লাল ফিতা সংস্কৃতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ব্যবসাবান্ধব রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে লাল ফিতা সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে। জনগণের আমানতের বোঝা বহন করা কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। ক্ষমতায় গিয়ে যেন কারও সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, আত্মীয়-স্বজন যেন রাতারাতি ধনী না হয়–এই সংস্কৃতিও ভাঙতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ‘সমৃদ্ধির সংলাপ: বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন’ কি-নোট উপস্থাপন করেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমির অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।
জামায়াত আমির বলেন, “ঘুষকে ‘স্পিড মানি’ নামে বৈধ করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই শিল্প খাতকে প্রথম ধাক্কা দেয়। নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালু করা না গেলেও ব্যাংকঋণের সুদ চলতে থাকে। এতে উদ্যোক্তা শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ পরিস্থিতি চিরতরে বদলাতে হবে।”
তিনি বলেন, ‘দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কেন–রাষ্ট্রকে আগে এই প্রশ্নের সমাধান করতে হবে।’
তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিকে শিল্পমালিকদের প্রধান তিনটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন জামায়াতের আমির।
বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘সম্মানের সঙ্গে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হবে। উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং জাতির কল্যাণ। যারা অর্থ ফেরত দেবেন, রাষ্ট্র তাদের আরও সম্মান দেবে। ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত একত্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে চাই।’
নারীদের কর্মক্ষেত্র নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহতাআলা নারীদের কিছু বিশেষ গুণ দিয়েছেন, যা পুরুষদের নেই–সন্তান ধারণ, বুকের দুধ পান করানো ও মাতৃত্বের দায়িত্ব। তাই সমাজে মায়েদের সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। একজন মা গর্ভধারণ করেন, দুই থেকে আড়াই বছর সন্তানকে দুধ পান করান এবং এরপর আবার আট ঘণ্টার কর্মজীবনে যুক্ত হন। এই সময় তার জন্য স্বস্তিকর কর্মপরিবেশ প্রয়োজন। অনেক মা সন্তান রেখে দীর্ঘসময় বাইরে থাকতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন ব্যবস্থা করা, যাতে মা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এবং সন্তানের ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখে; কিন্তু উদ্যোক্তা দক্ষতা না থাকায় সেই অর্থ তুলে দেওয়া হয় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের হাতে। একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সুস্থ থাকলেও পরবর্তী সময়ে একের পর এক সংকটে পড়ে শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাত।’
শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিল্পকে শ্রমিকের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে এবং মালিকদের শ্রমিকদের সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে।’
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা ভুল করলে তিনি প্রকাশ্যে অপমান না করে আলাদাভাবে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন।
সভায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, এ কে আজাদ ও মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বারভিডার সভাপতি আব্দুল হকসহ আরও অন্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।