ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ফেসবুক পোস্টের জেরে মামলা, সাংবাদিক পরিচয়ে মানববন্ধন লক্ষ্মীপুরে ২ মাদককারবারিকে পুলিশে দিলো জনতা ফেনীতে ডেঙ্গু রোধে সচেতনতামূলক র‍্যালি কুড়িগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলে নিহত মুন্সীগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‍্যালি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম মঞ্চের জন্য অনেক গবেষণামূলক কাজ করতে চাই: জুয়েনা শবনম টেকনাফে ৯৯৯-এ গোলাগুলির দাবি, অভিযোগের সত্যতা মেলেনি! গাংনী সীমান্ত দিয়ে ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা ‘রকস্টার’ যেন মাদকের বিজ্ঞাপন নন্দনকাননে মন্দির জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ, দফায় দফায় সংঘর্ষ ৬৫ ভাগ মানুষকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে: তথ্যমন্ত্রী চৌদ্দগ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, নিহত ২ টেকনাফে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোডাউন একাগ্র একলিম, পরিচ্ছন্ন সিলেট সীতাকুণ্ডে পুলিশের টহল গাড়িতে ধাক্কা, সার্জেন্টসহ আহত ৫ অতিথির স্মৃতি গল্প থেকে ৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১২তম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বাংলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে ২৮ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ হরমুজে ইরানের ড্রোন উৎক্ষেপণ, পাল্টা রাডার সাইট লক্ষ্যবস্তু করল যুক্তরাষ্ট্র চাক্তাই খালে নির্মাণাধীন সেতুর ধীরগতি সহ্য করা হবে না: চসিক মেয়র ডেঙ্গু প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী আর্জেন্টিনার জার্সি পরলেই দাঁতের চিকিৎসা ফ্রি! ঘাঘট নদীতে গোসলে নেমে বেরোবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু সাতকানিয়ায় কৃষিজমি ও পাহাড় রক্ষায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের দাবি বরগুনায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু হাতিয়ায় ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ জমি নিয়ে বিরোধে রণক্ষেত্র খুলশি, আহত ১০ ফটিকছড়িতে মনজুর-সনিসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা কুয়েত ও বাহরাইনে ৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান সোনারগাঁয় বাবার মৃত্যুর খবর দিতে গিয়ে ছেলের ঝুলন্ত মরদেহের সন্ধান এআই মামলা: ডিএমপি মাত্র দুটি নম্বর থেকে এসএমএস পাঠায়, অন্যগুলো ভুয়া
Nagad desktop

‘মব সন্ত্রাসে’ বছরজুড়ে আতঙ্ক

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৩৭ এএম
আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৪৯ পিএম
‘মব সন্ত্রাসে’ বছরজুড়ে আতঙ্ক

বছরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ‘মব সন্ত্রাস’, যা শেষ প্রান্তে এসেও ছিল ভয়ানক রূপে। সারা দেশে বিদায়ী ২০২৫ সালের ১১ মাসে (জানুয়ারি থেকে নভেম্বর) মব সন্ত্রাসের ঘটনায় অন্তত ১৮৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা যায়। এর বাইরেও বিদায়ী বছরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে বেশ কিছু নির্মম-নৃশংস হত্যাকাণ্ড। 

পুরান ঢাকায় গত ৯ জুলাই ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে পাথর নিক্ষেপ করে বিকৃত উল্লাস করে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় সংখ্যালঘু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা দেশ। এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে আরও বেশ কিছু মর্মান্তিক খুনের ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তবে বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তথা ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ বিন ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সম্মুখ সারির নেতা হাদির মৃত্যু দলমত নির্বিশেষে সব মানুষকে কাঁদিয়েছে, নামিয়েছে প্রতিবাদ-আন্দোলনে। হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে এখনো সোচ্চার ইনকিলাব মঞ্চ।

অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে বাউলদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার পাশাপাশি রাজবাড়ীতে কবর থেকে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার লাশ তুলে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে পিটিয়ে-পুড়িয়ে বিকৃত উল্লাসসহ বেশ কিছু বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যাকাণ্ডের জেরে বিভিন্ন ব্যানারে মব সৃষ্টি করে দেশের প্রথম সারির দুটি পত্রিকার কার্যালয়ে নজিরবিহীন হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী ভবনে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উৎকণ্ঠা বাড়ায়। গত বছরের মতো ২০২৫ সালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি একাধিকবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বরাবরই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আইন হাতে তুলে নেওয়া, অস্ত্রের গর্জন-মহড়া, প্রকাশ্যে খুন, ছিনতাই-ডাকাতি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একধরনের ভীতি ও অস্থিরতার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মব সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে সরকারের নানা সাফল্য ম্লান হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেভাবে অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটেছে, যে মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণনাশ হয়েছে–এমনটা কখনোই প্রত্যাশা করিনি। একটা বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হলে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা অস্থিরতা বা সংকট দেখা যায়, কিন্তু আইনশৃঙ্খলায় চরম অস্থিরতা বা সামাজিক যে বিপর্যয় আমরা দেখলাম, তা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো শক্ত পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দক্ষতা ও পেশাদারত্বের চরম ঘাটতি দেখা গেছে। ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সেভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সব মিলে অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে।’ 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে ১১ মাসে মব সন্ত্রাসের (সমবেত হামলা-লাঞ্ছনা) ঘটনায় ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৮ জন, চট্টগ্রামে ৩২ জন, খুলনায় ১৯ জন, বরিশালে ১৫, রাজশাহীতে ১৪, রংপুরে ১২, ময়মনসিংহে ১০ এবং সিলেটে ৪ জন নিহত হন। ডিসেম্বরের তালিকা হালনাগাদ না হলেও ধারণা করা হয় এই মাসেও বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। 

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এই ১১ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে ৩৮৩টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন, আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৭৬ জন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত সবচেয়ে বেশি হয়েছে বিএনপিতে। দলটির আহত ও নিহত নেতা-কর্মীর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। আসক আরও জানাচ্ছে, এই বছরে ১১ মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ৬৫ বার হামলার ঘটনা ঘটে। 

এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বছরজুড়েই সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। পুলিশ যে কারণে এবং যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, সেখানেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং জবাবদিহি না থাকার সুযোগে ধারাবাহিকভাবে মব সন্ত্রাস ঘটেছে। একই কারণে পেশাদার অপরাধীদের প্রকাশ্য তৎপরতা, খুনোখুনিসহ নানা অরাজকতা চোখে পড়ে। সব মিলে পুরো বছরটি একধরনের উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির খবরের কাগজকে বলেন, “বিদায়ী বছরটিতে ধারাবাহিকভাবে উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা বিভিন্ন ব্যানারে সংঘটিত ‘মব সন্ত্রাস’-এর ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মানবাধিকার বা নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তাকে বারবার হুমকির মাঝে ফেলেছে। রাজনৈতিক প্ররোচনায় বা সামাজিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন সহিংস কর্মকাণ্ডে বহুসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ বা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যা রাষ্ট্র বা সরকারের মূল দায়িত্ব।”

বিভিন্ন দেশে জেঁকে বসেছে রক্ষণশীলতা

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:১৯ পিএম
আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৮ পিএম
বিভিন্ন দেশে জেঁকে বসেছে রক্ষণশীলতা
প্রতীকী ছবি

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেকটাই বদলে গেছে। সচরাচর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে রূপ দেখা যায়, চলতি বছর ঘটেছে তার উল্টো। দেশে দেশে রক্ষণশীল রাজনীতিকে জেঁকে বসতে দেখা গেছে, উত্থান হয়েছে আত্ম-কেন্দ্রিক রাজনীতিরও। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে চলতি বছর যা অবাক করে দিয়েছে পুরো বিশ্বকেই।

ট্রাম্পের ফেরা
এ বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই অভিবাসন, গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ– একাধিক ইস্যুতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্ব চলতি বছর দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিকল পরিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতেও ট্রাম্পের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় মিত্রদের বলয় থেকে সরিয়ে এনেছেন। রাশিয়ার সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছেন। এমনকি চলতি বছরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে বৈঠকও করেছেন ট্রাম্প। এক বছর আগেও এ ধরনের কিছু ছিল অকল্পনীয়। ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের ইস্যুতে এখনো বড় ধরনের কোনো ফলাফল না এলেও গোটা বছর ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল।

বছরের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ছিল ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ। ক্ষমতায় আসার পর চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন তিনি। শুধু চীন নয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন তিনি। এরপর শুল্ক কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বাণিজ্যকে পরিণত করেন কূটনীতির হাতিয়ারে। এ নিয়েও ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বছরের বড় একটা অংশ জুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে নিয়মিতভাবেই ছিল বিষয়টি।

গাজা যুদ্ধ
গাজায় চলতি বছর তৈরি হয়েছিল মানবেতর পরিস্থিতি। ইসরায়েল খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ আটকে এবং টানা নির্বিচারে হামলা চালিয়ে গোটা উপত্যকাকে ঠেলে দিয়েছে দুর্ভিক্ষের মুখে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে একমত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। তবে সে চুক্তিও বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ইসরায়েল প্রায়ই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালাচ্ছে। চুক্তির শর্ত অনুসারে, হামাসের হাতে থাকা জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিরা বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। 

পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে, চুক্তিটি দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে ইসরায়েল ও হামাসের দ্বন্দ্ব যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে সে পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকেই। এরই মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিরিয়ায় নতুন সরকার
গত বছর সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ছিল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বছরের প্রথম কয়েক মাসের পুরোটা জুড়েই ছিল সেটির রেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে ইসরায়েলের সিরিয়ায় হামলা চালানোর মতো ঘটনাবলিও ছিল আলোচনায়। জানুয়ারিতেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আহমেদ আল শারা। পরে তার অধীনে মার্চে ঘোষিত হয় সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভা। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত ছিলেন আল শারা। যুক্তরাষ্ট্র সে তালিকা থেকে তার নাম বাদ দিয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে সফরও করেছেন তিনি। 

ইউক্রেন যুদ্ধ
ট্রাম্পের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চলতি বছর রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে। আরও বহু সেনা হারিয়েছে দুই দেশ। ইউক্রেনের পাশে রয়েছে তার ইউরোপীয় মিত্ররা। ফলে এখনো যুদ্ধ টেনে যেতে পারছে তারা। রাশিয়া এখন আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলটি চাইছে। ইউক্রেন তা দিতে রাজি নয়। বছর শেষ হয়ে এলেও এ বিষয়টির সুরাহা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের পর ইউক্রেন যুদ্ধ অবসান নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ
চলতি বছরের ১৩ জুন ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। ওই হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সামরিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা প্রাণ হারান। নিরাপত্তার জন্য আত্মগোপনে চলে যেতে হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেও। যুদ্ধের একপর্যায়ে, ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে তারাও এই যুদ্ধে জড়ায়। পরে ২৩ জুন ইরান কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির কথা জানান। ওই সময়ের পর থেকে ইরান নীরব রয়েছে। তবে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ইসরায়েল ও ইরান আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এমন শঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
চলতি বছরের এপ্রিলে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাম এলাকায় ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ২৬ জন বেসামরিক পর্যটক নিহত হন। ভারত সরকার ওই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনকে দায়ী করে এবং ইসলামাবাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে। তবে পাকিস্তান এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে জানায়, হামলার সঙ্গে তাদের সরকার বা দেশের কোনো পক্ষের সম্পর্ক নেই। এই ঘটনার জেরে দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। দুই দেশই একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করে, ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাও সময়ের সঙ্গে বাড়তে শুরু করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উদ্যোগে আলোচনার পর ১০ মে বিকেল ৫টা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। 

প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চিপ প্রযুক্তি ও এআই নিয়ে চলতি বছরও প্রতিযোগিতা অব্যাহত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বেড়েছে। দেশটি নতুন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে এ শিল্পকে গড়ে তুলতে। তারা চেষ্টা করছে এগিয়ে থাকতে। অন্যদিকে চীনও একই পথে হাঁটছে। জানুয়ারিতে চীনের প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপসিক এআই লঞ্চ হওয়ার পর ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। তবে দ্রুতই তারা সেটি সামলে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন চিপ প্রশ্নে কিছুটা নমনীয় অবস্থানে রয়েছে। অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত আসে যে চিপ প্রশ্নে তারা চীনকে কিছুটা ছাড় দিতে পারে আগামীতে। 

বহুপক্ষীয় ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা
২০২৫ সালে বহুপক্ষীয় ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো অভূতপূর্ব চাপের সম্মুখীন হয়। জাতিসংঘের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আরও অর্থায়ন কমানোর হুমকি দেয়, যা সংস্থাটির শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এর ফলে এরই মধ্যে অনেক উন্নয়নশীল দেশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর একাধিক দেশ প্রকাশ্যে আইসিসির এখতিয়ার ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি তোলে। কিছু রাষ্ট্র আদালতের সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার কেউ কেউ আইসিসি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর তা হলো- জাতীয় সার্বভৌমত্ব বনাম আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহি। বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলোর অনীহা ও দ্বিচারিতার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বহুপক্ষীয় কাঠামো দুর্বল হলে বিশ্ব রাজনীতি আরও বেশি খণ্ডিত ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। 

জলবায়ু পরিবর্তন
২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। আর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে। এই ঘটনা জলবায়ু সংকটকে আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা হিসেবে স্পষ্ট করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ সম্মেলন থেকে বহু আশা রেখেছিল বিশ্বের মানুষ। তবে তা আর পূরণ হয়নি। বরাবরের মতো এবারের সম্মেলনেও আধিপত্য ও প্রভাব দেখা গেছে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের এবং কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পক্ষে থাকা রাষ্ট্রের। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কপ আয়োজন এখন আর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। 

উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রশাসনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে শেষ হলো বছর

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৫৫ এএম
উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রশাসনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে শেষ হলো বছর
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছর প্রশাসন নিয়ে ঘটনাবহুল সময় পার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রাপ্য পদোন্নতির দাবিতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিক্ষুব্ধ অবস্থান, ডিসি নিয়োগের কঠোর সমালোচনা, গত সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, প্রশাসনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সৃষ্টিসহ নানা কারণে আগোছালো ও প্রায় স্থবির পরিবেশে শেষ হয়েছে বছর।

এসবেই শেষ হয়নি। বছর শেষে নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশের জেলা প্রশাসনে জেলা প্রশাসক (ডিসি), অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি), ইউএনও পদায়নেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক।

এভাবেই সিদ্ধান্তহীনতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চাপে জনপ্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। এতে বড় ভুক্তভোগী হয়েছেন যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা।

বছর শেষে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাঝে। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ও একটি রাজনৈতিক দলের কঠোর অনুসারী দুই কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ১৫ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলির একটি তালিকা তৈরি করেছেন। তারা সবাই ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে এই তালিকার ৬ কর্মকর্তাকে বদলিও করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৯ কর্মকর্তাকেও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দুই দিন পরই সচিবালয়ে প্রথম বিক্ষোভ করেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। এই দুই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ অনেক কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটে। ফলে হঠাৎ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনে এমন বিশৃঙ্খলায় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সহ সারা দেশে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দেয় অস্থিরতা। সেই থেকে প্রশাসনে পদোন্নতি, পদায়ন নিয়ে অস্থিরতার শুরু, যা শেষ হয়নি বছর শেষেও।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। এ সময় (সেপ্টেম্বর) দুই দিনে প্রথমে ২৫ জেলা এবং পরদিন ৩৪ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পরই প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই কটাক্ষ ও বিতর্কের মুখে পড়ে সরকার। 

যার প্রভাব ছিল বছরের শেষ ভাগে গত নভেম্বরে নতুন ৫২ ডিসি নিয়োগেও। বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া এই ডিসি পদে ২৫তম ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা যেমন রয়েছেন, তেমনই ২৭তম ব্যাচের কয়েকজন নতুন কর্মকর্তার সঙ্গে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নতুন এই ডিসি পদায়ন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে অবশেষে এই তালিকায় নিয়োগ পাওয়া ছয় ডিসিকে প্রত্যাহার করে সরকার।

২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে নতুন ব্যাচ হিসেবে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিসি ফিটলিস্টে ভাইবা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। দুই ব্যাচের নির্বাচিত কিছু কর্মকর্তাকে ফিটলিস্টের জন্য ডাকে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। সরকার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা ইউএনও বা এআরও (সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ডিসি ফিট লিস্টের জন্য ডাকা হবে না। অর্থাৎ এই কর্মকর্তাদের ডিসি পদে নিয়োগ দেবে না সরকার। সরকার মনে করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যারাই ইউএনও পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সবাই গত আওয়ামী লীগ সরকারের লোক। এ জন্য তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না। কর্মকর্তাদের দাবি এটা সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা। শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, এসব কর্মকর্তাদের  সবাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক নন। তারা জানান, প্রশাসনের স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাচভিত্তিক যোগ্য কর্মকর্তাদের ইউএনও পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ইউএনও পদে নিয়োগ পাওয়া ২৮, ২৯ ও ৩০তম ব্যাচের ৪৯৬ জন কর্মকর্তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। অথচ এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। বিপরীতে গত নভেম্বরে ডিসি পদে যেসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রয়েছেন নারী নির্যাতন মামলার আসামি। কয়েকজন কর্মকর্তা আছেন, যারা ব্যাচভিত্তিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত সরকারের সময় অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হওয়ায় ডিসি পদে নিয়োগ পাননি তারা। আবার কিছু কর্মকর্তা ব্যাচভিত্তিক নেতা হওয়ায় চতুরতার সঙ্গে ইউএনও পদে নিয়োগ নিয়ে ঢাকার বাইরে পদায়ন নেয়নি। মূলত এরা গত সরকারের আমলের সুবিধাভোগী। অথচ তাদেরই আস্থায় নিয়েছে সরকার। এমন কর্মকর্তারাই এখন ডিসি এবং তারাই জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে প্রশাসনের অদৃশ্য দূরত্ব সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তা। তারা জানান, প্রায় এক বছর পার হলেও এখনো ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি চূড়ান্ত হয়নি। প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে অসন্তোষ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক জট নয়, বরং উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। এই ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ২০তম ব্যাচের তিনজন প্রভাবশালী ও দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতির জন্য রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আবার জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া রিভিউ করার সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড বা এসএসবি।

অন্যদিকে সময়ের ব্যবধানে ২১তম এমনকি ৩১তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তারাও ইতোমধ্যে যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু ২০তম ব্যাচের জট না কাটায় পুরো পদোন্নতি কাঠামো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে হতাশা নিয়ে বছর শেষ করছেন এসব ব্যাচের কর্মকর্তারা।

আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ প্রশাসনে ২০ গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সচিব। প্রশাসনকে গতিশীল করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসন গতিশীল তো হয়ইনি, বরং আরও বেশি এলোমেলো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনিয়মিত সচিবদের মানসিক সমন্বয়ের অভাবেই এমনটি হচ্ছে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ২০ কর্মকর্তাসহ প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে রয়েছেন ৭১ জন কর্মকর্তা।

এছাড়াও প্রশাসনের নানা স্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া, ক্ষমতাপ্রত্যাশী দেশের অন্যতম বড় দুই দলের সমর্থক কর্মকর্তা নিয়োগের চাপাচাপিতে শূন্য পদে নিরপেক্ষ, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে না পারার ব্যর্থতা, যথাসময়ে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দিতে পারার মতো বিভিন্ন কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় প্রায় পুরোপুরি থেমে ছিল বছরজুড়ে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

আবার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল নিজেদের লোকজনকে ‘জায়গামতো’ বসাতে অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে অভিযোগ অনেক কর্মকর্তার। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলছেন, বছরজুড়েই রাজনৈতিক চাপে ছিল প্রশাসনের ‘চেইন অব কমান্ড’। সে কারণেই প্রশাসনের নৈমিত্তিক কাজে গতি আসেনি। অনেকটা চিড়েচ্যাপ্টা পরিস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই সতর্কতার সঙ্গে পথ চলার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী কারা, তা বোঝার চেষ্টা করে নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করছেন। পাশাপাশি বছরজুড়েই ছিল প্রশাসন ক্যাডার বনাম অন্য ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ। এতেও সারা বছরই অনেকটা স্থবির, অস্থির ছিল প্রশাসন।

গত দেড় বছরে প্রশাসনের সংস্কার ও গতি আনতে না পারা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে জানান, ভবিষ্যতে যদি কখনো বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা বা দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয় তবে দুটি বিষয় প্রাধান্য পাবে। এর একটি প্রশাসনের জনবল সঠিক ব্যবস্থাপনা বা পুনর্গঠিত করতে না পারা এবং দ্বিতীয়টি হবে সেবা পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা।

তিনি বলেন, সরকার ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ায় প্রশাসনকে হয়তো পুনর্গঠিত করতে পারেনি। অথবা তারা বুঝতেই পারেনি এর জটিলতা। ফলে সচিবালয়কেন্দ্রিক বা মাঠ প্রশাসনের জনবল ব্যবস্থাপনায় সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তেমনই সাব-রেজিস্টার অফিস, তহশিল অফিস, থানা (পুলিশ স্টেশন) এমন সেবা পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেসবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ তো করতেই পারেনি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

টানাপোড়েনের পর তারেকে উদ্ভাস

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০০ এএম
টানাপোড়েনের পর তারেকে উদ্ভাস
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদায়ী ২০২৫ সালজুড়েই ছিল উত্তেজনা। কারণ সংসদ নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা ছিল। পাশাপাশি জনমনেও একধরনের শঙ্কা ছিল। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত বা সংস্কার ইস্যুতেও বছরের শুরুতে দেখা দিয়েছিল দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ। নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন ও বাকযুদ্ধ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এতে রাজনীতির ময়দানও ছিল উত্তপ্ত। বিশেষ করে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার পর ভোটের রাজনীতি হয় আরও ঘোলাটে। তবে ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে আগমনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন ঘিরে সব শঙ্কা দূর হয়ে যায়। রাজনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসে। জনমনেও স্বস্তি ফিরে আসে। অনেকের মতে, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিরও বাঁক বদলে দিয়েছে। জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার সৃষ্টি হয়েছে। 

১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদিকে গুলি করার পর গোটা দেশের মানুষের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার জানাজায় লাখো জনতার ঢল নামে, যা দেশের ইতিহাসে বিরল। হাদির বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। অনেকের মতে, এই ঘটনা নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সরকার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ। কারণ ওই ঘটনার পর নির্বাচনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে নির্বাচন বানচালে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ নানা ধরনের নাশকতা। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। 

নেতা আসছেন, দেশে বসেই নির্বাচনের নেতৃত্ব দেবেন–তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে বছরজুড়েই আলোচনা ছিল। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো ধারণা দিত তারেক রহমান দেশে ফিরছেন ওমুক মাসে। সেই প্রতীক্ষার অবসান হয় ২৫ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয় এক রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনা। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিনের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তার আগমন ঘিরে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ঢাকার সব পথের মানুষই যেন মিলেছিল ৩০০ ফিট সড়কে। লাখো সমর্থকের উচ্ছ্বাসে ভেসে ঢাকার ৩০০ ফুটে সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় নেতা-কর্মীদের অপেক্ষার প্রহর। তাদের মাঝে ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস। সংসদ নির্বাচনের আগেই তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে এখন পুরোদমে উজ্জীবিত বিএনপি।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের প্রথম বক্তব্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সবাই বলছেন, তারেক রহমান দেশ বদলের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি শক্ত হাতেই দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারবেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইতিবাচক। জনগণের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচন হবে এ ব্যাপারে সবাই আশাবাদী। তার ফেরায় দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার হয়েছে।’

লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠক
ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে বিএনপির এমন দাবির মধ্যে বিদায়ী বছরের ১৩ জুন লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হয়। এই বৈঠকের পর যৌথ প্রেস বিফ্রিংয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এই বৈঠককে সবাই মোটামুটি ইতিবাচকভাবে দেখলেও জামায়াত ও এনসিপি বৈঠক নিয়ে কটাক্ষ করেছিল। অনেকের মতে, এই বৈঠকটি ছিল দেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। বিএনপির পাশাশাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয় এবার নির্বাচন হচ্ছে। 

এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেও দুই দফায় দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলো অংশ নিলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ২৮টি দল পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে।

প্রচলিত প্রথা ভেঙে এবারই প্রথম মনোনয়ন ফরম বিক্রি ছাড়াই প্রথম দফায় গত ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এরপর আরও কয়েক দফায় বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করত, এবার সেটি আর দেখা যায়নি। নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়ন বাণিজ্য অনেকটাই কমে গেছে। এটা পরিবর্তনের রাজনীতির ইঙ্গিত। 

যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে বিএনপির কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ দলই শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে আছে। বাংলাদেশ এলডিপি ও জাতীয় দল বিলুপ্তসহ এখন পর্যন্ত পাঁচজন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যরা আসন সমঝোতা করেই বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র
বছরের শুরুতেই রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একতার আভাস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষদিকে ভোটের সমীকরণে তা ম্লান হয়ে গেছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের লক্ষ্যে বছরের শুরুতেই নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, সংবিধান, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু, শ্রম অধিকার এবং গণমাধ্যমবিষয়ক কমিশন গঠন করা হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় সাড়ে আট মাস ধরে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে কয়েক দফায় ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে। কখনো এককভাবে, কখনো সব দলকে নিয়ে বৈঠক করেছে ঐকমত্য কমিশন। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিএনপি, জামায়াতসহ প্রায় ৩০টির মতো দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়। আর শেষ হয় অক্টোবর মাসে। এই সংলাপ রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নেও দলগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তর্ক-বিতর্কের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত সব দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে। এসব প্রস্তাব নিয়ে গঠিত হয় জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫। বিদায়ী বছরের ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবনে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ২৪টি দল ও জোট জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। পরে ১৯ অক্টোবর আলাদাভাবে জুলাই সনদে সই করেছিল গণফোরাম। এ ছাড়া সব দলের মতামতের ভিত্তিতে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বর্ষপূতি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘোষণা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

এক মঞ্চে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলো 
এদিকে বিদায়ী বছরের শুরুতেই জামায়াতে ইসলামীও তাদের ৩০০ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। তারা ভোটের মাঠে প্রচার চালানোও শুরু করে। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি। তবে রাজনীতিতে বড় চমক ছিল ইসলামপন্থি আটটি দলের একজোট হওয়া। তারা পিআর পদ্ধতিতে (সংখ্যানুপাতিক হারে) নির্বাচনের দাবিতে বিদায়ী বছরের ১১ নভেম্বর এককাট্টা হয়। কয়েকটি বড় সমাবেশ করে সেই সময়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। সর্বশেষ এই আট দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও কর্নেল অলির নেতৃত্বধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। এখন জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দল আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া বিদায়ী বছরের রাজপথে বিএনপি, জামায়াতের ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন ঢাকায় কয়েকটি বড় শোডাউন করেছে। তবে এসব সংগঠনে বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আওয়াজ তুলেছিল জামায়াতসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। তবে সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।

এনসিপির আত্মপ্রকাশ ও ভাঙন 
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের গুঞ্জন ছিল। সেটি পূর্ণতা পায় বিদায়ী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনিসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। এনসিপির নিবন্ধন ও শাপলা প্রতীক নিয়েও কয়েক মাস রাজনীতিতে টানাপোড়েন ছিল। সেই সময়ে এনসিপির নেতাদের অভিযোগ ছিল, শাপলা প্রতীক দিতে বাধা দিচ্ছে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। তবে শেষ পর্যন্ত ‘শাপলা কলি’ প্রতীক পায় দলটি। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এক বছর হতে না হতে দলটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। অনেকের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া এই ছাত্রসমাজ নিয়ে সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, তাদের আদর্শ ও লক্ষ্য দেখেও জনমনে আশা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সমর্থকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলটির আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিকে বেছে নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ 
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। দলের শীর্ষ নেতাসহ বেশির ভাগ নেতাই বিদেশ জীবনযাপন করছেন। মাঝেমধ্যে দেশে থাকা নেতা-কর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে জানান দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিদায়ী বছরের ৮ মে থেকে টানা ৪ দিন জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের কাছে ও শাহবাগে আন্দোলন হয়। পরে ১২ মে রাতে প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকার্য শেষ হয়ে রায় না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত করেন।

পৃথক সচিবালয় নিয়ে স্মৃতিতে থাকবে ২০২৫

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫৩ এএম
পৃথক সচিবালয় নিয়ে স্মৃতিতে থাকবে ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালের শেষ দিন আজ ৩১ ডিসেম্বর। দেশের আইন-আদালতের ইতিহাসে বছরটি আর দশটি সাধারণ বছরের মতো নয়। বিদায়ী বছরটি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আলোচিত ও ঘটনাবহুল একটি বছর। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে এ বছর বহুল প্রতীক্ষিত বিচার বিভাগ পৃথককরণের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে।

২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপিত হয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে এসেছে। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের রায়ে জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন ও প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ফিরে পেয়েছে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বাতিল, রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের জনসভায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আসামিদের খালাস, মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে খালাস, আলোচিত মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপসহ আসামিদের সাজা বহাল, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ আসামির সাজা বহালের রায়সহ বহু আলোচিত ও যুগান্তকারী রায় এবং আদেশ এসেছে এই বছর।

সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে স্থাপিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন এই বছর। গত বছরের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় তাকে এই দণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।

বছরের শেষ সপ্তাহে গত রবিবার প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। আগের দিন গত শনিবার অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি থেকে প্রার্থী হবেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে পদত্যাগ করেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে এই বছর অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ গঠন। গত ১১ ডিসেম্বর বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে ভবিষ্যৎ সরকারের সমর্থন লাগবে। শুধু তাই নয় স্বাধীন বিচার বিভাগের সফলতা ও ব্যর্থতা-দুটিই আমাদের মানতে হবে বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। 

প্রধান বিচারপতি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই পৃথক সচিবালয় করা সম্ভব হয়েছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, এখন থেকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বিচার বিভাগ কাজ করতে পারবে, এ ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন।  

আশা-দুরাশার বছর শেষে দেশ এখন নির্বাচনি ট্রেনে

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০৮ এএম
আশা-দুরাশার বছর শেষে দেশ এখন নির্বাচনি ট্রেনে

২০২৫ সাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪তম বছর। দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র, রাজনীতি ও অর্থনীতি সংস্কারে আশা জাগানোর বছর হিসেবে বিবেচিত। যদিও আগের বছর (২০২৪) ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। দুর্বার আন্দোলনে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ছাত্র রাজনীতির রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনা করতে দীপ্ত আশা জেগেছিল মানুষের মনে। ২০২৫-এ রাজনৈতিক অস্থিরতা কমলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ (উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস) মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। বিশেষ করে সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, রাজনৈতিক মেরূকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা চ্যালেঞ্জিং ছিল। ফলে আশা-দুরাশার মাঝেই কেটেছে বছর। তবুও সবাই আশায় বুক বেঁধেছেন আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিশ্চয়ই স্থায়ীভাবে স্থিতিশীলতা আসবে। 

সব বাঁধা কাটিয়ে দেশ এখন নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে। নির্বাচনি ট্রেনে উঠার ক্ষেত্রে পেছন ফিরে দেখা ২০২৫ মোটেও মসৃণ ছিল না। সরকারকে বছরজুড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মহলের দাবি-দাওয়ার আন্দোলন সামাল দিতে হয়েছে। 

ঘটনাবহুল ২০২৫-এর সবশেষ আন্দোলন চলছে শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে। সেখানে চলছে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি। ২৬ ডিসেম্বর থেকে লাগাতার কর্মসূচির অংশ হিসেবে রবিবার (২৯ ডিসেম্বর) আন্দোলনকারীরা হাদির মূল হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও ২৫ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করাসহ চার দফা দাবি ঘোষণা করেন। 

গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পল্টনে বিজয়নগরের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল থেকে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতকারীরা। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলে সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে ভাঙা বাড়িটি পুনরায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় স্মরণকালের সবোর্চ্চসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল হাদির জানাজায়।

একই সময়ে অন্য এক ঘটনায় ময়মনসিংহের ভালুকায় একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক দিপু দাস নামের এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর দিপুর দেহ একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিচারের দাবিতে বিভিন্ন মহল ও সংগঠন সোচ্চার হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন স্থানেও আন্দোলন চলছে। 

১৭ বছর পর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান। দেশের ইতিহাসে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ঢাকায় সবচেয়ে বড় জনসমাগম দেখা যায়। 

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক এমপিসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধেই মামলা হয়। এর মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে গত ১ ডিসেম্বর এক রায়ে শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও ভাগনি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীসহ পরিবারের সদস্যদের সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন আদালত। 

নভেম্বরে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান দাবি করেন, অর্থনীতির সব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ নাজুক। অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। 

গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। 

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যা ও বিডিআর ম্যাসাকারের ঘটনা স্মরণে রাখতে ৬ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বিবেচনা ৭ অক্টোবর ও ২৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। 

৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির। দেশের ইতিহাসে ছাত্রশিবির এমন বিজয় পায়নি। 

৫ আগস্ট বহুল প্রত্যাশিত জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। 

২১ জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজিআই বিমান দুর্ঘটনায় ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। 

৯ জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ নামে একজন ভাঙারি ব্যবসায়ীকে ভারী কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হিসেবে উল্লেখ করে সারা দেশে সমালোচনা শুরু হয়। 

২ জুন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। আগের বাজেটের তুলনায় ০.৮৮% কম এবং বিগত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাজেট। এটিই ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো বাজেটের আকার কমানোর ঘটনা।

মে মাসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে কঠোর আন্দোলন শুরু হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম-অঙ্গসংগঠনগুলোর বিষয় রায় না হওয়া পর্যন্ত ওই দল ও সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ১২ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। 

৬ এপ্রিল একটি মামলায় আওয়ামী লীগপন্থি ৮৩ জন আইনজীবী ঢাকার একটি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের মধ্যে ৬১ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়। দেশে একযোগে এত সংখ্যক আইনজীবীর আত্মসমর্পণ ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনা এটাই প্রথম বলে মনে করেন অনেকে। 

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশ সফরে এসে ১৪ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়ায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন। 

ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা ৬ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেওয়ার খবরে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বুলডোজার ও ভেকু দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভেঙে দেন। 

তিন বারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জানুয়ারিতে একাধিক মামলায় সাজামুক্ত হন। তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা পরে আদালতের রায়ে বাতিল হলে তিনি পুরোপুরি মামলামুক্ত হন।