ছোট্ট দেশ কুরাসাওকে ৭-১ গোলে পর্যুদস্ত করার পর জার্মানি ফুটবল দল নবীন প্রজন্মের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আসবেই তো। নবীনেরা ভালো খেলা আর গোলের বন্যা দেখতেই ভালোবাসে যে!
২০১৪-এ ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করে জার্মানি। এর পর দুটো বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে তারা মোটোই ভালো করেনি। ফলে গত বারো বছর বিশ্বব্যাপী তেমন আলোচনাতেই ছিল না দলটি। ২০১৪ থেকে ২০২৬— এই একযুগে যে নবীন প্রজন্ম উঠে এসেছে, তাদের কাছে জার্মানি প্রায় অচেনাই। এই অচেনার আর একটি কারণ হলো, জার্মানি কথিত ‘স্টার’ নির্ভর দল নয়, ‘টোটাল টিম’ নির্ভর। ‘স্টার’ খেলোয়াড় দেখে লোকে যে দল চিনবে, এটাও হয়নি। জার্মানি ‘স্টার’ নির্ভর দল না হওয়ায় কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ছয়জনে সাত গোল দিয়েছে। অর্থাৎ যে-কেউ গোল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এই দলে। তারপরও দল এপর্যন্ত ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার, গের্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউস, মিরোস্লাভ ক্লোসের মতো বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাজারমুখী প্রচারের আলোয় তাঁরা পেলে, দিয়াগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, ক্রিস্টিয়ানো রোনালডো, লিওনেল মেসি প্রমুখের কাছাকাছি আসতে পারেননি।
আমি জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থক। ছোটো থেকেই। বুঝতে যখন শিখেছি, তখনই। এর দুটো কারণ। প্রথমত দলের ‘টিম স্পিরিট’; দ্বিতীয়ত বিশ্বসভ্যতায় জার্মানদের অবদান। আমার পছন্দের দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। ফ্রান্স, গ্রিস, ইংল্যান্ড ইত্যাদির কথাও বলতে পারেন। কিন্তু আমি যখন জার্মানিকে সমর্থন করি, তখন কার্ল মার্কস, আলবার্ট আইনস্টাইন, জোহানেস গুটেনবার্গ, ইমানুয়েল কান্ট, ফন গ্যেটে, ভান বেটোফেন প্রমুখের কথাই মনে এসেছিল। অন্যদের মতো তাঁরাও আমার স্বপ্নজগতের নায়ক ছিলেন। বিশ্বসভ্যতাকে কতটা এগিয়ে দিয়েছিলেন এই মহাত্মাগণ, অনুসন্ধানীমাত্রেই জানেন।
সে যাহোক; প্রথম কারণটিই ফুটবল দলের মূলশক্তি: টোটাল টিম স্পিরিটে পাওয়ার ফুটবল খেলা। জার্মানি দল সেটাই করে আর এখন আমি এটাই উপভোগ করছি।
১৯৮২ সালে আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। বাড়ির পাশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে গিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখেছি, সাদাকালো সেট। বড়োরা চেয়ারে বসে, আমরা ছোটোরা দাঁড়িয়ে। জায়গা নেই। তবু খেলা দেখব! আমার পক্ষপাত সমাজতান্ত্রিক পূর্বজার্মানির প্রতি। কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের দল নেই। আমি যখন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখি, তখন পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার ভালো লেগে যায়। দারুণ খেলেও সেবার পশ্চিম জার্মানি ইতালির কাছে ৩-১ গোলে বিশ্বকাপ ট্রফি হারায়। আসলে ইতালির পাওলো রসি নামের এক স্টাইকারের দক্ষতার কাছে হার মানে জার্মানি। রসি গোল্ডেনবুট পেয়েছিলেন। এই হার আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবু পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার মন কাড়ে।
আমাদের বাড়ির কেউ ফুটবলের সমর্থক ছিল না। খেলাধুলোর চেয়ে শিক্ষাসংস্কৃতির দিকেই ঝোঁক দেখেছি বাবার। তাই খেলাধুলোয় পরিবারের কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, এটা বলা যাবে না। নিজের কাছে যা ভালো মনে হয়েছে, সেটাই। আমাদের ছেলেবেলায় ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলই ছিল জনপ্রিয়। আমি নিজেও বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলেছি অনেক, ক্রিকেট খেলিনি। তাই ফুটবল ভালোবেসেছি গভীরভাবে। আমি আবাহনীর কী যে ভক্ত, তার প্রমাণ আছে এখনো। সালাউদ্দিন, আশিস, আসলাম, চুন্নু, এমিলিদের ভিউকার্ডগুলো দেখালেই বোঝা যাবে!
ছেলেবেলায় খেলার সময় আমাকে দলে নেওয়ার আগ্রহ থাকত বন্ধুদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বন্ধুরা শরীরের গড়ন অনুসারে তিনটি ফুটবল দল করে: মোটা, চিকন, মাঝারি। তাদের মধ্যে ফুটবল খেলা হয়েছিল। সেই খেলায় মাঝারি দলের হয়ে গোল করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে ফুটবল ‘সঙ্ঘ খেলা’; ক্রিকেট ততটা নয়। ক্রিকেটে একজনই দলকে জিতিয়ে দিতে পারে, ফুটবলে তা খুব কঠিন, অনেক সময় অসম্ভবও। জার্মানি সঙ্ঘবদ্ধভাবে ফুটবল খেলে। ১৯৮২-এর পর, ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ। তখন ২০ বা ২৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল আর ফিলিপ্স কোম্পানির সাদাকালো টেলিভিশন মধ্যবিত্তের ঘরে প্রচুর এসে গেছে, আমাদেরও। সে কারণে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ এর আগের যে কোনো বারের চেয়ে বেশি সংখ্যক বাঙালিরা দেখে। সে বারের খেলাতেও ভালো খেলল পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু তারা ফাইনালে ম্যারাডোনার কৌশলের কাছে ৩—২ গোলে হেরে যায়। ম্যারাডোনা ঈশ্বরকে কৃতিত্ব দিলেন আর আমি পর পর দুবার ফাইনালে ওঠা জার্মানির ‘পরম ভক্ত’ হয়ে গেলাম। সবাই তখন ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনা বলে চিৎকার করে; আমি জার্মানির জন্য কষ্ট পাই। দেখলাম, বন্ধুরা দলে দলে আর্জেন্টিনা হয়ে গেল। অনেকে ব্রাজিলের খেলারও হলো ভক্ত। আমি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালাম না।
এরপর চলে এল ১৯৯০-এর বিশ্বকাপ। তখন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রিত হবে বলে ঘোষণা এসেছে। বিশ্বরাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তনও। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হবার পালা। মনে আছে, ফাইনালের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কোনো কারণে বাড়িতে অর্থাৎ শেরপুরে। শেরপুরের নিউ মার্কেট এলাকা তখন বেশ পরিচ্ছন্ন চত্বর। চত্বরের প্রেসক্লাব এলাকায় আর্জেন্টিনা দলের সমর্থকরা আর আমরা পশ্চিম জার্মানির সমর্থকরা মিনতি স্টুডিও এলাকায় আলাদা করে কিন্তু উৎসবমুখরতায় খেলা উপভোগ করেছি; কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছিল না। মাইক বাঁধা হয়েছিল। মাইকে কথা বলার অভ্যাস অনেক আগে থেকেই। সেবার মাইক আমার হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল। খেলার আগে ও পরে মাইকে আমি কথা বলেছি দল সম্পর্কে। সে খেলাতে পশ্চিম জার্মানি আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যারাডোনা সেবারও খেলেছেন, তবে ঈশ্বরের হাত তার পক্ষে ছিল না। পশ্চিম জার্মানির আন্দ্রেস ব্রেহ্মে গোল করেন। আমরা সমর্থকরা খেলোয়াড়ের চেয়ে দলকেই পছন্দ করি, মনে রাখি।
এর পর পূর্ব ও পশ্চিম এক হওয়ার কারণে দলটি জার্মানি বলে পরিচিত হয়। দুটি ভিন্ন মতের দেশ এক দেশে পরিণত হতে সময় নেয়। খেলাতেও এর প্রভাব পড়ে। তাই ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি যথাক্রমে ৫ম ও ৭ম হয়। কিন্তু এর পরেই ঘুরে দাঁড়ায় দেশটি। ফুটবলের জন্য পরিকল্পনা করে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার রানার্সআপ হয়। ২০০৬ আর ২০১০ সালেও সেমিফাইনালে ওঠে এবং দুবারই ৩য় হয়। ২০১৪ সালে হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এরপর ২০১৮-এর বিশ্বকাপে জার্মানি খুব খারাপ করে। বলা হয়, দল থেকে একঝাঁক খেলোয়াড় অবসরে যাওয়ায় এমনটি হয়। ২০২২ সালেও স্পেনের সঙ্গে গোল-ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় জার্মানি গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারে না। এবার, ২০২৬ সালে শুরুটাই করেছে ৭ গোল দিয়ে। দেখা যাক।
বিশ্বকাপ ফুটবলে কৃতিত্বের ধারাবাহিকতায় জার্মানি দল এগিয়ে। নানা কারণে তারা দুটো বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। বাকি বিশ্বকাপে চারবার চ্যাম্পিয়ন, চারবার রানার্সআপ, চারবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। এই তেরোবার পজেশনে থাকা আর কোনো দল কি বিশ্বে আছে? ব্রাজিলের কথাই ধরি: তারা সবগুলো বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, দুবার ৪র্থ হয়েছে। আর্জেন্টিনার রেকর্ড হলো: তারা তিনবার চ্যাম্পিয়ন, তিনবার রানার্সআপ, একবারও ৩য় বা ৪র্থ হয়নি। ইতালি চারবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, একবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। ফ্রান্স দুবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে।
আমি সব দিক থেকেই দেখেছি, জার্মানি ভালো খেলে, তারা ‘ওয়ান ম্যান শো’ দল নয়, ‘পাওয়ার ফুটবল’ তাদের অন্বিষ্ট, তারা টিমকে গুরুত্ব দেয় ব্যক্তিকে নয়। আর সম্প্রতি তারা ‘পাওয়ার ফুটবল’-এর সঙ্গে ল্যাটিনের পাসজাদুকে যুক্ত করেছে; যার ফলও ফলতে শুরু করেছে। ২০১৪-তে তারা সাবেক চারটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। বিষয়টি অবজ্ঞা করার মতো নয়।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির একটি খেলা দেখে মনে হলো, আবার দলটি আলোচনায় আসবে। দলের অধিনায়ক ও অন্যতম অভিজ্ঞ খেলোয়াড় জোশুয়া কিমিখের ক্ষিপ্রতা ও মাঠের ডানপ্রান্ত থেকে তিরবেগে এগিয়ে আসার ক্ষমতা অসাধারণ। তাকে দলের ‘নিউক্লিয়াস’ বলা হচ্ছে। জাদুকরি ড্রিবলিঙের স্রষ্টা জামাল মুসিয়ালা, গোলমেকার ও স্যুটারখ্যাত ফ্লোরিয়ান ভার্টজ, নিখুঁত হেডের কারিগর ও ‘ক্লোসা দ্য নিউবার্থ’খ্যাত কাই হাভার্টজ, ‘বার্লিন ওয়াল নিউ’খ্যাত ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার যদি ঠিকঠাক জ্বলে ওঠেন, তাহলে খেলা জার্মানির দিকে ঘুরে যাবে নিশ্চিত। অবশ্য, গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারের দায়িত্ব একটু বেশিই। জার্মানি দল গোল খেতেও ভালোবাসে। যেমন, ব্রাজিল ও কুরাসাও-দুবারই হলো ৭-১। ঐ একটি করে গোল জার্মানির ‘গোলটেস্টে’র উদাহরণ। এর আগে তুরস্ককে ৭-২, অস্ট্রিয়াকে ৬-১ গোলে হারানোর ইতিহাসও আছে। নয়ার বা ব্যাক-আপ গোলরক্ষক ওলিভার বাউম্যানের দায়িত্ব এখানে অনেক বেশি: ‘গোলটেস্ট’ করা যাবে না। আইভরি কোস্ট ফুটবল দল কম শক্ত নয়। জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থকেরা অপেক্ষায় আছি, আবার জ্বলে উঠবে আমাদের প্রিয় দল। এভাবে যদি তারা ফাইনাল পৌঁছে যায়, তাহলে তো: ‘ওয়াও!’
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; [email protected]