ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদায়ী ২০২৫ সালজুড়েই ছিল উত্তেজনা। কারণ সংসদ নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা ছিল। পাশাপাশি জনমনেও একধরনের শঙ্কা ছিল। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত বা সংস্কার ইস্যুতেও বছরের শুরুতে দেখা দিয়েছিল দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ। নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন ও বাকযুদ্ধ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। এতে রাজনীতির ময়দানও ছিল উত্তপ্ত। বিশেষ করে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার পর ভোটের রাজনীতি হয় আরও ঘোলাটে। তবে ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে আগমনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন ঘিরে সব শঙ্কা দূর হয়ে যায়। রাজনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসে। জনমনেও স্বস্তি ফিরে আসে। অনেকের মতে, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিরও বাঁক বদলে দিয়েছে। জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার সৃষ্টি হয়েছে।
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদিকে গুলি করার পর গোটা দেশের মানুষের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার জানাজায় লাখো জনতার ঢল নামে, যা দেশের ইতিহাসে বিরল। হাদির বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। অনেকের মতে, এই ঘটনা নতুন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সরকার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ। কারণ ওই ঘটনার পর নির্বাচনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে নির্বাচন বানচালে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ নানা ধরনের নাশকতা। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
নেতা আসছেন, দেশে বসেই নির্বাচনের নেতৃত্ব দেবেন–তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে বছরজুড়েই আলোচনা ছিল। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো ধারণা দিত তারেক রহমান দেশে ফিরছেন ওমুক মাসে। সেই প্রতীক্ষার অবসান হয় ২৫ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয় এক রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনা। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিনের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তার আগমন ঘিরে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ঢাকার সব পথের মানুষই যেন মিলেছিল ৩০০ ফিট সড়কে। লাখো সমর্থকের উচ্ছ্বাসে ভেসে ঢাকার ৩০০ ফুটে সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় নেতা-কর্মীদের অপেক্ষার প্রহর। তাদের মাঝে ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস। সংসদ নির্বাচনের আগেই তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে এখন পুরোদমে উজ্জীবিত বিএনপি।
দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের প্রথম বক্তব্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সবাই বলছেন, তারেক রহমান দেশ বদলের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি শক্ত হাতেই দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইতিবাচক। জনগণের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচন হবে এ ব্যাপারে সবাই আশাবাদী। তার ফেরায় দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার হয়েছে।’
লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠক
ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে বিএনপির এমন দাবির মধ্যে বিদায়ী বছরের ১৩ জুন লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হয়। এই বৈঠকের পর যৌথ প্রেস বিফ্রিংয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এই বৈঠককে সবাই মোটামুটি ইতিবাচকভাবে দেখলেও জামায়াত ও এনসিপি বৈঠক নিয়ে কটাক্ষ করেছিল। অনেকের মতে, এই বৈঠকটি ছিল দেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। বিএনপির পাশাশাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয় এবার নির্বাচন হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেও দুই দফায় দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলো অংশ নিলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ২৮টি দল পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে।
প্রচলিত প্রথা ভেঙে এবারই প্রথম মনোনয়ন ফরম বিক্রি ছাড়াই প্রথম দফায় গত ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এরপর আরও কয়েক দফায় বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করত, এবার সেটি আর দেখা যায়নি। নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়ন বাণিজ্য অনেকটাই কমে গেছে। এটা পরিবর্তনের রাজনীতির ইঙ্গিত।
যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে বিএনপির কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ দলই শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে আছে। বাংলাদেশ এলডিপি ও জাতীয় দল বিলুপ্তসহ এখন পর্যন্ত পাঁচজন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যরা আসন সমঝোতা করেই বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র
বছরের শুরুতেই রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একতার আভাস দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষদিকে ভোটের সমীকরণে তা ম্লান হয়ে গেছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের লক্ষ্যে বছরের শুরুতেই নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, সংবিধান, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু, শ্রম অধিকার এবং গণমাধ্যমবিষয়ক কমিশন গঠন করা হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় সাড়ে আট মাস ধরে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে কয়েক দফায় ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে। কখনো এককভাবে, কখনো সব দলকে নিয়ে বৈঠক করেছে ঐকমত্য কমিশন। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিএনপি, জামায়াতসহ প্রায় ৩০টির মতো দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়। আর শেষ হয় অক্টোবর মাসে। এই সংলাপ রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নেও দলগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তর্ক-বিতর্কের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত সব দলের সঙ্গে আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে। এসব প্রস্তাব নিয়ে গঠিত হয় জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫। বিদায়ী বছরের ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবনে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ২৪টি দল ও জোট জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। পরে ১৯ অক্টোবর আলাদাভাবে জুলাই সনদে সই করেছিল গণফোরাম। এ ছাড়া সব দলের মতামতের ভিত্তিতে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বর্ষপূতি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘোষণা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এক মঞ্চে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলো
এদিকে বিদায়ী বছরের শুরুতেই জামায়াতে ইসলামীও তাদের ৩০০ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। তারা ভোটের মাঠে প্রচার চালানোও শুরু করে। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি। তবে রাজনীতিতে বড় চমক ছিল ইসলামপন্থি আটটি দলের একজোট হওয়া। তারা পিআর পদ্ধতিতে (সংখ্যানুপাতিক হারে) নির্বাচনের দাবিতে বিদায়ী বছরের ১১ নভেম্বর এককাট্টা হয়। কয়েকটি বড় সমাবেশ করে সেই সময়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। সর্বশেষ এই আট দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও কর্নেল অলির নেতৃত্বধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। এখন জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দল আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া বিদায়ী বছরের রাজপথে বিএনপি, জামায়াতের ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন ঢাকায় কয়েকটি বড় শোডাউন করেছে। তবে এসব সংগঠনে বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আওয়াজ তুলেছিল জামায়াতসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। তবে সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।
এনসিপির আত্মপ্রকাশ ও ভাঙন
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের গুঞ্জন ছিল। সেটি পূর্ণতা পায় বিদায়ী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনিসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন। এনসিপির নিবন্ধন ও শাপলা প্রতীক নিয়েও কয়েক মাস রাজনীতিতে টানাপোড়েন ছিল। সেই সময়ে এনসিপির নেতাদের অভিযোগ ছিল, শাপলা প্রতীক দিতে বাধা দিচ্ছে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। তবে শেষ পর্যন্ত ‘শাপলা কলি’ প্রতীক পায় দলটি। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এক বছর হতে না হতে দলটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। অনেকের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া এই ছাত্রসমাজ নিয়ে সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, তাদের আদর্শ ও লক্ষ্য দেখেও জনমনে আশা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সমর্থকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলটির আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিকে বেছে নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। দলের শীর্ষ নেতাসহ বেশির ভাগ নেতাই বিদেশ জীবনযাপন করছেন। মাঝেমধ্যে দেশে থাকা নেতা-কর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে জানান দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিদায়ী বছরের ৮ মে থেকে টানা ৪ দিন জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের কাছে ও শাহবাগে আন্দোলন হয়। পরে ১২ মে রাতে প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকার্য শেষ হয়ে রায় না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত করেন।