ইসলামিক বা হিজরি ক্যালেন্ডার কেবল একটি সময় গণনা পদ্ধতি নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ইবাদতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জীবনব্যবস্থা। এই ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে চাঁদের গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল। এর প্রতিটি মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে, যা হয় ২৯ বা ৩০ দিনের। ইসলামে দিনের সূচনা হয় সূর্যাস্তের পর। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আপনাকে চাঁদের কলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, তা মানুষের জন্য এবং হজের সময় নির্ধারণের উপায়।’ (সুরা বাকারা, ১৮৯) এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, চাঁদের হিসাব মানুষের জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
হিজরি বর্ষপঞ্জির মাস ও বিশেষ দিনসমূহ
হিজরি বর্ষে মোট ১২টি মাস রয়েছে। মাসগুলো হলো:
১. মুহাররম
২. সফর
৩. রবিউল আউয়াল
৪. রবিউস সানি
৫. জুমাদাল উলা (জমাদিউল আউয়াল)
৬. জুমাদাল আখিরা (জমাদিউস সানি)
৭. রজব
৮. শা'বান
৯. রমজান
১০. শাওয়াল
১১. যিলকদ
১২. যিলহজ
এই ক্যালেন্ডারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তারিখ রয়েছে, যা মুসলিমদের জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যেমন: ১ মুহাররম (ইসলামি নববর্ষ), ১০ মুহাররম (আশুরা), ১ রমজান (রোজা শুরু), ১ শাওয়াল (ঈদুল ফিতর), এবং ১০ যিলহজ (ঈদুল আযহা)। এছাড়া, ২৭ রজব (ইসরা ও মি'রাজ) এবং রমজানের শেষ দশ দিন (লাইলাতুল কদর) অত্যন্ত বরকতময় রাত হিসেবে গণ্য হয়।
খ্রিস্টীয় বর্ষের সাথে পার্থক্য ও ঋতু পরিবর্তন
হিজরি বর্ষ যেহেতু চন্দ্রনির্ভর, এটি সৌর ক্যালেন্ডার বা খ্রিস্টীয় বছরের চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন ছোট হয়। এর ফলে হিজরি মাসগুলো প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে আবর্তিত হয়। যেমন, এক বছর রমজান গ্রীষ্মকালে পড়লে প্রায় ৩৩ বছর পর তা আবার গ্রীষ্মকালে ফিরে আসে। এর কারণে হজ ও রমজানের মতো ইবাদতগুলো বিভিন্ন ঋতুতে পালন করার সুযোগ তৈরি হয়, যা আল্লাহর এক বিশেষ প্রজ্ঞা।
সম্মানিত চার মাস ও হিজরতের সূচনা
ইসলামে ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাসকে হারাম বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, রজব, মুহাররম, যিলকদ ও যিলহজ। জাহেলি যুগেও এই মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল, যা ইসলাম অনুমোদন দিয়েছে। এই মাসগুলোতে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো ধরনের সংঘাত হারাম।
হিজরি ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন
ইসলামিক ক্যালেন্ডারের প্রচলন ঘটে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে (১৬ হিজরি) তিনি সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করে এই বর্ষপঞ্জি চালু করেন। সেই সময় বিভিন্ন অঞ্চলে তারিখ গণনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে, হজরত উমর (রা.) হিজরতকে (মক্কা থেকে মদিনায় নবীজি (সা.)-এর হিজরত) ইসলামের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে চিহ্নিত করে হিজরি বর্ষের সূচনা করেন। এটি ছিল একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি এবং ইসলামের বিজয়ের শুভ সূচনা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক