নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা মানুষের জীবন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা আর পারছে না। তাদের প্রতিদিন পড়তে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগে। বাজারে যাওয়া একপ্রকার আতঙ্ক এবং অস্থিরতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে। এদিকে বাজারের লাগামও টেনে ধরছে না কেউ। বাজারের এই ঊর্ধ্ব ও অস্থিরমুখী ‘দুরন্ত ষাড়ের’ লাগাম টেনে ধরতে না পারলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা পিষে যাবে। অভাবের তাড়নায় তারা অপরাধে লিপ্ত হতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। বাজার নিয়ন্ত্রণে ইসলামে রয়েছে দিক-নির্দেশনা। এখানে কয়েকটি নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
১. সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম ঠেকাতে হবে
সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের বাজার ব্যবস্থা। নিত্যপণ্যের দাম যখন অব্যাহত বাড়ছে, ভোক্তাদের যখন দম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি, ঠিক তখনো তারা নানা অজুহাতে সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে। পাশাপাশি তারা কৃষকদেরও ঠকাচ্ছে। ইসলাম সিন্ডিকেট করে পণ্য কেনাবেচা নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বাজারের বাইরে গিয়ে পণ্যদ্রব্য আনিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলিত হবে না, পশুর স্তনে দুধ জমিয়ে রাখবে না এবং দাম বৃদ্ধি করে একজন অন্যজনের পণ্য বিক্রয় করে দেওয়ার অপকৌশল অবলম্বন করবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২৬৮)
২. মজুদদারি বন্ধ করা
খাদ্যদ্রব্য মজুদ করা অথবা তা বাজার থেকে তুলে নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো ইসলামে অবৈধ। মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে বাজারপ্রক্রিয়াকে রক্ষার জন্য ইসলাম মজুদদারি, মুনাফাখোরি ও প্রতারণা নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম এ প্রকার কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লামা ইবনে হাজর হাইতামি (রহ.)-এর মতে, গুদামজাত করে মূল্য বৃদ্ধি করা কবিরা গুনাহ। (নিহায়াতুল মুহতাজ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, আল্লাহতায়ালা তার ওপর দরিদ্রতা চাপিয়ে দেন। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫৫) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘শুধুমাত্র পাপী ব্যক্তিই মজুদদারি করে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫) নবীজি (সা.) বলেন, ‘দুর্নীতিপরায়ণ ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২৬৭)
৩. ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা
বেপরোয়া ঘুষ ও চাঁদাবাজির কারণে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েই চলছে। দেখা যায়, বাজারে ব্যবসা করতে গিয়ে বিভিন্ন মহলে ঘুষ দিতে হয়। চাঁদা দিতে হয়। এর প্রভাব পড়ে ক্রেতার ওপর। কারণ যে টাকাটা ব্যবসায়ীরা ঘুষ বা চাঁদা দিচ্ছে, সেটা তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে উসুল করে নিচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সাবধান! তোমরা কেউ কারো ওপর জুলুম করো না। সাবধান, কারো সম্পদ তার অন্তরের সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কারো জন্য হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৬৯৫)
৪. বর্ধিত মূল্যের পণ্য পরিহার
অনেক সময় বাজারে হুট করেই কোনো একটা পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। এর মূল্য হ্রাস করতে হলে সাময়িকভাবে পণ্য পরিহার বা কম কিনতে হবে। ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.)-এর যুগে একবার গোশতের দাম বেড়ে গেল। লোকেরা তার কাছে মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ নিয়ে এলে তিনি বললেন, তোমরাই এর মূল্য হ্রাস করে দাও। তারা বলল, আমরা কিভাবে মূল্য হ্রাস করব। বললেন, এটা ক্রয় করা ছেড়ে দাও। দেখবে এমনিতেই মূল্য কমে যাবে। (তারিখে দিমাশক, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৮২)
৫. সরকারিভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় বনু কায়নুকা গোত্রে ইসলামসম্মত বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে বাজারে কোনো ধরনের প্রতারণা, ঠকবাজি, ওজনে কম দেওয়া বা পণ্যদ্রব্য মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমাদের বাজারগুলোতে প্রতিদিনিই নিতপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতারণা, ঠকবাজি চলছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের কথা ভাবছে না কেউ। ইসলাম সরকারকে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের আদেশ দিয়েছে। ইসলামি স্কলাররা মনে করেন, ‘ব্যবসায়ীরা যদি অতিরিক্ত মূল্য নেয় এবং বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তখন জনগণের ভোগান্তি লাঘবের জন্য সরকার পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেবে, যতক্ষণ না বাজার স্বাভাবিক হয়। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩১৩)
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন, ‘নগরবাসী বিপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সরকার মজুদদারকে বাধ্য করবে, যেন সে তার পণ্য সাধারণ মূল্যে বা যতটুকু বেশি মূল্যে মানুষ মেনে নেয়, সেই মূল্যে বিক্রি করতে।’ (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২১৪)
৬. ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার বাজারে যেতেন। বাজার ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। সেখানে কোনা অসংগতি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে রোধ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একদিন রাসুল (সা.) স্তূপ করে রাখা খাদ্যশস্যের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতর হাত প্রবেশ করালে আঙুলগুলো ভিজে গেল। স্তূপের মালিককে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী? মালিক জবাব দিল, হে আল্লাহর রাসুল! বৃষ্টির পানিতে তা ভিজে গিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তবে তা ওপরে রাখলে না কেন, যেন মানুষ তা দেখতে পায়? যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তৎকালে ওমর (রা.)-কে মদিনার বাজার তদারকির দায়িত্ব দেন। চার খলিফাসহ সাহাবিরা বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন। (আবদুল হাই কাত্তানি, নিজামুল হুকুমাতিন নাবুবিয়্যা আল-মুসাম্মা আত-তারাতিবুল ইদারিয়্যা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৮৭)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক