ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান মসজিদুল আকসা। মুসলমানদের প্রথম কিবলা। এ চত্বরে আছে অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিচিহ্ন ও সমাধি। এখানে ভ্রমণে রয়েছে সওয়াব। নামাজ আদায়ে আছে বিশেষ ফজিলত। ঐতিহাসিক জেরুজালেম শহরে এর অবস্থান। ইতিহাসের পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় সংস্কার হয়েছে মসজিদুল আকসা। রূপ বদলেছে প্রাণের এ চত্বরের। মসজিদুল আকসার নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ৭ ইতিহাস তুলে ধরা হলো—
পৃথিবীর দ্বিতীয় মসজিদ : মসজিদুল আকসা পৃথিবীর ইতিহাসের দ্বিতীয় মসজিদ। এর আগে পবিত্র কাবাঘর নির্মিত হয়েছে। আল-আকসার প্রথম নির্মাতা নিয়ে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। তবে গবেষক আলেমদের মতে, আদম (আ.)-এর হাত ধরে আল-আকসা মসজিদের নির্মাণযাত্রা শুরু হয়। আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। বললাম, অতঃপর কোনটি? বললেন, মসজিদুল আকসা। বললাম, এ দুইয়ের নির্মাণের মাঝখানে কত পার্থক্য? বললেন, ৪০ বছর।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪২৫)
ইবরাহিম (আ.)-এর নির্মাণ : মসজিদুল আকসা নির্মাণের পর খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে ইবরাহিম (আ.) এর পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি সেসময় জন্মভূমি ইরাক থেকে সিরিয়ায় হিজরত করেন। সিরিয়ায় দীর্ঘদিন থেকে মিসর যান। সেখানে নানা ঘটনার আখ্যান পেরিয়ে মক্কায় ফিরে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে কাবাঘর নির্মাণ করেন। পরে আবার সিরিয়ায় ফেরেন। তখন জেরুজালেম ছিল সিরিয়ার অধীনে। কাবাঘর তৈরির ৪০ বছর পর তিনি জেরুজালেমের সাখরায় মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন। পরে ইয়াকুব (আ.) এর সংস্কার করেন। (আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, এ এন এম সিরাজুল ইসলাম, পৃষ্ঠা : ২২)
সুলায়মান (আ.) কর্তৃক পুনর্নির্মাণ: খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে দাউদ (আ.) মসজিদুল আকসা পুনরায় নির্মাণ শুরু করেন। তার ছেলে সুলায়মান (আ.)-এর কাজ সমাপ্ত করেন। (নবীদের কাহিনি, খণ্ড : ২ পৃষ্ঠা : ১৫৯)
সুলায়মান (আ.) জিনদের দ্বারা মসজিদের কাজ সম্পন্ন করেছেন। জিনরা মূলত তার ভয়ে কাজ করত। ফলে তার মৃত্যুর সংবাদ জিনদের কাছে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ, তারা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারলে কাজ রেখে পালাত। এ ঘটনার বিবরণ কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘অতঃপর যখন আমি (আল্লাহ) সুলায়মানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন তার মৃত্যুর খবর জিনদের কেউ জানায়নি ঘুণপোকা ছাড়া—যারা সুলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে মাটিতে পড়ে গেল, তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, যদি তারা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখত, তাহলে তারা (বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের) লাঞ্ছনাকর শাস্তির মধ্যে আবদ্ধ থাকত না।’ (সুরা সাবা, আয়াত : ১৪)
ওমর (রা.)-এর দায়িত্ব গ্রহণ : ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমুক যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় করে মুসলমানরা। আল-আকসা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়। পরে নগরের চাবি গ্রহণ করতে দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) সেখানে আসেন। তখন তার সঙ্গে ছিলেন আবু ওবাইদা আমের ইবনুল জাররাহ (রা.), সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.), খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ও আবু জর গিফারি (রা.)-সহ সাহাবিদের একটি দল। ওমর (রা.) আল-আকসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পবিত্র পাথর ও মসজিদের আঙিনা পরিষ্কার করান। তার নেতৃত্বে মসজিদের দক্ষিণে ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। (আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, এ এন এম সিরাজুল ইসলাম, পৃষ্ঠা : ৩০)
উমাইয়া শাসনামলে উন্নয়ন : খোলাফায়ে রাশেদার পর শুরু হয় উমাইয়া শাসনামল। তাদের রাজধানী ছিল দামেস্ক। তারা জেরুজালেম শহর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। আল-আকসার দিকে বিশেষ নজর দেন। মৌলিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেন। উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের যুগে মসজিদটি পুনর্নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়। এই সংস্কার কাজ ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্র খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের শাসনামলে শেষ হয়। মূল মসজিদের পাশেই তার নির্মিত মসজিদটি ডোম অব দ্য রক নামে পরিচিত। (আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, এ এন এম সিরাজুল ইসলাম, পৃষ্ঠা : ৩২)
আব্বাসীয় আমল : ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় আব্বাসীয় শাসনামল। তাদের শাসনাধীন হয় আল-আকসা। কিন্তু তাদের রাজধানী বাগদাদ হওয়ায় মসজিদুল আকসার প্রতি তাদের মনোযোগ অনেকটাই কম ছিল। ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরে তার উত্তরসূরি আল মাহদি এর পুনর্নির্মাণ হাত দেন। পরে খলিফা মামুনও মসজিদের অনুরূপ সংস্কার সম্প্রসারণ করেন। (আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা, এ এন এম সিরাজুল ইসলাম, পৃষ্ঠা : ৩৩)
সালাহউদ্দিন আইয়ুবির ফিলিস্তিন বিজয় : ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখলে নেয়। বায়তুল মুকাদ্দাস দখলের পর তারা ১০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর শুক্রবার তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন। পরবর্তী জুমায় সেখানে নামাজ আদায় করেন এবং তার হাতে পবিত্র এ মসজিদের কিছু সংস্কারমূলক কাজ সম্পন্ন হয়।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক