আটকে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যতসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। দেশে তাদের কর্মসংস্থান নেই। বিদেশেও তাদের জীবন ও জীবিকা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। অন্যদিকে এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ হলেও তা কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক ও নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।

কয়েক দশকে নারীর দৃশ্যমান সচলতা স্পষ্টতই অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই নারী। শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও উপার্জনমুখী কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। গ্রাম-শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের শিশু ও নারীর অবস্থা তুলনায় আরও বেশি নাজুক। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করা, নারী ও শিশু পাচারের সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে একদিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর জৌলুস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিভীষিকা, একদিকে সম্ভাবনার বিকাশ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি দখলদারদের দাপটে জননিরাপত্তার বিপর্যয় একটি নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশকে নিক্ষেপ করেছে। দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে। তাদের বর্ম হিসেবেই ধর্ম ও ধর্মপন্থি গোষ্ঠী ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতাও এ সময়ে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক