আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোট। সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে পরিবর্তন হবে সংবিধান। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
নির্বাচন ও গণভোট একই দিন একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সরকার গঠন ও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, এই দুই প্রশ্নে একসঙ্গে রায় দিবেন ভোটাররা। প্রথমবারের মতো কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগকালে অল্প সময়ের জটিল মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছেন এদেশের ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জিং হলেও সাংবিধানিকভাবে বৈধ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। এদেশের জনগণের জন্য এ ধরনের ভোটে এভাবে অংশ নেওয়া এই প্রথম। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব ভোটকেন্দ্রে একই সঙ্গে দুটি ব্যালট সরবরাহ করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রতীকভিত্তিক ব্যালট এবং সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে পৃথক ‘হ্যাঁ/না’ ব্যালট।
ইসির দাবি, ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে কেন্দ্রভিত্তিক আলাদা বুথ ব্যবস্থাপনা, নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক ব্যানার রাখা আছে স্থানীয় বিভিন্ন অংশে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ভোটের ফলাফল প্রকাশে এবার কিছুটা বাড়তি সময় লাগতে পারে।
রাজধানীকেন্দ্রিক সচেতন ভোটাররা একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
তাদের মতে, দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় এটি নতুন দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে। তবে সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্বে দুই ভোটের রায় একসঙ্গে দেওয়ায় জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি মনে করছি ভোট ভালোভাবে অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটের বিষয়ে সাবেক এই সচিব বলেন, সরকার বা নির্বাচন কমিশন ভোটারদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার করতে না পারলেও অল্প-বিস্তর পেরেছে। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। আবার সংবিধান গায়ের জোরে পরিবর্তন করা যাবে না, এমন হাল্কা বিষয়গুলো মানুষ বুঝেছে। তাই বিস্তারিত না জানলেও কিছুটা জানে ভোটাররা। তারা দল এবং প্রার্থী নির্বাচনে ভোট দেবে।
পাশাপাশি গণভোটেও দলীয় প্রচ্ছন্ন একটি প্রভাব থাকবে। তারপরও কিছু এদিক-সেদিক হতে পারে। আর ভোটারদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব খুব বেশি পড়বে না। জামায়াত সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করেছে। আর বিএনপি ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ এর মাঝামাঝি। তবে দলটির নেতারা বেশ কয়েকবারই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে রায় দেওয়ার কথা বলেছেন। এদিকে ফ্লোটিং (ভাসমান বা রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে) ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারা দল বা প্রার্থী নির্বাচিত করলেও গণভোটে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে সাধারণ ভোটারদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব যে একেবারেই পড়বে না বিষয়টা তেমন নয়।
মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অবাধ ও সুষ্ঠুভোট আয়োজনে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আছে বাড়তি নিরাপত্তা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা, মোবাইল কোর্ট ও পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি জটিল। এ নিয়ে জনমত যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে দীর্ঘ আলোচনা, উন্মুক্ত বিতর্ক প্রয়োজন ছিল।’ তিনি বলেন, মনস্তাত্ত্বিক চাপ না হলেও, প্রার্থী নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার, এই দুই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে ভোটারের সময় লাগতে পারে।
কারণ ভোটারের বেশি আগ্রহ থাকবে সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী নির্বাচনে। আর সরকার তাদের প্রচারে সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি পৌঁছাতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। তবে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মানুষ এবং এর আশপাশেই ফেস্টুন-ব্যানার দিয়ে প্রচারটা বেশি ছিল বলে আমার মনে হয়। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে সাবেক এই সচিব বলেন, যেমন আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি ভাত, মাংস, ডাল পছন্দ করেন? আমার উত্তরের জন্য পছন্দ রাখা হলো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। হতে পারে আমি ভাত এবং ডাল পছন্দ করি। কিন্তু মাংস পছন্দ করি না, মাছ পছন্দ করি। এখন এর উত্তর আমি কি দেব? এখন যদি ‘হ্যাঁ’ বলি তাহলে ভাত, মাংস, ডাল, এই তিনটা পছন্দ করি। আর ‘না’ উত্তর দিলে কোনোটাই পছন্দ করি না। বিষয়টা কি এমন? প্রশ্ন রাখেন সরকারের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা।