বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি মূলনীতি পরিবর্তন বা সংবিধান পুনর্লিখনের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছেন দলটির নেতারা। তারা বলেছেন, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বৈরাচারবিরোধিতা; কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা বা বাহাত্তরের সংবিধানকে বাতিল করা নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, তাদের পক্ষে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হবে না।
মঙ্গলবার ( সকালে জাতীয় সংসদ এলাকার এলডি হলে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিয়ে সিপিবির নেতারা এসব কথা বলেন। এ সময় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথরেখা তৈরিতে সবার লক্ষ্য এক ও অভিন্ন।
বৈঠক শেষে সিপিবির সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের যে ৪টা মূলনীতি আছে, তারা (ঐকমত্য কমিশন) সেটা রাখেনি। সেখানে আমরা দ্বিমত করেছি। বলেছি, আমরা সংবিধান পুনর্লিখন চাই না।’ তিনি অভিযোগ করেন, ২৪’র গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা (স্বৈরাচারবিরোধিতা) থেকে সরকার দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ সেখানে মুক্তিযুদ্ধ, বাহাত্তরের সংবিধানকে বাতিল করতে হবে এমন কোনো বিষয় ছিল না। এগুলো পরে নিয়ে এসে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনকে সেই বিতর্কে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। তা না হলে এই কমিশনই বিতর্কের মধ্যে পড়ে যাবে।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিশনের সদস্যরা ও সিপিবির ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেন।
আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘বিতর্ক’ সৃষ্টি করায় সরকারের কড়া সমালোচনা করেন রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানকে বিতর্কিত করে জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জানান, সিপিবি মনে করে সুষ্ঠু ভোট আয়োজনই এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ। কাজেই সরকারের উচিত অতি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করে সবার আগে নির্বাচনি রূপরেখা করা। এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শুরুতেই এই সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কাউন্টার করেছে- যেমন ৪৭-এর ধারাবাহিকতায় ২৪। বিতর্কিত এসব ঘটনার ফলে জাতীয় ঐক্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের যে মূল আকাঙ্ক্ষা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ফ্যাসিবাদী ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা- তার কোনোটিই করা সম্ভব হচ্ছে না।’
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে এসেছি একটি সুষ্ঠু ভোট আয়োজনই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ’। আপনাদের ওইটাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এর বাইরে গেলে বরং সংকটে পড়তে পারেন। কাজেই একটি ভালো নির্বাচনের জন্য যা যা সংস্কার করা দরকার, সেসব করেই নির্বাচনি পথরেখাটা আগে করুন। যদি তারা এমন কতগুলো কঠিন কাজ করতে গিয়ে বিতর্কের সম্মুখীন হয়, তাদের পক্ষে একটা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সংকটে পড়তে পারে। প্রত্যাশা করব, আপনাদের মাধ্যমে সরকার এ কাজটিকে (নির্বাচন) প্রধান কাজ হিসেবে নেবে।’
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন মত থাকলেও অনেক বিষয়ে একমত হওয়ার আশা রয়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথরেখা তৈরিতে সবার লক্ষ্য এক, অভিন্ন। নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষা, ক্ষমতা সমতার নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামেরই অংশ। আশা করি কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকবে, তার পরও অনেক বিষয়ে আমরা একমত হতে পারব।’
দেশের বিরাজমান প্রেক্ষাপটে সিপিবির ভূমিকার প্রশংসা করে ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘আজকে রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাসের জন্য যে আলোচনা, সংস্কারের জন্য যে আলোচনা তা আপনাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের একটা অংশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথ তৈরি করতে ঐকমত্য কমিশন চেষ্টা করছে। ঐকমত্য কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় সনদ। যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি হবে, তার একটা ধারণা পেতে পারি, একটা পথ চিহ্নিত করতে পারি। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছি।’ সংস্কার ও সনদ চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চান ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি।
গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে দুই ধাপে ১১টি কমিশন গঠন করে। এরপর কমিশনগুলোর সুপারিশ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এরপর ৫টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর ওপর ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়ে মতামত জানতে চায় কমিশন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৪টি দল তাদের মতামত জানিয়েছে। আর গতকাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ের সংলাপে অংশ নিয়েছে সিপিবিসহ ৩২টি দল। আমন্ত্রিত রাজনৈতিক দলগুলোকে গত ২০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া কমিশনের এই বৈঠক শেষ হবে ১৫ মে। এরপর পুনরায় দ্বিতীয় ধাপে দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত রয়েছে ঐকমত্য কমিশনের।