মানুষ ফের পুরোনো রাজনীতি চায় না। তারা নেতৃত্ব চায়, দায়িত্ববোধ চায়, নৈতিকতা চায়, আধুনিকতার সঙ্গে দেশসেবার সমন্বয় চায়। এনসিপির তরুণরাই সেই চাহিদার সঠিক প্রতিক্রিয়া হতে পারেন। তারা যদি নিজেদের ভেতরের আগুনটাকে সঠিক দিকে প্রবাহিত করতে পারেন, তবে তাদের থামানোর শক্তি কোনো সিস্টেম, কোনো অপপ্রচার, কোনো পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ই রাখতে পারবে না।...

জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে যে তরুণ ছাত্রনেতারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদেরই হাতে গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দলটি জন্ম নিয়েছে এক দমবন্ধ করা সময়ের বিরুদ্ধে, যেখানে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রকে গ্রাস করে নিয়েছিল এবং মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো ছিল শৃঙ্খলিত। সেই অন্ধকার ভেদ করে যারা স্বাধীনতার বাতাস ফিরিয়ে এনেছিল, তারা নিছক ছাত্রনেতা নন, তারা ছিলেন সময়ের সাড়া, মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি এবং প্রতিরোধের মুখপাত্র। তাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে থাকা সাধারণ মানুষ মনেপ্রাণে চান এই তরুণ নেতৃত্ব সফল হোক, বড় হোক, দেশের রাজনীতিতে দায়িত্ব নিক। কিন্তু সে প্রত্যাশিত সাফল্য পুরোপুরি ধরা দেয়নি। এর পেছনে আছে অপপ্রচার, পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো এবং সিস্টেমের গভীরে থাকা বহুস্তরীয় প্রতিরোধ। পথটা যত কঠিনই হোক এই তরুণ তুর্কিদের যাত্রা থামার নয়। বরং তাদের প্রতিটি ধাপ ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরির ভিত্তি।
ফ্যাসিস্ট আমলে যেসব লোকবল রাষ্ট্রযন্ত্র, ক্ষমতা ও সুবিধার স্রোতে ভেসেছিল, তারা আজও এনসিপি ও এর নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যস্ত। অপবাদ, গুজব, অসত্য প্রচারণা- এসবই তাদের প্রধান হাতিয়ার। পতিত স্বৈরশাসকের সমর্থকরা নিজেদের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি; তাই তারা আজও এনসিপি-বিরোধী প্রচারণাকে টিকে থাকার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক বলয়, যারা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে ভয় পায়, কারণ তারা জানে এই তরুণরা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বহু দশকের ক্ষমতা-দখল, সুবিধাভোগ ও স্বজনপ্রীতির রাজনীতি ভেঙে পড়বে। ফলে সিস্টেম নিজেই একসময়কার ছাত্রনেতাদের পথ রুদ্ধ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
এসব বাধা সত্ত্বেও একটি সত্য অটুট থেকে গেছে- জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে এই তরুণরা জনগণের সামনে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তারা ভয় পাননি, পিছিয়ে যাননি, পালিয়ে যাননি। দেশের সংকটময় মুহূর্তে তারা ছিলেন মানুষের পাশে, ছিলেন রাস্তায়, ছিলেন সংগ্রামের কেন্দ্রে। আজকের রাজনীতিতে এ চরিত্রই সবচেয়ে জরুরি- শিক্ষিত, সাহসী, সৎ এবং আত্মত্যাগী নেতৃত্ব। কারণ বাংলাদেশ বহুদিন ধরে নেতার অভাবে নয়, নেতৃত্বের মানসিকতার অভাবে ভুগছে। রাজনীতিতে নতুন রক্তের সঞ্চালন এখন শুধু প্রয়োজন নয়, এটি জরুরি হয়ে পড়েছে।
দ্রুত সাফল্যের প্রয়োজন নেই। বরং দ্রুত সাফল্য রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রাজনীতির পথ দীর্ঘ, কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ। সেখানে শর্টকাট বলে কিছু নেই। জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক সংগঠন, মতাদর্শগত পরিপক্বতা- এসব গড়ে উঠতে সময় লাগে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে প্রথমবার বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পরই তিনি মানুষের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, কিন্তু রাজনীতিতে তার সাফল্য আসতে ২২ বছর সময় লেগেছিল। অথচ তার জনপ্রিয়তা কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল না। তিনি সেই দীর্ঘ সময়ে অপমান, ব্যর্থতা, সংগ্রাম, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র সবকিছু সয়ে গেছেন। ব্যর্থতাকে ভয় করেননি, বরং প্রতিটি বাধাকে নিজের প্রস্তুতিতে পরিণত করেছেন। শেষে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
এনসিপির তরুণ নেতাদেরও ঠিক এমন দীর্ঘ শ্বাস, এমন প্রস্তুতি, এমন ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে। তাদের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছে ইতিহাসের এক গৌরবময় মুহূর্ত থেকে, তাই দায়িত্বও ততটাই ভারী। এ যাত্রা ইচ্ছে করলেই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না; বরং প্রতিটি ধাপকে পরিপক্বতা, দূরদর্শিতা, নৈতিকতা ও আত্মত্যাগে শক্ত করতে হয়। জনগণ সবসময় তাদের পাশে থাকতে চায়- শুধু বিশ্বাসের জায়গাটা আঁকড়ে রাখার প্রয়োজন।
এনসিপির এ তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য কিছু প্রেরণাদায়ী সত্য আজ স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। প্রথমত, সততা হতে হবে রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি। জনগণ সবকিছু ভুলে যেতে পারে, কিন্তু অসততা কখনো ভোলে না। দ্বিতীয়ত, সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নয়, সংগঠনকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। তরুণদের বিকাশের সুযোগ দিতে হবে, মতের বৈচিত্র্যকে স্থান দিতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়, মতাদর্শে দাঁড়াতে হবে। মতাদর্শই দিক দেখায়, সংকটের সময় ভরসা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে আকৃষ্ট করে। চতুর্থত, জনগণের মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। অপপ্রচার, ব্যর্থতা, বিশ্বাসঘাতকতা- এসব রাজনীতির সঙ্গী। এগুলোর সামনে স্থির থাকা নেতার পরিচয়।
আরও প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে সঠিকরূপে যোগাযোগ রক্ষা করা। বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্ব সম্পর্কে যে বিকৃত ছবি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে, তার জবাব দিতে হবে যুক্তি, তথ্য ও কূটনৈতিক দক্ষতায়। রাজনৈতিক বিবর্তনের নতুন ইতিহাস রচনার জন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। কর্তৃত্ববাদী শাসন, বহিরাগত প্রভাব, গণতন্ত্রের সংগ্রাম- এসব বিষয় আজ রাজনীতির পাঠ্যবইয়ের মতো প্রয়োজনীয়।
এদের জন্য আরও প্রয়োজন আত্মত্যাগ- একটি গুণ, যা বড় নেতা তৈরি করে। আত্মত্যাগ মানে অন্যদের জন্য নিজের স্বার্থকে পেছনে রাখা, দেশের জন্য ব্যক্তিগত আরামের অনেক কিছু ত্যাগ করা, আদর্শকে বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্তে প্রয়োগ করা। যে নেতা মানুষের জন্য নিজের আত্মিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়তে প্রস্তুত নয়, তার পেছনে জনগণ দীর্ঘদিন থাকে না। আর বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা এ শক্তিটাই নিজেদের মাঝে রাখে, এটিকে আরও শাণিত করতে হবে।
এনসিপির তরুণ তুর্কিরা যদি শিক্ষা, সাহস, সততা ও আত্মত্যাগের চার স্তম্ভকে নিজেদের মূল শক্তি হিসেবে ধরে রাখতে পারে, তবে তাদের সফল হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। রাজনৈতিক যাত্রা কখনো সরলরেখা নয়, এটি ওঠানামার মতো, ঢেউয়ের মতো, পাহাড়ি পথের মতো। পথটি মজবুত হলে, মন পরিষ্কার হলে, লক্ষ্য স্পষ্ট হলে এবং মানুষের আস্থা অর্জিত হলে সময়ই ইতিহাসের প্রমাণ দেয়। এ তরুণ নেতৃত্ব ইতিহাসের সঙ্গেই পথ হাঁটছে, তাই আশার জায়গাটি আরও উজ্জ্বল।
বাংলাদেশের রাজনীতি বহুদিন ধরে অচলাবস্থা, অবিশ্বাস, ক্ষমতার দম্ভ ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের ক্ষয়িষ্ণু নেতৃত্বে আটকে আছে। এখন প্রয়োজন নতুন স্বপ্ন, নতুন দিকনির্দেশনা, নতুন মানুষ, নতুন রাজনীতি। এনসিপির তরুণ নেতৃত্ব সে সম্ভাবনারই স্ফুলিঙ্গ। তারা যদি নিজেদের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে, অপপ্রচারে না দমে, ধৈর্য ধরে এগিয়ে যায়- তবে তারা শুধু সফল রাজনৈতিক নেতা নয়; দেশের ইতিহাসে নতুন রাজনৈতিক ধারার রূপকার হয়ে উঠবে।
আজ মানুষের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট- তারা ফের পুরোনো রাজনীতি চায় না। তারা নেতৃত্ব চায়, দায়িত্ববোধ চায়, নৈতিকতা চায়, আধুনিকতার সঙ্গে দেশসেবার সমন্বয় চায়। এনসিপির তরুণরাই সেই চাহিদার সঠিক প্রতিক্রিয়া হতে পারেন। তারা যদি নিজেদের ভেতরের আগুনটাকে সঠিক দিকে প্রবাহিত করতে পারেন, তবে তাদের থামানোর শক্তি কোনো সিস্টেম, কোনো অপপ্রচার, কোনো পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ই রাখতে পারবে না। তাদের সাফল্যের পথ হয়তো দীর্ঘ, কিন্তু তা অবশ্যম্ভাবী। কারণ সময় এখন নতুন নেতৃত্বের।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক
[email protected]


