যে সরকার ক্ষমতায় থাক তাকে গভীর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্যদূরীকরণ ইসুকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করতে হবে গণমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। যার লক্ষ্য হবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।...
বিশ্বায়নে দ্রুত বদলাচ্ছে পৃথিবী। শিক্ষা, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কর্মক্ষেত্র এবং ব্যবসাবাণিজ্য- সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার উচ্চ পারদ। নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবন মানুষের আজ একমাত্র আরাধনা। কিন্তু অসম সমাজব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলার ঝড়ে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। ফলে সংকটের পর্বতপ্রমাণ ঢেউ মানুষের মনে সৃষ্টি করছে অজানা আতঙ্ক। এমন স্পর্শকাতর প্রবাহে বেগ দিয়েছে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট। খাদ্যনিরাপত্তা মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। ১৯৯৬ সালে রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্বখাদ্য নিরাপত্তা ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ‘সব সময় প্রত্যেক ব্যক্তি নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাদ্য পান, তা নিশ্চিত করা।’ সহজ ব্যাখ্যায় সব সময় মানুষের পর্যাপ্ত, নিরাপদ, পুষ্টিকর খাদ্য, শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পাওয়ার সক্ষমতাই খাদ্যনিরাপত্তা।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ১ কোটি ৪৯ লাখ ২১ হাজার হেক্টর মোট ভূমির মধ্যে এখানে আবাদযোগ্য ভূমি ৮৮.২৯ লাখ হেক্টর। অর্থাৎ দেশে আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ ৫৯.৬ ভাগ। যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তথ্য-উপাত্ত সার্বিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে দেখা যায় ধান, পাট ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য এনেছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনে যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে আমাদের কৃষক সমাজ। পরিসংখ্যানগত সীমানা টেনে দেখা যায়, বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম, সবজি উৎপাদনে তৃতীয় এবং জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে বিশ্বের সপ্তম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঠভরা শস্য থাকার পরও বাংলাদেশে অনাহারী মানুষ তথা খাদ্যসুরক্ষা সংকটের বাস্তবতা বড় বেদনাময় ও উদ্বেগপূর্ণ। দেশে অনাহারী মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলছে দিনের পর দিন। এ অনাহারী মানুষ শুধু খাদ্যহীন মানুষ নয়। খাদ্যহীন মানুষ অভুক্ত মানুষ। মানুষের অনাহার বলতে প্রধানত দু-ধরনের পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত করে। এক. অপর্যাপ্ত পুষ্টি (Undernourishment), যা খাদ্য গ্রহণে অপ্রতুল ক্যালরিকে বোঝায়। দুই. খাদ্যনিরাপত্তা সংকট (Food insecurity)। ‘গ্লোবাল হ্যাঙ্গার ইনডেক্স’-২০২৪ সালের পরিসংখ্যান থেকে দৃশ্যমান হয় দেশের মোট জনসংখ্যার ১১.৯ শতাংশ মানুষ মৌলিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে অক্ষম। সোজা কথায়, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ এ পর্যায়ে পড়ে। বিষয়টির আরও নিবিড় ব্যাখ্যায় বলা যায়, দেশের ১১.৯ জনের মধ্যে একজন মানুষ যথেষ্ট খাদ্যাভাবে ভোগে। অন্যদিকে ‘The state of food security and Nutrition in the World’ রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের ৫২,৭ মিলিয়ন (প্রায় ৫ কোটি ২৭ লাখ) মানুষ খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে আছে। এ শ্রেণির মানুষের তালিকার মধ্যে ১৮.৭.মিলিয়ন লোক মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত।
২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ মিলিয়নের অধিক মানুষ খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের সীমানার মধ্যে। খোলা চোখে দেখলে তা মোট জনসংখ্যার ৩০ থেকে ৩১ শতাংশ। আবার জাতীয় জরিপ ও IPC (Integrated Food Security Phase Classification) বিশ্লেষণ বলছে, ১৬ মিলিয়ন ১.৬ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মধ্যে পড়ার সম্ভাবনায় রয়েছে। ভয়ানক কথা হলো, এই মানুষদের মধ্যে ৩.৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীন (acute food insecurity) পর্যায়ে আছে। যারা সহায়তা না পেলে জীবন্মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে খুব দ্রুত। পূর্ণবয়স্ক লোক থেকে শিশুদের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, দেশের ২৩.২৩.৬ শতাংশ ৫ বছরের কম বয়সী শিশু দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টির অভাবে আছে। বিস্ময়কর ব্যাপার বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। অথচ দেশে এই মানুষের দুর্দশার শেষ নেই। কিন্তু কেন কৃষকদের এ দুরবস্থা? এর উৎসের খোঁজে পেছনে নজর দিলে বর্তমান কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে অতীত অবস্থার বিস্তর পার্থক্য দৃশ্যমান হয়। ’৬০-এর দশকে কর্মসংস্থাপিত জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৮০ জন কৃষি শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৭০-এর দশকে তা ২ শতাংশ কমে ৭৮ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৮০-এর দশকে শিল্প ও সেবা খাত বাড়লেও বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ১৯৮১ সালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ কৃষিতে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশ কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৩৫ থেকে ৪৫ ভাগ এখন কৃষি কাজে নিযুক্ত রয়েছে। সহজসরল এ মানুষগুলো অতীতে শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়; সমাজ বাস্তবতায় সব অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধেও ছিল সদা সোচ্চার।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে কৃষকদের সংগ্রামের উজ্জ্বল প্রান্তগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘দধীচির চেয়ে বড় সাধক’ এ কৃষক সমাজ (১৮৭৩-১৮৭৬) পাবনার কৃষক আন্দোলন, ১৮৭২-১৮৭৫ সালে বরিশালের তুষখালী আন্দোলনকে সংঘটিত করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর ৭০ দশকের এই কৃষক সমাজের আন্দোলনের চাপেই ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নে বাধ্য হয়েছিল। কৃষকদের সম্মিলিত শক্তিতেই টঙ্ক আন্দোলন (১৯৩৭), তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-৪৭) এবং নানকার বিদ্রোহ (১৯৪৯-৫১) সংঘটিত হয়। সেদিন ব্রিটিশ শক্তিকে দুর্বল করতে তাদের ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সেই পূর্বসূরিদের প্রগাঢ় ভালোবাসা ও শক্তির কারণে আজকের আমরা উত্তরসূরিরা আলোকিত। আফসোস, কৃষকরা সে সময় জোরদার জমিদার কর্তৃক শোষিত হতেন, যা ছিল দৃশ্যমান। আর বর্তমান স্বাধীন দেশে এ নির্যাতনের চেহারা ও পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখন কৃষকের দুর্ভোগের নিকৃষ্ট নাম সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের কৌশলী হাত প্রতি পদে কৃষককে শোষণ ও বঞ্চিত করে চলছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও স্বাধীনতার পর থেকে তেমনভাবে কোনো সরকারই তাদের প্রতি খুব আন্তরিকতা দেখায়নি। কথা যতটুকু হয়েছে, তা কেতাববন্দিই থেকেছে বলা যায়। অথচ আজও দেশের ৪১ ভাগ কৃষি কাজে জড়িত মানুষের সেবার ওপর ৮০ ভাগের মতো মানুষ নির্ভরশীল হয়ে আছে। লক্ষণীয়, এ দেশে প্রথম জাতীয় কৃষিনীতি প্রণীত হয় ১৯৯৯ সালে। কৃষক ও কৃষির প্রতি দেশের সরকার ও শিক্ষিত মানুষ কতখানি সদর্থক তা নিম্নের কয়েকটি বাক্য রেখায় স্পষ্ট। দেশের মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু সমাজের এলিট ব্যক্তিরা সমাজে নিজদের নানাভাবে তুলে ধরেন। নানা বিষয় নিয়ে সেমিনার, টকশো করেন। কিন্তু কৃষকদের নিয়ে কেউ কল্যাণকর কোনো উদ্যোগ কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন না। তাদের সবার কাছে কৃষিনীতি শুধু উৎপাদনমুখী। উৎপাদন বৃদ্ধিই তাদের মূল লক্ষ্য। অথচ উৎপাদনের পেছনের মানুষদের নিয়ে তাদের কোনো নীতি ও ভাবনা নেই। সবার ভাবনা শুধুই বাড়তি মুনাফার দিকে।
কৃষক যেখানে নিতান্তই হীন ও গৌণ। পুঁজিবাদের শক্তির কাছে কৃষক আজ ভুলেই গেছে সে কৃষক। মতলববাজদের নানা ফিকির তাদের নানা ঘোরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করছে অহর্নিশ। এমনি প্রতিকূল ও বিপত্তিকর প্রতিবেশে এ দেশে গ্রামের সাধারণ মানুষ নিরন্ন ও হাহাকার দিন পার করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ মতে, গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার তিনবেলা খাবার নিশ্চিত করতে পারে না। শহরের দিনমজুরেরও একই দশা। ইউনিসেফের রিপোর্ট মতে, পাঁচ বছরের নিচের ১৮ শতাংশ শিশু এখানে খরবাকৃত। এবং ১০ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। সুরক্ষাহীন কর্মসূচির বাইরে থেকেও এ দেশের কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য। ফলে উৎপাদনে সাফল্যের চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। আগের ও বর্তমান উন্নয়নের পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে সংকট কত বিস্তৃত তা সহজেই উপলব্ধি হয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। এ বছর ২০২৫ শেষে তা ২১.২ শতাংশে উপনীত হয়েছে। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ। এতেই শেষ নয়, পরিস্থিতির ভয়ংকর ছবি হলো ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে। যারা সামান্য অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামবে যেকোনো মুহূর্তে। দেশের খাদ্যসংকট কখনো স্বস্তির বার্তা আনে না। খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে তাই সবাইকে সজাগ হতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী অপুষ্টি ও দারিদ্র্য বাড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা বাংলাকে রক্ষা করতে হলে কৃষি ব্যবস্থার প্রতি অধিক মনোযোগ দিতে হবে। কৃষি উৎপাদনের উৎসাহ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, জাতীয় কৃষিনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও যুগোপযোগী কৃষিনীতি প্রণয়ন করে শিগগিরই কৃষকদের যথার্থ মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য এটি কারও একক সমাধানে সম্ভব হবে না। দেশের কল্যাণে তাই যে সরকার ক্ষমতায় থাক তাকে গভীর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্যদূরীকরণ ইসুকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করতে হবে গণমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। যার লক্ষ্য হবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। তা না হলে আগামী বাংলাদেশের কৃষক ও মানুষের স্বস্তিময় জীবন সহজ হবে না কোনোক্রমেই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া
[email protected]


