‘আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসন না করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর বার্তা’ দিলেও সেই নির্দেশনা মানছে না জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল।
হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ তাঁতী দলের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে পদ পেয়েছেন ওলামা লীগের সহসভাপতি। এ ছাড়া ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, মহানগর-জেলার কমিটি একাধিকবার গঠন, পদ-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। তাদের অনিয়মের চিত্র তুলে একটি অভিযোগপত্র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর জমা দিয়েছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা।
তাদের অভিযোগ, যেকোনো সংগঠনের কমিটি একবারই মহানগর বা জেলা কমিটি দিতে পারে। কিন্তু তাঁতী দলের বর্তমান কমিটি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই দুবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটি দিয়েছে। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তাদের অভিযোগপত্র আমি হাইকমান্ডে পাঠিয়েছি। তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই চলছে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও করছে একে-অপরের বিরুদ্ধে।’
চিঠিতে বলা হয়, ত্যাগীদের বাদ দিয়ে গোপনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটিতে অসাংগঠনিক নেতা ও আওয়ামী লীগের দোসরদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। ঘোষিত কমিটির সদস্যসচিব আবুল কাশেম পাটোয়ারী বিগত সময়ে তেমন কোনো কর্মসূচিতে ছিলেন না। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নয়াপল্টনের চায়না টাউন মার্কেটের সেক্রেটারিও ছিলেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে থাকা তার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তবে আবুল কাসেম পাটোয়ারী খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদি তারা প্রমাণ দিতে পারেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি বা কর্মসূচিতে হাজির হয়নি, তাহলে সাদরে পদত্যাগ করব।’ ২০১৪ ও ২০১৬ সালে কারাগারে ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও দাবি করেন।
কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সাইফুল ইসলাম ওলামা লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। সেখানে তার নাম (হাফেজ মাওলানা) কাজী সাইফুল ইসলাম। ২০০১-০৬ শাসনামলে তাঁতী দলে সম্পৃক্ত থাকলেও ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকেই বিএনপিবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা তার নাম না। এই নামে আরও অনেক লোক রয়েছে। সংগঠনের সভাপতি ও সেক্রেটারিকে বিষয়টি আমি জানিয়েছি। মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা মেলাতে পারলে আমি পদত্যাগ করব। পেশাগত কারণেই মিটিং-মিছিলে মাঝে মাঝে গিয়েছি।’
এ ছাড়া তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে সংগঠনে যোগ দিয়ে ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পেয়েছেন ঠিকাদার মো. আবু মুছা। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আনসার শিকদার ও মো. হানিফকে গত এক যুগে বিএনপির দুর্দিনে কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। কিন্তু এই সময়ে আনসার শিকদার সূত্রাপুর ও লালবাগ এলাকায় ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।
অথচ ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনের কার্যালয়ে পুলিশের ক্র্যাকডাউনের সময় গ্রেপ্তার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুল ইসলাম চার মাস কারাগারে থাকলেও কমিটিতে স্থান পাননি। সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বি এম শাহজাহান ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার পরও অদৃশ্য কারণে কোনো পদে রাখা হয়নি। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ তাঁতী দলের আগের কমিটিতে যারা যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন, তাদের বর্তমান কমিটিতে ওলটপালট করে জুনিয়রদের সামনে আনা হয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মঞ্জুরুল ইসলাম ও শামসুদ্দিনকে সদস্য করা হয়েছে। অথচ শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
কমিটি ঘোষণার পর পকেট কমিটি ও আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে অব্যাহতি চেয়ে পত্র জমা দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আব্দুল আউয়াল সেন্টু, সদস্য মো. শামসুদ্দিন, মো. মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু। সম্প্রতি তাঁতী দলের শীর্ষ নেতাদের বহিষ্কারের দাবিতে নয়াপল্টনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পোস্টারিং করেছেন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তারা বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ইউনিটগুলোর কমিটি কাউন্সিলে করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ মহানগর দক্ষিণের ওই পকেট কমিটি গোপনীয়তার সঙ্গে রাতে প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ৯০ দিনের আহ্বায়ক কমিটির ‘বয়স’ এখন সাত বছর। এই সময়ে তাঁতী দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের বলয়কে আরও প্রসারিত করেছেন, পদ-বাণিজ্য চালিয়েছেন প্রকাশ্যেই। বিস্তৃত করার পরিবর্তে তারা সংগঠনকে আরও সংকুচিত করেছেন। সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্যসচিব মজিবুর রহমানকে টাকা দিলে পদ মেলে, না দিলে পদ নেই।
পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন আজাদ। তবে অনেককেই তিনি পদ দেননি, তবে কারও টাকাও ফেরত দেননি। অর্থের লোভে এক জেলায় দু-তিনবার আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। শীর্ষ নেতাদের অনিয়ম-দুর্নীতি, কমিটি-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে বিভিন্ন সময়ে লিখিত আকারে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব লিখিত অভিযোগের কপি খবরের কাগজের হাতে রয়েছে।
জানা গেছে, নীলফামারী, ফরিদপুর, রাজশাহী মহানগর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুড়িগ্রামসহ অনেক জেলায় দু-তিনবার আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের তালিকা ওলটপালট করে জুনিয়রদের সামনে আনা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে পদ-পদবি ‘বিলিবণ্টন’ করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অনেক আগেই সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিন বাহার, নীলফামারীর সদস্যসচিব এনামুল হকসহ বেশ কয়েকজন।
তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিন মাসের শর্ত দিয়ে কমিটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিন বছর গেলেও কাজ করেনি। তাই সবার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কমিটি ভেঙে আবারও আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছি।’ যদিও সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি একবারই আহ্বায়ক কমিটি দিতে পারে বলে নিয়ম রয়েছে।
আজাদ বলেন, সদস্যসচিব আবুল কাশেম পাটোয়ারী মার্কেটের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাকে জোর করে র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত ছিলেন। আর কাজী সাইফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব কমিটি ভাঙা বা দেওয়ার আগে সব সময় পরামর্শ নেওয়া হয় না বলে জানিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির তাঁতীবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কমিটি দেওয়ার আগে সংগঠনের নিয়মনীতি ঠিকমতো ফলো করেনি। টাকাপয়সার লোভে যদি কেউ পদ-পদবি দিয়ে থাকেন তাহলে ক্ষতিকর। এতে দল ও নেতৃত্বের বদমান হচ্ছে। অচিরেই দুই পক্ষের সঙ্গে বসব।’ তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন করলে তো দলই কলঙ্কিত হয়। নেতৃত্বে বিকাশ ঘটায় না, বরং সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। আগামী দিনে দলের জন্য যারা ভূমিকা রাখতে পারবে, তাদের হাতে নেতৃত্বও দেওয়া হবে।’