ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা যাতে সঠিকভাবে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। সাধারণ মানুষ যেখানে যেতে পারে না, সাংবাদিকরা সেখানে বিনা বাধায় যেতে পারেন। ফলে তাদের পক্ষে বিভিন্ন অসংগতি ও অনিয়ম খুঁজে বের করা সহজ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী প্রচার চালানো হতে পারে। সে মিথ্যা প্রচারের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে মূলধারার প্রচারমাধ্যমকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতাসীন হোক না কেন, তারা যাতে জনগণের স্বার্থপরিপন্থি কোনো কাজ করতে না পারে, সেজন্য সংবাদপত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালীন পুরোটা সময় দেশের সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আগামী দিনেও সংবাদপত্র জনগণের অধিকার সুরক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। ২০০৮-এর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো অংশগ্রহণমূলক ছিল না। কারণ সাধারণ ভোটাররা এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, অথবা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই অংশগ্রহণ করেছিল। তাই বলে সে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে না। কারণ ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। একটি রাজনৈতিক দল, নির্বাহী আদেশে যার কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে, তারা কীভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে।
উপমহাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। রাজা রামমোহন রায়ের আর্থিক সহযোগিতায় ১৮১৮ সালে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। পরে ‘সমাচার দর্পণ’ নামে আরও একটি পত্রিকা বের হয়। বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রথম বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে। কাঙ্গাল হরিনাথ কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল ইংরেজ ও স্থানীয় জমিদারদের নানা অন্যায় কর্ম তুলে ধরা। এরপর একের পর এক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা হচ্ছে দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক। স্বাধীনতা আন্দোলনকে গতিশীল ও চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এ দুটি পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা মিলিয়ে সহস্রাধিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। আজকের দিনে পত্রিকার সংখ্যা বেশি না কম সেটা যত না বিবেচ্য বিষয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পত্রিকাগুলো কতটা দায়িত্বশীলতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারছে।
সব পেশায়ই নিরপেক্ষতা এবং নিয়মিত চর্চার কোনো বিকল্প নেই। আর তা যদি হয় সাংবাদিকতা তাহলে তো কথাই নেই। কথায় বলে, সাংবাদিক, শিক্ষক ও আইনজীবী- এই তিনটি পেশায় সর্বোচ্চ সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এই তিনটি পেশাজীবীদের কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই।
প্রতিটি সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সত্য তুলে ধরা। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে এর প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা। তারা পাঠকদের মনে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা আছে, যারা অন্য গোষ্ঠীর পত্রিকার বিরুদ্ধে নানাভাবে কুৎসা রটনা করে থাকে। আমি আশা করি, ন্যায় ও সত্যের পথে আগামীদিন সংবাদপত্র এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।...
বর্তমান সমাজে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের কোনো বিকল্প নেই। সংবাদপত্র হচ্ছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। সংবাদপত্র ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না। সংবাদপত্রের উপস্থিতি ছাড়া স্বাভাবিক জীবন কল্পনা করা যায় না। সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ বা আয়না। আয়না যেমন সামনে দৃশ্যমান যেকোনো বস্তুর অবয়ব সঠিকভাবে তুলে ধরে, সংবাদপত্রও ঠিক তেমনি একটি সমাজের ভালোমন্দ নির্মোহভাবে প্রকাশ করে। আধুনিক বিশ্বে সংবাদপত্রকে ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্ন করাই হচ্ছে একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাজ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যাবতীয় অন্যায় ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখাই হচ্ছে সংবাদপত্রের প্রধান কাজ। গণতন্ত্রের প্রধান রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবাদপত্র। যে দেশের সংবাদপত্র যত স্বাধীন, সেই দেশ তত গণতান্ত্রিক ও আধুনিক বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
সংবাদপত্র একটি দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। স্বাধীন সংবাদপত্র একটি দেশের সংবিধান ও স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে; বিশেষ করে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য এবং অবিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অসংগতিগুলো আমরা পত্রিকার মাধ্যমেই জানতে পারি। দেশ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহু প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের রাজনীতি এখন নির্বাচনমুখী হয়ে পড়েছে। আগামী নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রচারমাধ্যম যদি নির্মোহভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই অসৎ পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব হবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ বিঘ্নিত করার লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য মহলবিশেষ পরিকল্পিতভাবে চেষ্টা চালাতে পারে। কারা কীভাবে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে, তা সাংবাদিকরা তুলে ধরে প্রশাসনকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের অপপ্রচার আরও বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হচ্ছে। মূলধারার পত্রিকাগুলো এসব অপপ্রচারের বিপরীতে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে সকারকে সহায়তা করতে পারে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভোটাররা যাতে উপযুক্ত প্রার্থীকে তাদের ভোট দেয়, সে ব্যাপারে পত্রিকাগুলো জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রতিটি সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সত্য তুলে ধরা। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে এর প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা। তারা পাঠকদের মনে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা আছে, যারা অন্য গোষ্ঠীর পত্রিকার বিরুদ্ধে নানাভাবে কুৎসা রটনা করে থাকে। আমি আশা করি, ন্যায় ও সত্যের পথে আগামীদিন সংবাদপত্র এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

