বাংলাদেশের চট্টগ্রাম তথা কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার বিশ্বের সর্বত্র একনামে পরিচিত। এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কর্ণফুলী পেপার মিল অনেক চড়াইউতরাই পেরিয়ে একটা ভালো অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ জনগণের জন্য সুখবর হলো এ পেপার মিলে পুরাতন কাগজ দিয়ে উন্নতমানের নতুন কাগজ তৈরি হচ্ছে। অনেকের কাছে এ সংবাদ অবাস্তব মনে হলেও কথাটি ১০০ ভাগ সঠিক। কয়েক বছর ধরে কর্ণফুলী পেপার মিলে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় কাগজ তৈরি হচ্ছে বলে চট্টগ্রামের নামকরা প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়।
আমি সেই পাকিস্তান আমলে ফিরে যাচ্ছি। গ্রামের বাড়িতে অধ্যয়নরত অবস্থায় শুনতাম কর্ণফুলী পেপার মিলের কথা। তখন শুনতাম আমাদের দেশের মিলে তৈরি কাগজ প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেই কাগজ ঘুরে এ দেশে এসে বিক্রি হতো দিস্তা চার আনা। আমার এখনো স্মরণে আছে- চার আনায় প্রতি দিস্তা লেখার কাগজ কিনেছি। এখন সবই গল্প বলার মতো।
দেশ স্বাধীন হলো। আমার বোধজ্ঞানও বাড়তে থাকল। তখন লোকমুখে শুনেছি, কর্ণফুলী পেপার মিলে আস্ত একটা মানুষ বাঁশের চালির সঙ্গে অসতর্কতার কারণে ঢুকে গিয়েছিল। পরে নাকি সেই মানুষের হাত-পায়ের নখ পেয়েছে কাগজের সঙ্গে। আসল কথা হলো, এ সংবাদের প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমি পাইনি। সাধারণ লোকেরা বলে, এ কথা আমিও শুনেছি।
মনে প্রবল ইচ্ছা জাগলো কর্ণফুলী পেপার মিল দেখার। যদিও ইচ্ছে উৎপন্ন হয়েছে সেটা এক প্রকার শিয়ালের সেই গল্পের মতো, ‘আঙুর ফল টক’। তবে ভেতরের ইচ্ছার যবনিকা ঘটাতে পারিনি। নানাজনের সঙ্গে আলাপ করতাম, কীভাবে চন্দ্রঘোনার পেপার মিলে যাওয়া যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশের উৎপাদিত কাগজ আমরা সরাসরি পেয়েছি। এখনো সে ব্যবস্থা চলমান।
অনেক সময় পর শহরে এলাম জীবিকার তাগিদে। কর্মপ্রচেষ্টায় সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হলাম। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করলাম। প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের ভাষার কর্মশালা শুরু হলো। আমারও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হলো। প্রশিক্ষণের বিষয় হিসেবে কর্ণফুলী পেপার মিল পরিদর্শনের দিন ধার্য হলো। অন্তরের ভেতর যে ইচ্ছা পোষণ করে আসছিলাম সে ইচ্ছা পূরণ হতে চলল।
যথারীতি আমরা কর্ণফুলী পেপার মিলে পৌঁছে গেলাম। আমাদের প্রশিক্ষণার্থীদের বললাম, চলো আমরা যে পথে বাঁশের চালি ওঠে সেখান থেকে দেখা শুরু করব। সবাই একমত পোষণ করল। আমার মনে সেই বাঁশের চালির সঙ্গে মানুষ চলে যাওয়ার কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। পেপার মিল কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী আমাদের সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখালেন। পেপার মিলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে জানতে চাইলাম সেই মানুষটির কথা। তিনিও বললেন, আপনার মতো আমিও শুনেছি। সত্যমিথ্যা কতটুকু জানি না।
প্রকাশিত দৈনিকের খবর অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঠিকাদারের মাধ্যমে পুরাতন কাগজ সংগ্রহ করে কর্ণফুলী পেপার মিলে এনে সেই কাগজ থেকে পিন বা কোনো প্লাস্টিক জাতীয় কিছু থাকলে তা সরিয়ে নিয়ে সেই পুরাতন কাগজকেই মণ্ড বানানো হয়। আমরা জানতাম আগে বাঁশ বা কাঠ দ্বারা মণ্ড বানানো হতো। এখন সেই নিয়ম আর নেই। কারণ তখন থেকে পুরাতন কাগজ দ্বারা মণ্ড তৈরি করে ভালোমানের কাগজ উৎপাদনে সংশ্লিষ্টরা মনোনিবেশ করেন।
আন্দরকিল্লায় যারা পেপার বিক্রি করে, তাদের দেওয়া তথ্যে জানা গেল, তারা সরাসরি মিল থেকে কাগজ কিনে ডিওর মাধ্যমে ডিলার হিসেবে। অনেকে ডিলার থেকে পাইকারি কাগজ কিনে খুচরা বিক্রি করে। তাদের কথা একটাই, আমরা সামান্য মুনাফায় কাগজ বিক্রি করি। মিলে মূল্য বাড়ালে সেটার প্রভাব বাজারে এসে পড়ে। বেশ কয়েকটি প্রিন্টিং প্রেসের দেওয়া তথ্যে উল্লিখিত মতামত পাওয়া গেল। প্রেস মালিকরা আফসোসের সুরে বললেন, কাগজের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ জনগণ আগের মতো বইপত্রসহ নানাবিধ ছাপার কাজে নিরুৎসাহিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো প্রেসজগতে।
সূত্র মতে, আগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মণ্ড তৈরি করা হলেও এগুলোর পাশাপাশি বিদেশি মণ্ডও ব্যবহার করা হতো। মোট কথা, ২০১৭ সালের আগে কর্ণফুলী পেপার মিলে বাঁশ ও নরম কাঠ দিয়ে মণ্ড বানিয়ে সেই মণ্ড থেকে কাগজ তৈরি হতো। পুরাতন কাগজ ব্যবহার করে নতুন যে কাগজ তৈরি হচ্ছে সেগুলো দ্বারা পাঠ্যপুস্তক ছাপানোসহ প্রিন্টিংয়ের নানা কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কাগজ তৈরিতে বাঁশ ও কাঠের ব্যবহার না থাকলেও কাগজ উৎপাদনে পাল্প বা মণ্ড ব্যবহার এখনো বিদ্যমান। আগে রঙিন কাগজ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বর্তমানে পুরাতন কাগজকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মণ্ড বানিয়ে কয়েক ধরনের রঙিন কাগজ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংবাদে আরও জানা যায়, নীল রঙের কাগজ উৎপাদন করা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনে সরবরাহ করার জন্য।
কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেছেন, নির্বাচন কমিশন ব্যতীত বিএসও আরও ১ হাজার মেট্রিক টন কাগজ লাগবে বলে জানিয়েছে। চাহিদা মোতাবেক কাগজ সঠিক সময়ে সরবরাহ করার জন্য মিলে কর্তব্যরত সবাই অহোরাত্র কাজ করছেন। কাগজ উৎপাদনে যথেষ্ট পরিমাণ কাঁচামাল গুদামে রয়েছে বলে সূত্রে প্রকাশ।
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, কর্ণফুলী পেপার মিল আগের চেয়ে শত গুণ চাঙা হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয় হতে হবে। কর্ণফুলী পেপার মিলের সঙ্গে অনেকের কিসমত জড়িত। কিছুদিন আগে কাগজের মূল্য লাগামহীনভাবে বেড়েছিল। অনেক প্রকাশনা সংস্থাও বেকায়দায় পড়ে শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছিল। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পেপার উৎপাদনে সবাই আন্তরিক হলে কাগজের মূল্য সহনশীল পর্যায়ে আসবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক
[email protected]