ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গণপিটুনির শিকার তিন ডিবি সদস্য, উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি মেনে নাও, মেসি সেরা: রোনালদো নাজারিও কেইনের প্রেরণা এমবাপ্পে-হালান্ড কুমিল্লায় ধর্ষণকাণ্ড: গ্রেপ্তার শিবির নেতার পক্ষে দাঁড়ানো দুই এপিপির নিয়োগ বাতিল টাঙ্গাইলে প্রতিমন্ত্রী টুকুর নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ১ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র টাকার অভাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত, সহায়তার আবেদন রাজবাড়ীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ নেইমার ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ সাবেক মন্ত্রী হারুণ অর রশীদ অর নেই কুমিল্লায় মাদক মামলায় কারাবন্দি যুবদলকর্মীর মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু হাইতির বিপক্ষে নামার আগে ব্রাজিলকে সুখবর দিল ফিফা ওয়ালটন পিসিবিএ'র রপ্তানি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, গণপিটুনির শিকার তিন পুলিশ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়ের কারাগারে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ইইউর ১.৪ কোটি ইউরো অনুদান বিশ্বকাপে বড় ধাক্কা খেল আইভরি কোস্ট, কানাডার ভিসা পেলেন না ওয়াহি মাগুরায় নবজাতককে বিক্রি করলেন বাবা পরীমনিকাণ্ডে এডিসি সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসর এসএসসি ফল ঘোষণা ২০ জুলাই, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী কুড়িগ্রামে ১২ ঘণ্টা পর রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে জাবির কর্মচারীদের অবস্থান মানিকগঞ্জে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২ সিলেটে ৩৬ ঘণ্টায় ১২২.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড সংসদে মামুনুল হক প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার টঙ্গীতে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার নেপালের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি চায় বাংলাদেশ

‘জি হুজুর’ সংস্কৃতির বেড়াজালে মেধাবীরা হারিয়ে যায়

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:০৭ পিএম
‘জি হুজুর’ সংস্কৃতির বেড়াজালে মেধাবীরা হারিয়ে যায়
রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

যোগ্যতার বদলে আনুগত্যের মূল্যায়ণ যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, জাতিও হেরে যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, অধিকাংশ উর্ধ্বতনরা মেধাবীদের দূরে সরিয়ে রেখে—‘জি হুজুর’ তোষামদকারী, অদক্ষদের পাশে রাখে। এটাই আমাদের কর্মসংস্কৃতির এক নির্মম বাস্তবতা। মেধা, সৃজনশীলতা কিংবা সততার চেয়ে এখন অনেক জায়গায় প্রভাব, চাটুকারিতা, ‘আমার কথায় হ্যাঁ বলবে’ মনোভাবটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর ফল কি ভালো হয়? একেবারেই না। অফিসে দক্ষরা নিরুৎসাহিত হয়, তোষামদকারীরা পুরস্কৃত হয়, আর প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক অবস্থান ক্রমেই তলানিতে নেমে যায়।

অধিকাংশ অফিসে চোখ রাখলে আমরা প্রায়ই একই চিত্র দেখি। যিনি প্রশ্ন করেন, উন্নতির প্রস্তাব দেন, সঠিক পথে কাজ করতে চান—তাকে কাজের ভালো সুযোগ দেওয়া হয়না, দূরে রাখা হয়। অন্যদিকে, যিনি 'জি স্যার, ঠিক বলেছেন স্যার' বলে মাথা নাড়েন, তিনিই উধ্বর্তনের অনেক প্রিয়। এমন কর্মসংস্কৃতিতে বুদ্ধিমান, সৎ ও উদ্যমী কর্মীরা ধীরে ধীরে প্রান্তে চলে যান।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন জন্ম নেয় ‘জি হুজুর’ সংস্কৃতি? এর মূলে আছে ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ ও অনিরাপত্তা। অনেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করেন, বুদ্ধিমান অধস্তন মানেই হুমকি। তারা ভয় পান, মেধাবী কেউ সামনে গেলে নিজের অবস্থান টলে যাবে। তাই তারা দক্ষদের দূরে রাখেন, আর পাশে রাখেন সেইসব মানুষকে, যারা তাদের ভুলও সঠিক প্রমাণ করতে পারে।

যে কর্মী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সময়মতো কাজ শেষ করেন, নতুন কিছু চিন্তা করেন, সে বরাবরই ‘অতি বোঝে’ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, যিনি দিনভর বসের সামনে ঘুরে বেড়ান, অফিসের ছোটখাটো বিষয়ে কিংবা কোন কারণ ছাড়াই ‘স্যার স্যার’ করে হেঁটে বেড়ান— তিনিই বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। 

এই সংস্কৃতি শুধু কর্মী নয়, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকেও পঙ্গু করে। কারণ, 'জি হুজুর' বলা লোকেরা কখনো ভুল ধরতে শেখে না; তারা কেবল মুখ রক্ষা করে চলে। এর ফলে, যোগ্যরা হারিয়ে যান, আর তোষামদকারীরা নীতি নির্ধারণের টেবিলে বসে যান।

এই সংস্কৃতি শুধু অফিস নয়, জাতির ভবিষ্যতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন একটি প্রজন্ম দেখে, 'মেধা নয়, সম্পর্কই সাফল্যের চাবি', তখন তারা আর পরিশ্রমে আগ্রহী থাকে না। দক্ষদের মধ্যে হতাশা, অফিসে নিষ্ক্রিয়তা, সমাজে দুর্নীতি, সবই এই মনোভাবের উপসর্গ।

তাহলে এই সমস্যার সমাধান কোথায়? প্রথমত, উধ্বর্তনদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যোগ্য ও সৎ কর্মীকে ভয় নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।কে কীভাবে কাজ করছে, তার পরিমাপ স্পষ্ট হতে হবে। এবং তৃতীয়ত, তোষামদ নয়, ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন করতে হবে।

যে উধ্বর্তন সাহসী পরামর্শকে মূল্যায়ন করেন এবং নিজের চেয়ে দক্ষ লোককে সঙ্গে রাখেন, তার প্রতিষ্ঠানই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়। 'জি হুজুর' সংস্কৃতি একদিনে জন্ম নেয়নি, একদিনে যাবেও না। তবে পরিবর্তনের শুরু হতে পারে যদি মেধা ও সততার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তাহলেই সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব, যেখানে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়, কাজের জন্য সবাই কাজ করবে।

লেখক: রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ভার্চুয়াল জুয়ার ফাঁদে সমাজ

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
ভার্চুয়াল জুয়ার ফাঁদে সমাজ
‎রিয়াজুল হক, লেখক

ছোটবেলায় কারক বিভক্তিতে পড়তাম, তাস খেলে কত ছেলে পড়া নষ্ট করে। একটা সময় ছিল, যখন 'জুয়া' শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত লুডু-ক্যারাম কিংবা তাসের খেলায় পাড়ার ছেলেদের আড্ডা। তখন জুয়া ছিল নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং সমাজেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে এসে জুয়া পেয়েছে ভার্চুয়াল রূপ। এখন মোবাইল ফোনেই বাজি ধরা যায়, কয়েক ক্লিকেই হারিয়ে যায় হাজার হাজার টাকা, আর চোখের পলকেই কেউ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই ভার্চুয়াল বা অনলাইন জুয়াই এখন বাংলাদেশে নতুন সামাজিক ব্যাধির চেহারা নিচ্ছে।

‎‎অনলাইন জুয়া বলতে ইন্টারনেট ব্যবহার করে বেটিং বা বাজির মাধ্যমে টাকা হারা কিংবা জেতাকে বুঝায়, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। অথচ বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া একটি নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে মধ্যবয়সি, চাকরিজীবী, প্রবাস ফেরত—অনেকেই এই জুয়ার কবলে পড়ে আজ সর্বস্বান্ত। কেউ পরিবার হারিয়েছেন, কেউ জেল খেটেছেন, আবার কেউ কেউ আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছেন।

‎‎তথ্যমতে, দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটগুলোতে ভিপিএন ব্যবহার করে সহজেই প্রবেশ করা যায়। আবার ব্যক্তিগতভাবে তৈরি কিছু মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেশীয় তরুণদেরও এই জুয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে। অনেক সময় কোনো পরিচিত বন্ধু বা অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার প্রলুব্ধ করে এই ফাঁদে ফেলছেন।

‎‎প্রথমে ছোট একটি বাজি, সামান্য একশ বা দুইশ টাকার খেলা। এরপর একবার যদি বড় অঙ্কের টাকা জেতার স্বাদ মেলে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে নেশা। এক পর্যায়ে মানুষ এটিকে আর খেলা মনে করে না, মনে করে আয়ের উপায়। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায়, লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি। মজার বিষয় হলো, জুয়াড়িরা প্রায় সব সময় মনে করে, :একবার জিতলেই উঠে আসব', কিন্তু সেটি আর হয় না। এভাবেই চলতে থাকে অন্ধকারে নিমজ্জনের এক অন্তহীন যাত্রা।

‎‎অনলাইন জুয়ার আসক্তির সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। অধিকাংশই পরিবারের কাছে লুকিয়ে খেলে থাকেন। দিনের পর দিন নিজের, পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে দেন। দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী টিউশনির টাকা কিংবা পরিবারের দেয়া পকেটমানি এই জুয়ায় ঢেলে দিচ্ছেন। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এর মানসিক দিকটাও ভয়াবহ। জুয়া খেলতে খেলতে যারা সব হারান, তাদের মধ্যে হতাশা, আত্মগ্লানি কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। অনেকে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, প্রতারণা কিংবা মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আমরা যদি একটু গভীরভাবে দেখি, তাহলে দেখব যে, অনলাইন জুয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। 

‎‎এই সমস্যা নিরসনে অনলাইন জুয়াকে একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে এ নিয়ে আলোচনা জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই ব্যাধি রোধ করা সম্ভব নয়।

‎‎সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২০ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া খেলা, জুয়া সংক্রান্ত অ্যাপ বা পোর্টাল তৈরি ও প্রচারণা চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের জন্য ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য। এছাড়া, ২১ ও ২২ ধারায় জুয়া সংক্রান্ত লেনদেন, প্রতারণা বা জালিয়াতিকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ।

‎‎অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এই বিষয়ে রিপোর্ট, আলোচনা, টক শো এবং ডকুমেন্টারি প্রচার করা উচিত। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের মাঝে অনলাইন নিরাপত্তা ও আসক্তির ক্ষতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি।

‎‎এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এখন আসক্তদের সেবা দেওয়া হয়, কিন্তু অনলাইন জুয়ার জন্য আলাদা কোনো নিরাময় সেবা নেই। এই বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা অনলাইন আসক্তি বুঝে এর যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারেন।

‎‎মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সহযোগিতা ছাড়া অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সাইটগুলো চিহ্নিত করে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা যেতে পারে।

‎‎মনে রাখা দরকার, অনলাইন জুয়া নামক সমস্যা কোনো ব্যক্তির একার নয়। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। অনলাইন জুয়া শুধু একজনের জীবন ধ্বংস করছে না, পুরো একটি প্রজন্মকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এখনই আমরা সজাগ না হই, সচেতন না হই, তাহলে এক সময় এই ডিজিটাল ব্যাধি আমাদের সামাজিক ভিত্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে উন্নয়নের জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়। মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটকে শত্রু নয়, বরং বন্ধু হিসেবে ব্যবহার করা শিখতে হবে। আর সেই শিক্ষাটা পরিবার, স্কুল, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দিতে হবে। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করি, তাহলেই এই অনলাইন জুয়া নামক সামাজিক ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নইলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ভয়ংকর মূল্য দিতে হবে।

‎রিয়াজুল হক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ১১:০৩ পিএম
আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি
জার্মানির ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

ছোট্ট দেশ কুরাসাওকে ৭-১ গোলে পর্যুদস্ত করার পর জার্মানি ফুটবল দল নবীন প্রজন্মের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আসবেই তো। নবীনেরা ভালো খেলা আর গোলের বন্যা দেখতেই ভালোবাসে যে!

২০১৪-এ ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করে জার্মানি। এর পর দুটো বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে তারা মোটোই ভালো করেনি। ফলে গত বারো বছর বিশ্বব্যাপী তেমন আলোচনাতেই ছিল না দলটি। ২০১৪ থেকে ২০২৬— এই একযুগে যে নবীন প্রজন্ম উঠে এসেছে, তাদের কাছে জার্মানি প্রায় অচেনাই। এই অচেনার আর একটি কারণ হলো, জার্মানি কথিত ‘স্টার’ নির্ভর দল নয়, ‘টোটাল টিম’ নির্ভর। ‘স্টার’ খেলোয়াড় দেখে লোকে যে দল চিনবে, এটাও হয়নি। জার্মানি ‘স্টার’ নির্ভর দল না হওয়ায় কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ছয়জনে সাত গোল দিয়েছে। অর্থাৎ যে-কেউ গোল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এই দলে। তারপরও দল এপর্যন্ত ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার, গের্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউস, মিরোস্লাভ ক্লোসের মতো বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাজারমুখী প্রচারের আলোয় তাঁরা পেলে, দিয়াগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, ক্রিস্টিয়ানো রোনালডো, লিওনেল মেসি প্রমুখের কাছাকাছি আসতে পারেননি।

আমি জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থক। ছোটো থেকেই। বুঝতে যখন শিখেছি, তখনই। এর দুটো কারণ। প্রথমত দলের ‘টিম স্পিরিট’; দ্বিতীয়ত বিশ্বসভ্যতায় জার্মানদের অবদান। আমার পছন্দের দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। ফ্রান্স, গ্রিস, ইংল্যান্ড ইত্যাদির কথাও বলতে পারেন। কিন্তু আমি যখন জার্মানিকে সমর্থন করি, তখন কার্ল মার্কস, আলবার্ট আইনস্টাইন, জোহানেস গুটেনবার্গ, ইমানুয়েল কান্ট, ফন গ্যেটে, ভান বেটোফেন প্রমুখের কথাই মনে এসেছিল। অন্যদের মতো তাঁরাও আমার স্বপ্নজগতের নায়ক ছিলেন। বিশ্বসভ্যতাকে কতটা এগিয়ে দিয়েছিলেন এই মহাত্মাগণ, অনুসন্ধানীমাত্রেই জানেন।

সে যাহোক; প্রথম কারণটিই ফুটবল দলের মূলশক্তি: টোটাল টিম স্পিরিটে পাওয়ার ফুটবল খেলা। জার্মানি দল সেটাই করে আর এখন আমি এটাই উপভোগ করছি।

১৯৮২ সালে আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। বাড়ির পাশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে গিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখেছি, সাদাকালো সেট। বড়োরা চেয়ারে বসে, আমরা ছোটোরা দাঁড়িয়ে। জায়গা নেই। তবু খেলা দেখব! আমার পক্ষপাত সমাজতান্ত্রিক পূর্বজার্মানির প্রতি। কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের দল নেই। আমি যখন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখি, তখন পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার ভালো লেগে যায়। দারুণ খেলেও সেবার পশ্চিম জার্মানি ইতালির কাছে ৩-১ গোলে বিশ্বকাপ ট্রফি হারায়। আসলে ইতালির পাওলো রসি নামের এক স্টাইকারের দক্ষতার কাছে হার মানে জার্মানি। রসি গোল্ডেনবুট পেয়েছিলেন। এই হার আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবু পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার মন কাড়ে।

আমাদের বাড়ির কেউ ফুটবলের সমর্থক ছিল না। খেলাধুলোর চেয়ে শিক্ষাসংস্কৃতির দিকেই ঝোঁক দেখেছি বাবার। তাই খেলাধুলোয় পরিবারের কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, এটা বলা যাবে না। নিজের কাছে যা ভালো মনে হয়েছে, সেটাই। আমাদের ছেলেবেলায় ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলই ছিল জনপ্রিয়। আমি নিজেও বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলেছি অনেক, ক্রিকেট খেলিনি। তাই ফুটবল ভালোবেসেছি গভীরভাবে। আমি আবাহনীর কী যে ভক্ত, তার প্রমাণ আছে এখনো। সালাউদ্দিন, আশিস, আসলাম, চুন্নু, এমিলিদের ভিউকার্ডগুলো দেখালেই বোঝা যাবে!

ছেলেবেলায় খেলার সময় আমাকে দলে নেওয়ার আগ্রহ থাকত বন্ধুদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বন্ধুরা শরীরের গড়ন অনুসারে তিনটি ফুটবল দল করে: মোটা, চিকন, মাঝারি। তাদের মধ্যে ফুটবল খেলা হয়েছিল। সেই খেলায় মাঝারি দলের হয়ে গোল করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে ফুটবল ‘সঙ্ঘ খেলা’; ক্রিকেট ততটা নয়। ক্রিকেটে একজনই দলকে জিতিয়ে দিতে পারে, ফুটবলে তা খুব কঠিন, অনেক সময় অসম্ভবও। জার্মানি সঙ্ঘবদ্ধভাবে ফুটবল খেলে। ১৯৮২-এর পর, ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ। তখন ২০ বা ২৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল আর ফিলিপ্স কোম্পানির সাদাকালো টেলিভিশন মধ্যবিত্তের ঘরে প্রচুর এসে গেছে, আমাদেরও। সে কারণে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ এর আগের যে কোনো বারের চেয়ে বেশি সংখ্যক বাঙালিরা দেখে। সে বারের খেলাতেও ভালো খেলল পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু তারা ফাইনালে ম্যারাডোনার কৌশলের কাছে ৩—২ গোলে হেরে যায়। ম্যারাডোনা ঈশ্বরকে কৃতিত্ব দিলেন আর আমি পর পর দুবার ফাইনালে ওঠা জার্মানির ‘পরম ভক্ত’ হয়ে গেলাম। সবাই তখন ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনা বলে চিৎকার করে; আমি জার্মানির জন্য কষ্ট পাই। দেখলাম, বন্ধুরা দলে দলে আর্জেন্টিনা হয়ে গেল। অনেকে ব্রাজিলের খেলারও হলো ভক্ত। আমি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালাম না।

এরপর চলে এল ১৯৯০-এর বিশ্বকাপ। তখন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রিত হবে বলে ঘোষণা এসেছে। বিশ্বরাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তনও। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হবার পালা। মনে আছে, ফাইনালের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কোনো কারণে বাড়িতে অর্থাৎ শেরপুরে। শেরপুরের নিউ মার্কেট এলাকা তখন বেশ পরিচ্ছন্ন চত্বর। চত্বরের প্রেসক্লাব এলাকায় আর্জেন্টিনা দলের সমর্থকরা আর আমরা পশ্চিম জার্মানির সমর্থকরা মিনতি স্টুডিও এলাকায় আলাদা করে কিন্তু উৎসবমুখরতায় খেলা উপভোগ করেছি; কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছিল না। মাইক বাঁধা হয়েছিল। মাইকে কথা বলার অভ্যাস অনেক আগে থেকেই। সেবার মাইক আমার হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল। খেলার আগে ও পরে মাইকে আমি কথা বলেছি দল সম্পর্কে। সে খেলাতে পশ্চিম জার্মানি আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যারাডোনা সেবারও খেলেছেন, তবে ঈশ্বরের হাত তার পক্ষে ছিল না। পশ্চিম জার্মানির আন্দ্রেস ব্রেহ্মে গোল করেন। আমরা সমর্থকরা খেলোয়াড়ের চেয়ে দলকেই পছন্দ করি, মনে রাখি।
 
এর পর পূর্ব ও পশ্চিম এক হওয়ার কারণে দলটি জার্মানি বলে পরিচিত হয়। দুটি ভিন্ন মতের দেশ এক দেশে পরিণত হতে সময় নেয়। খেলাতেও এর প্রভাব পড়ে। তাই  ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি যথাক্রমে ৫ম ও ৭ম হয়। কিন্তু এর পরেই ঘুরে দাঁড়ায় দেশটি। ফুটবলের জন্য পরিকল্পনা করে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার রানার্সআপ হয়। ২০০৬ আর ২০১০ সালেও সেমিফাইনালে ওঠে এবং দুবারই ৩য় হয়। ২০১৪ সালে হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এরপর  ২০১৮-এর বিশ্বকাপে জার্মানি খুব খারাপ করে। বলা হয়, দল থেকে একঝাঁক খেলোয়াড় অবসরে যাওয়ায় এমনটি হয়। ২০২২ সালেও স্পেনের সঙ্গে গোল-ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় জার্মানি গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারে না। এবার, ২০২৬ সালে শুরুটাই করেছে ৭ গোল দিয়ে। দেখা যাক।

বিশ্বকাপ ফুটবলে কৃতিত্বের ধারাবাহিকতায়  জার্মানি দল এগিয়ে। নানা কারণে তারা দুটো বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। বাকি বিশ্বকাপে চারবার চ্যাম্পিয়ন, চারবার রানার্সআপ, চারবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। এই তেরোবার পজেশনে থাকা আর কোনো দল কি বিশ্বে আছে? ব্রাজিলের কথাই ধরি: তারা সবগুলো বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, দুবার ৪র্থ হয়েছে। আর্জেন্টিনার রেকর্ড হলো:  তারা তিনবার চ্যাম্পিয়ন, তিনবার রানার্সআপ, একবারও ৩য় বা ৪র্থ হয়নি। ইতালি চারবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, একবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। ফ্রান্স দুবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। 

আমি সব দিক থেকেই দেখেছি, জার্মানি ভালো খেলে, তারা ‘ওয়ান ম্যান শো’ দল নয়, ‘পাওয়ার ফুটবল’ তাদের অন্বিষ্ট, তারা টিমকে গুরুত্ব দেয় ব্যক্তিকে নয়। আর সম্প্রতি তারা ‘পাওয়ার ফুটবল’-এর সঙ্গে ল্যাটিনের পাসজাদুকে যুক্ত করেছে; যার ফলও ফলতে শুরু করেছে। ২০১৪-তে তারা সাবেক চারটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। বিষয়টি অবজ্ঞা করার মতো নয়।
 
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির একটি খেলা দেখে মনে হলো, আবার দলটি আলোচনায় আসবে। দলের অধিনায়ক ও অন্যতম অভিজ্ঞ খেলোয়াড় জোশুয়া কিমিখের ক্ষিপ্রতা ও মাঠের ডানপ্রান্ত থেকে তিরবেগে এগিয়ে আসার ক্ষমতা অসাধারণ। তাকে দলের ‘নিউক্লিয়াস’ বলা হচ্ছে। জাদুকরি ড্রিবলিঙের স্রষ্টা জামাল মুসিয়ালা, গোলমেকার ও স্যুটারখ্যাত ফ্লোরিয়ান ভার্টজ, নিখুঁত হেডের কারিগর ও ‘ক্লোসা দ্য নিউবার্থ’খ্যাত কাই হাভার্টজ, ‘বার্লিন ওয়াল নিউ’খ্যাত ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার যদি ঠিকঠাক জ্বলে ওঠেন, তাহলে খেলা জার্মানির দিকে ঘুরে যাবে নিশ্চিত। অবশ্য, গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারের দায়িত্ব একটু বেশিই। জার্মানি দল গোল খেতেও ভালোবাসে। যেমন, ব্রাজিল ও কুরাসাও-দুবারই হলো ৭-১। ঐ একটি করে গোল জার্মানির ‘গোলটেস্টে’র উদাহরণ। এর আগে তুরস্ককে ৭-২, অস্ট্রিয়াকে ৬-১ গোলে হারানোর ইতিহাসও আছে। নয়ার বা ব্যাক-আপ গোলরক্ষক ওলিভার বাউম্যানের দায়িত্ব এখানে অনেক বেশি: ‘গোলটেস্ট’ করা যাবে না। আইভরি কোস্ট ফুটবল দল কম শক্ত নয়। জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থকেরা অপেক্ষায় আছি, আবার জ্বলে উঠবে আমাদের প্রিয় দল। এভাবে যদি তারা ফাইনাল পৌঁছে যায়, তাহলে তো: ‘ওয়াও!’

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; [email protected] 

ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সহিংসতার স্বরূপ

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সহিংসতার স্বরূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশে গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তির যে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে, তা আমাদের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। পকেটে থাকা একটি স্মার্টফোন আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা শিক্ষা, অর্থনীতি, বিনোদন এবং আত্মপ্রকাশের এক অবারিত দিগন্ত। এই ডিজিটাল রূপান্তর বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছিল। ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্সের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ নারীদের ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করেছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত অন্ধকার ও কণ্টকাকীর্ণ। যে ইন্টারনেট নারীর মুক্তির পথ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য এক নতুন বন্দিশালা বা আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন হয়রানি মূলত ক্ষমতার এক নতুন ও বিকৃত রূপ। প্রথাগত সমাজে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বিদ্যমান ছিল, ডিজিটাল যুগে তারই আধুনিক সংস্করণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ইন্টারনেটের এই বিশাল প্রান্তরে যখন একজন নারী সরব হন, তখন তা অনেক সময় সমাজের একটি নির্দিষ্ট রক্ষণশীল গোষ্ঠীর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য সাহস’ হিসেবে গণ্য হয়। প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই গোষ্ঠী নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালায়। এই হয়রানির রূপ বিচিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি পোস্ট করলে সেখানে অশ্লীল মন্তব্য করা, ইনবক্সে অশালীন প্রস্তাব পাঠানো কিংবা নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ চর্চা করা এখনকার ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয় বা ফেক আইডি ব্যবহার করে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানো হয়।

আমাদের সমাজে নারীর ‘সম্মান’ ও ‘নৈতিকতা’ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় এবং এই সম্মান প্রায়ই তার ব্যক্তিগত আচরণের চেয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বেশি নির্ভর করে। অনলাইন আক্রমণকারীরা এই সামাজিক দুর্বলতাকেই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, একজন নারীর চরিত্র নিয়ে কোনো গুজব ছড়াতে পারলে বা তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের কোনো বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে পারলে তাকে সহজেই কাবু করা সম্ভব। এই ‘সম্মান নষ্ট’ হওয়ার ভয় নারীর জন্য অফলাইন জীবনের চেয়েও অনেক সময় অনলাইনে বেশি ভীতিপ্রদ হয়ে ওঠে। কারণ ভার্চুয়াল জগতের এই কলঙ্ক নিমেষেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা নারীর পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং কর্মক্ষেত্রে তার অবস্থানকে চরম সংকটে ফেলে দেয়।

অনলাইন সহিংসতার এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সাইবার বুলিং বা হয়রানির শিকার নারীরা তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং হতাশায় নিমজ্জিত হন। অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসা ঘৃণ্য মন্তব্য বা হুমকি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তাদের কাছে অনলাইন জগৎটিই এখনকার সময়ে সামাজিকীকরণের প্রধান মাধ্যম। সেখানে যখন তারা অপমানিত হয়, তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়ে পড়ে যায়। এই মানসিক ক্ষতগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না বলে সমাজ একে গুরুত্ব দিতে চায় না, কিন্তু ভেতরের এই রক্তক্ষরণ একজন নারীকে তিল তিল করে ধ্বংস করে দেয়।

এই নিরবচ্ছিন্ন হয়রানির একটি নেতিবাচক সামাজিক ফল হলো ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতা। অনেক নারী অনলাইনে আক্রমণের শিকার হওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় নীরব হয়ে যান। তারা নিজেদের ছবি পোস্ট করা বন্ধ করে দেন, কোনো বিতর্কিত বা সামাজিক বিষয়ে মতামত দিতে ভয় পান এবং ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি মনে হতে পারে যে তারা ঝামেলা এড়িয়ে চলছেন, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বর্তমান যুগে অনলাইন উপস্থিতি কেবল অবসরের বিষয় নয়; এটি দক্ষতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার গঠনের প্রধান মাধ্যম। নারীরা যখন ভয়ে এই প্লাটফর্মগুলো ছেড়ে চলে যান, তখন তারা বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনলাইন হয়রানির প্রভাব বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল বাধা। বর্তমানে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাদের এই ব্যবসায়িক সাফল্যের মূলে রয়েছে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, একদল সাইবার অপরাধী বা অসাধু মানুষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব নারী উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পেজে অশালীন মন্তব্য করে বা ভুয়া রিভিউ দিয়ে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু নষ্ট করার চেষ্টা করে। অনেকে আবার ইনবক্সে পণ্যের অর্ডার দেওয়ার নাম করে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করে। এ ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী তাদের কষ্টার্জিত ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

একইভাবে সাংবাদিকতা, সাহিত্য বা শিল্পকলা বিভাগে কাজ করা নারীরাও অনলাইনে ব্যাপক আক্রমণের শিকার হন। তাদের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা না করে আক্রমণ করা হয় তাদের লিঙ্গ পরিচয়কে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণও অনলাইন হয়রানির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব নারী মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার বা রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরব হন, তাদের দমানোর জন্য অনলাইন প্লাটফর্মকে যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে ‘ট্রোলিং’ করা হয়, এমনকি ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। যখন একজন প্রভাবশালী নারীকে অনলাইনে হেনস্তা করা হয়, তখন তা সাধারণ নারীদের মনেও ভীতির সঞ্চার করে।

এত বিশাল পরিসরে সহিংসতা চললেও বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। অধিকাংশ নারীই অভিযোগ জানাতে চান না। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একজন ভুক্তভোগী নারীকে প্রায়ই দ্বিতীয়বার লাঞ্ছিত হতে হয়। পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিজের সঙ্গে ঘটা অশালীন ঘটনার বর্ণনা দেওয়া অনেক নারীর জন্য পাহাড়সম কষ্টের বিষয়। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জেন্ডার সংবেদনশীল নন। তারা উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই দোষারোপ করেন যে তিনি কেন এমন ছবি দিলেন বা কেন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বললেন।

এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেবল কঠোর আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে অনলাইন সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা আমাদের সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারি। অনলাইন হয়রানিকে একটি ‘লঘু’ বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে যে ইন্টারনেটে কাউকে গালি দেওয়া বা কারো ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ করা কেবল মজা নয়, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে ‘সম্মতি’ বা কনসেন্ট এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল শিক্ষা এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। নারীদের জানতে হবে কীভাবে অনলাইনে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং হয়রানির শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা নিতে হয়। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও আধুনিক ও জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও এ ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীরা নির্ভয়ে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া মানে কেবল নারীকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি সভ্য, মানবিক এবং সমঅধিকারের সমাজ নিশ্চিত করা। এই অদৃশ্য শিকল ভাঙার লড়াইয়ে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি–প্রত্যেককেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক: সমাজবিজ্ঞান ও উন্নয়নবিষয়ক কলাম লেখক ও গবেষক।

রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা! একটি জাতির অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র!

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা!
একটি জাতির অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছে দেশ। নির্বাক জাতি, লুপ্ত মানবতা, স্তব্ধ বিবেক, লজ্জিত জাতি! কী নির্মম, কী নৃশংস, কী বীভৎস!  ক্ষোভ, শোক আর বিক্ষোভে আগুন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ধরণী দ্বিধা হও! কোনো ঘরে আর কন্যাসন্তান জন্ম না নিক। কন্যা-জায়া-জননী কোনো মায়াভরা শব্দের মানুষ আর না থাকুক...!’। আট বছরের শিশুও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়, তারা নরপিশাচ। এসব নৃশংসতার মাত্রা নির্মূল করতে না পারলে জাতি আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। ঘটনার পর থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামিসা হত্যার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও অভিভাবকরা সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এ ধরনের অপরাধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের নিজের সন্তান আছে, তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ আরও বেশি কাজ করে।

গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পান। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। পুলিশ জানায়, মূল ঘাতক স্বামীকে পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দিতেই ভেতর থেকে ফ্ল্যাটের দরজা খোলেননি স্ত্রী স্বপ্না। স্বামী জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা প্রথমে মূল আসামির স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে। পরে স্বপ্নার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছোরা এবং শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট–এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে। ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর। ২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। শিশু–যাদের হাসিতে ভরে ওঠার কথা প্রতিটি ঘর, যাদের হাতে থাকার কথা রঙিন খাতা, খেলনা আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুরাই এখন একের পর এক সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি–এসব কারণেই এমন ভয়াবহ অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়ছে। শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়–এর পেছনে আছে একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন এবং এক মায়ের বুকভরা কান্না। এ ব্যাপারে আমরা প্রতিনিয়তই সংবাদপত্রে লিখছি, কিন্তু পড়ারও মানুষ নেই, প্রতিকারেরও মানুষ নেই। 

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিয়িতই ঘটেই চলেছে দেশে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। দেশে নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন ও ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরেবাইরে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন কন্যাশিশুসহ সব বয়সী নারী। নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বিবেচনায় সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় দেশবাসী আতঙ্কগ্রস্ত। এ পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য। নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন ও ধর্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার অন্তরায়। নারীর প্রতি এ ধরনের আচরণ দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নাটোরে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছে সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস। উদ্বেগজনকভাবে, শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০টি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোনোটিই যথেষ্ট নিরাপদ নয়। পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল–গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘনঘন ঘটছে যে বেশির ভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না। অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকসংকটে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি  সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সেই উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে–গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ। একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের এক একটি ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও–সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 

ধর্ষণ গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুক না কেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ-জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিকসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এ সংকট নিরসনে প্রবলভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সবারই। এ সামাজিক অবক্ষয় ও দুরাবস্থা উত্তরণে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি

বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

শিল্পকলার ইতিহাসতত্ত্বে (historiography) প্রায়শই ‘মিউজ’ বা ‘প্রেরণা-উৎস’ হিসেবে সরলীকৃত নারী মডেলের ভূমিকাকে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছে। এতে ইউরোপীয়-আমেরিকান এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট উত্তর-ঔপনিবেশিক যাত্রার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল চেতনাকে জাগ্রত করার একটি নিষ্ক্রিয় ও নির্বাক মাধ্যম হিসেবে অবদমিত রাখা হলেও, গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের নারী মডেল এক জটিল রূপান্তরের মধ্যদিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে তিনি ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের বস্তু থেকে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গ্রামীণ শ্রম এবং আদিবাসী সহনশীলতার এক জীবন্ত ও শারীরিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একটি বিগঠনবাদী (deconstructive) কাঠামোর মাধ্যমে এ গবেষণাটি খতিয়ে দেখেছে–কীভাবে বাংলাদেশের অগ্রগামী আধুনিকতাবাদী শিল্পী (যেমন: জয়নুল আবেদিন ও এস এম সুলতান) এবং আন্তঃদেশীয় ব্যক্তিত্বরা (যেমন: অমৃতা শেরগিল) শিল্পী-মডেল সম্পর্কের সক্রিয়/নিষ্ক্রিয়তার দ্বান্দ্বিকতাকে ভেঙেছেন কিংবা পুনর্নির্মাণ করেছেন। বেঙ্গল ডেল্টা বা গাঙ্গেয় বদ্বীপের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে মডেলের উপস্থিতিকে প্রাসঙ্গিককরণের মাধ্যমে একটি বিকল্প শিল্প ইতিহাসের পক্ষে যুক্তি দেয়; যা নারী মডেলকে কেবল একটি নামহীন কাঠামোগত উপাদান থেকে দৃশ্যমান আধুনিকতার এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল এজেন্টে পুনরধিষ্ঠিত করে।

‘মিউজ’ বা প্রেরণা-উৎসের মিথ বিগঠন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলধারার শিল্পের ইতিহাস সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে একটি কঠোর দ্বিমুখী অবস্থান বজায় রেখেছে। এটি মূলত সেই ‘একাকী প্রতিভাবান’ (solitary genius) শিল্পীর মিথ বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল, যিনি কোনো নিষ্ক্রিয় মাধ্যমের কাছ থেকে রূপ, আবেগ ও নান্দনিক সত্য আহরণ করেন। এই কাঠামোর মধ্যে নারী মডেল এক বিরোধপূর্ণ বা আপাতবৈপরীত্যময় (paradoxical) অবস্থানে থাকেন। তিনি ক্যানভাসজুড়ে সর্বত্র উপস্থিত, অথচ সম্পূর্ণ অদৃশ্য; তার শারীরিক অবয়ব ক্যানভাস শাসন করে, অথচ তার নিজস্ব পরিচয়, কর্তৃত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিক শিল্প ইতিহাস দীর্ঘকাল ধরে এই মুছে ফেলার প্রক্রিয়াকে ‘মিউজডম’ (musedom) নামে অভিহিত করে আসছে–যা নারীকে একটি নীরব প্রতীক বা আদর্শ পাত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যার একমাত্র কাজ পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ ও প্রকাশ করা।
তবে এই গতিশীলতাকে যখন পশ্চিমা রীতিনীতির বাইরে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের ভূ-রাজনীতি এবং বেঙ্গল ডেল্টার সুনির্দিষ্ট ইতিহাসে মূল্যায়ন করা হয়, তখন নারী মডেলের আর্থ-নান্দনিক ভূমিকায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যানভাসে নারীর শরীর কখনোই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রূপবাদী অ্যানাটমিচর্চা বা রোমান্টিক পারিবারিকতার প্রদর্শন ছিল না। বরং তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ট্রমা, উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী পুনর্জাগরণ, কৃষিভিত্তিক শ্রেণিসংগ্রাম এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচয় রাজনীতির মিলনমেলায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ঢাকার সমসাময়িক স্বাধীনতা-উত্তর শিল্প আন্দোলন পর্যন্ত, নারী মডেল একটি পরিবর্তনশীল ক্যানভাস হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে একটি জাতির উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রতিনিয়ত আলোচিত ও প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলার প্রেক্ষাপট: ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিকতা থেকে জাতীয় রূপক
বাংলাদেশে শিল্প মডেলের উত্থান বুঝতে হলে অবিভক্ত বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শিক্ষার ইতিহাস জানা প্রয়োজন। ১৮৫৪ সালে কলকাতায় ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলে জীবন্ত মডেল ব্যবহার করে লাইফ-স্টাডি ক্লাসসহ পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদের (academic realism) সূচনা হয়। প্রথম দিকে ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং স্থানীয় কঠোর বর্ণপ্রথার কারণে শিল্পীদের জন্য স্থানীয় নারী মডেল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে প্রথম দিকের মডেলদের প্রায়শই সামাজিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়কেন্দ্র বা কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লি থেকে আনা হতো। ফলে, নারী মডেল দ্বিমুখী প্রান্তিকতার মধ্যদিয়ে শিল্পজগতে প্রবেশ করেন: তিনি একদিকে শ্রেণি ও বর্ণের কারণে সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, অন্যদিকে পুরুষ-শাসিত এক অভিজাত জায়গায় দৃশ্যমান হওয়ার কারণেও সামাজিকভাবে কোণঠাসা ছিলেন।

সাঁওতাল নারী ও জয়নুল আবেদিন: শ্রমজীবী মিউজ
বাংলার আধুনিকতাবাদের কেন্দ্রবিন্দু যখন পূর্ব দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে–যার চূড়ান্ত রূপ ছিল জয়নুল আবেদিনের মৌলিক কাজ এবং ১৯৪৮ সালে ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’ (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠা–তখন মডেলের সংজ্ঞায় এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দৃশ্যপট দেখে গভীরভাবে উদ্বেলিত আবেদিন অবাস্তব, ইউরোপীয় ধাঁচের নারী অবয়ব প্রত্যাখ্যান করেন।
এর পরিবর্তে জয়নুল আবেদিন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীর দিকে, বিশেষ করে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের ওপর। তার সাঁওতাল নারী সিরিজের মতো কাজগুলোতে মডেলরা কোনো পেশাদার স্টুডিও কর্মী ছিলেন না; তারা ছিলেন দৈনিক বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মগ্ন কৃষিশ্রমিক। এখানেই আমাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার: মডেল এখানে আর পুরুষ দৃষ্টির (male gaze) কামনামূলক বস্তু নন, বরং আর্থ-সামাজিক সহনশীলতার এক স্মারক। এই নারীদের শরীরকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে আবেদিনের সাহসী, এক্সপ্রেশনিস্ট কালির টান ও চারকোল রেখার ব্যবহার তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়নি। বরং জল আনা, জমি চাষ করা কিংবা দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার মতো তাঁদের শারীরিক শ্রমই হয়ে ওঠে একটি উদীয়মান বাঙালি পরিচয়ের মৌলিক নান্দনিক ভাষা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় ইসলামি জাতীয়তাবাদের সরাসরি বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাঁওতাল নারী মডেল উত্তর-বিভাজন সংস্কৃতির এক ধর্মনিরপেক্ষ ও মাটির কাছাকাছি প্রতিরোধের স্তম্ভে রূপান্তরিত হন।

এস এম সুলতানের অ্যাভান্ট-গার্ড উপরিপাতন: পেশিবহুল মাতৃতন্ত্র
একটি ভিন্ন অথচ সমান গভীর রূপান্তর লক্ষ্য করা যায় শিল্পী এস এম সুলতানের কাজে। সুলতানের সঙ্গে তার মডেলদের সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী, শহুরে শিল্পী-মডেলের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছিল। নড়াইলের গ্রামীণ কৃষকদের মাঝে বসবাস করা সুলতানের মডেল ছিলেন সেই সব সাধারণ মানুষ, যাদের সঙ্গে তিনি জীবন ভাগ করে নিয়েছিলেন।
সমালোচনামূলকভাবে দেখলে, সুলতান তার নারী মডেলদের ঔপনিবেশিক বা পুঁজিবাদী শোষণের শিকার কোনো ভঙ্গুর, অপুষ্টিতে ভোগা চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেননি; বরং তিনি তাদের উপস্থাপন করেছেন পেশিবহুল, লাবণ্যময়ী এবং বিশালকার অবয়বে। প্রথম রোপণ বা চর দখল-এর মতো কালজয়ী শিল্পকর্মে নারীর শরীরকে এমন এক অতিরঞ্জিত পেশিশক্তিতে আঁকা হয়েছে, যা তাদের পুরুষ সহযোদ্ধাদের শক্তির সমকক্ষ। এই নান্দনিক অতিরঞ্জনের মাধ্যমে সুলতান একটি লুকানো আর্থ-সামাজিক সত্য উন্মোচন করেছেন: গ্রামীণ বাংলাদেশি নারী হলেন কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। শৈল্পিক মডেল হিসেবে যখন তার শরীর ব্যবহৃত হয়, তখন তা কোমল নারীত্বের পশ্চিমা আদর্শকে সম্পূর্ণ ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন এক ক্ষমতায়নকারী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক রূপক হিসেবে–যিনি এ বদ্বীপের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সমকক্ষ চালক।

বাঙালি শিল্পে নারী মডেলের বিবর্তন
ঔপনিবেশিক যুগ (১৯ শতকের শেষভাগ) > প্রান্তিক/প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদ।
জাতীয়তাবাদী বিপ্লব (১৯৪৩+) > সাঁওতাল/শ্রমজীবী শ্রেণি (সহনশীলতা)।
উত্তর-ঔপনিবেশিক অ্যাভান্ট-গার্ড > বিশালকার কৃষক সমাজ (নিজস্ব
কর্তৃত্ব)। তবে, বাংলাদেশি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শিল্প আন্দোলনের তুলনা করলে একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু থেকে সক্রিয় চরিত্রে নারী মডেলের এ রূপান্তর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অমৃতা শেরগিল: শিল্পী ও মডেলের মধ্যকার দূরত্ব দূরীকরণ
বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে স্টুডিওর ঐতিহ্যবাহী শ্রেণিবিন্যাসকে যিনি স্থায়ীভাবে ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন অমৃতা শেরগিল। প্যারিসের একাডেমি এবং ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতার সেতু বন্ধনকারী শেরগিল অত্যন্ত অনন্য উপায়ে জেন্ডার ও পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। হিল উইমেন বা সাউথ ইন্ডিয়ান ভিলেজার্স গোয়িং টু মার্কেট-এর মতো কাজগুলোতে তার মডেলরা ছিলেন সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষ, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের গভীর বিষাদ ও ভারী নীরবতাকে প্রতিফলিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেরগিল ক্যানভাসের উভয় পাশে নিজে দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহাসিক দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছিলেন, যা একজন অভিজাত চিত্রশিল্পীকে প্রান্তিক সাবাল্টান বা শোষিত বিষয় থেকে আলাদা করে রাখত। নিজের আত্মপ্রতিকৃতির এক বিশাল ভাণ্ডারের মাধ্যমে, যেমন– সেলফ-পোর্টেট এজ আ তাহিতিয়ান–শেরগিল সচেতনভাবে শিল্পী এবং মডেলের দ্বৈত ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। নিজের শরীরকে রংতুলিতে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পশ্চিমা কামুক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীর রূপকে মুক্ত করেন এবং নিজের শারীরিক সত্তাকে একটি বিদ্রোহী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ঐতিহাসিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, একজন নারী যখন নিজেই নিজের মডেলের ভূমিকা নেন, তখন ‘মিউজডম’-এর প্রথাগত ক্ষমতার সমীকরণ ভেঙে পড়ে এবং স্টুডিওটি গভীর রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়।

পশ্চিমা ক্যানন বনাম উত্তর-ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন
ইউরোপীয়-আমেরিকান আধুনিকতাবাদী ধারার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে শিল্পী মডেলের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্যভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। পশ্চিমে, আধুনিকতাবাদী অ্যাভান্ট-গার্ড আন্দোলন প্রায়শই এমন মডেলদের ওপর নির্ভর করত যাদের প্রকৃত সৃজনশীল অবদান পুরুষ শিল্পীর রোমান্টিক মিথের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। উদাহরণস্বরূপ, লি মিলারের বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা কিংবা জেল্ডা ফিটজেরাল্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে, ফলে এই নারীরা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কল্পনায় কেবল খামখেয়ালি মিউজ হিসেবেই রয়ে গেছেন।
এর বিপরীতে, বাংলাদেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক মডেলকে কদাচিৎ ব্যক্তিগত রোমান্টিক আবেশ হিসেবে দেখা হয়। বরং তাকে স্পষ্টভাবে একটি সমষ্টিগত রূপ দেওয়া হয়েছে। কামরুল হাসানের মতো বাংলাদেশি শিল্পীরা যখন নারীর অবয়ব এঁকেছেন এবং প্রায়শই তার কাজের নাম দিয়েছেন নায়ার বা তিন কন্যা–তখন সেই মডেলরা খোদ বাংলার সমষ্টিগত রাজনৈতিক সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ইয়াহিয়া খানের দানবীয় কার্টুন-সংবলিত হাসানের আইকনিক পোস্টারের বিপরীতে ছিল গ্রামীণ বাঙালি নারীদের নিয়ে তার উদ্‌যাপনী ও সাবলীল রেখাচিত্র। এ সংকটময় মুহূর্তে, নারী মডেলকে মাতৃভূমির সর্বোচ্চ প্রতীকে উন্নীত করা হয়েছিল, যা একটি নিপীড়ক সামরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের এক তীব্র ঘোষণায় পরিণত হয়েছিল।

অদৃশ্য শ্রম: নিজস্ব কর্তৃত্ব, নামহীনতা এবং সমসাময়িক স্টুডিও
নারী মডেলকে একটি জাতীয় প্রতীকে উন্নীত করা সত্ত্বেও, একটি কঠোর ও সমালোচনামূলক শিল্প ইতিহাসকে স্টুডিওর ভেতরের চলমান বস্তুগত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হতে হবে। গ্যালারির দেয়ালে নারীর প্রতিচ্ছবি উদ্‌যাপিত হলেও, মডেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যিনি পোজ দিচ্ছেন, সেই জীবন্ত মানুষটি প্রায়শই অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক কলঙ্কের জালে বন্দি থাকেন।
সমসাময়িক বাংলাদেশে চারুকলার মডেল হওয়া এখনো একটি অস্বীকৃত এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের রূপ। সমসাময়িক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত মডেলরা প্রায়শই শহুরে শ্রমজীবী পটভূমি থেকে আসেন। তাদের এমন এক রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশের মধ্যদিয়ে চলতে হয়, যা প্রায়শই নগ্ন বা লাইফ-স্টাডি রূপকে নৈতিক ও ধর্মীয় শিষ্টাচারের লঙ্ঘন হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে। ফলে, অনেক মডেল সামাজিক বহিষ্কার এড়াতে সম্পূর্ণ নামহীন থাকার দাবি জানান এবং পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিজেদের পেশা লুকিয়ে রাখেন।
এ বাস্তবতা উত্তর-ঔপনিবেশিক শিল্প ইতিহাসের একটি গভীর বিদ্রূপকে সামনে আনে:
•    প্রতীকী ক্ষেত্র: নারী মডেলের শরীর জাতীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং বিশুদ্ধ নান্দনিক রূপের এক চমৎকার ক্ষেত্র হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়।
•    বস্তুগত ক্ষেত্র: যে প্রকৃত নারী এই মাস্টারপিসগুলোর জন্য শারীরিক ব্লপ্রিন্ট বা ভিত্তি প্রদান করছেন, তিনি সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উভয়ই থেকে বঞ্চিত হন।

তাই সমসাময়িক বাংলাদেশি স্টুডিও গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর পুঁজিবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোরই প্রতিফলন ঘটায়। এটি এমন এক জায়গা যেখানে অভিজাত সাংস্কৃতিক পুঁজি গড়ে তোলার জন্য প্রান্তিক নারীদের শারীরিক শ্রমের ওপর গভীরভাবে নির্ভর করা হয়, অথচ আর্কাইভ থেকে তাদের নাম এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়।

একটি বিকল্প আর্কাইভাল ভবিষ্যতের দিকে

নারী শিল্প মডেলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাস প্রতিরোধ, আত্মীকরণ এবং অসমাপ্ত মুক্তির এক জটিল আখ্যান প্রকাশ করে। মডেল কখনোই ক্যানভাসের ওপর কেবল একটি শূন্য কাঠামোগত উপাদান ছিলেন না। জয়নুল আবেদিনের কালির টানে বন্দি সহনশীল সাঁওতাল নারী থেকে শুরু করে এস এম সুলতানের ভাবনায় বিশাল গ্রামীণ কৃষক মাতৃরূপ এবং অমৃতা শেরগিলের মতো শিল্পীদের মাধ্যমে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া আত্ম-প্রতিফলিত নারীবাদী রূপান্তর–মডেল বরাবরই দৃশ্যমান আধুনিকতা গঠনে এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।

প্রথাগত ‘মিউজডম’-এর নিষ্ক্রিয় বাঁধন থেকে নারী মডেলকে উদ্ধার করতে সমসাময়িক শিল্প সমালোচনাকে একটি প্রগতিশীল, বিকল্প আর্কাইভ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এর জন্য একাকী পুরুষ প্রতিভার প্রাচীন মিথ থেকে সরে এসে এমন একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো গ্রহণ করা প্রয়োজন যা ষ্টুডিওকে যৌথ ও সহযোগিতামূলক কাজের জায়গা হিসেবে সম্মান জানায়। এই নারীদের সামাজিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক শ্রম এবং গভীর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বকে উন্মোচন করার মাধ্যমেই কেবল শিল্পের ইতিহাস আমাদের বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করা ছবিগুলোর সঠিক অর্থ উদ্ধার করতে পারবে। নারী শিল্প মডেলকে আর কেবল অন্যের সৃজনশীলতার দর্পণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; তাকে শিল্পেরই এক অপরিহার্য ও মৌলিক স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]